মনে পড়ে আটের দশকের কথা। কুম্বলে-হরভজন যুগ শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘদিন ভারতীয় ক্রিকেটে নির্ভরযোগ্য স্পিনার-জুটি পাওয়া যায়নি। তখনও সম্ভাবনা থাকলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। আজও সেই প্রশ্নই ঘুরে-ফিরে আসছে।

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 27 August 2025 16:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সংখ্যাটা অবাক করার মতো। চলতি মরশুমের দলীপ ট্রফিতে নাম লিখিয়েছেন মোট ১৯ জন স্পিনার। তার মধ্যে ১১ জন বাঁ-হাতি! বাকি ছ’জন অফ-স্পিনার। আর ‘রিস্ট-স্পিন’ বিভাগে আছেন মাত্র দু’জন—তাঁদের মধ্যে পরিচিত মুখ কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav) ফের একবার অগ্নিপরীক্ষায় নামছেন।
কাগজে-কলমে, খোলা চোখে ভারতীয় ক্রিকেটে বাঁ-হাতি স্পিনের রেনেসাঁ। কিন্তু আড়ালে চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ‘পরিমাণে’র ভিড়ে ‘গুণমান’ কতখানি? কতজন আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের মঞ্চে নামতে প্রস্তুত?—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
কুলদীপ যাদবের কথাই ধরা যাক। আট বছর হয়ে গেল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। অথচ বল করেছেন মাত্র ২৪ ইনিংসে। তার রেকর্ড দুর্দান্ত—প্রতি ছ’ইনিংসে একবার পাঁচ উইকেট, গড় ২২, স্ট্রাইক রেট ৩৭। কিন্তু ভারতের শেষ ১৩ টেস্টের মধ্যে সুযোগ পেয়েছেন মাত্র একটিতে। কারণ? দলে জায়গা এতদিন কার্যত তিন জন্যই পাকাপাকিভাবে বরাদ্দ ছিল—রবীন্দ্র জাদেজা, অক্ষর পটেল ও ওয়াশিংটন সুন্দর। কুলদীপ ভাল খেলেও ব্রাত্য!
সমস্যা হচ্ছে, এই তালিকা এখানেই থেমে। ঝাঁকানোর মতো কিংবা বদলে দেওয়ার মতো স্পিনার কই? অভিজ্ঞ ঘরোয়া স্পিনারদের কেউই সেভাবে নির্বাচকদের দরজায় ঘা দিচ্ছেন না। জাদেজা চলতি বছরেই ৩৭ ছোঁবেন, বাকিরাও তিরিশ পার। এমন অবস্থায় যদি কেউ চোট পান বা ফর্ম হারান, তখন কে এগিয়ে আসবেন? হাল ধরবেন? নেতৃত্ব দেবেন? উত্তর অস্পষ্ট।
এ কারণেই দলীপ ট্রফির স্পিনারদের তালিকা আসলে স্বচ্ছ আয়না। এখানে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সময়ের প্রবণতা। বাঁ-হাতি স্পিনারদের বাড়তি চাহিদা আসছে কোথা থেকে? জবাব: মূলত আইপিএল থেকে। অধিকাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজির বাঁ-হাতি স্পিনার চাই, যাঁরা ব্যাট হাতেও অবদান রাখবেন। অন্যদিকে, অফ-স্পিনারদের বাজার পড়তির দিকে। রিস্টস্পিনাররা টি-টোয়েন্টিতে দামি, টেস্ট ক্রিকেটে টিকতে পারছেন না।
এখানেই ধরা পড়ছে সাদা বল বনাম লাল বলের স্পষ্ট বিভাজন। বিশ্বের সেরা দশ স্পিনারের সাতজনই লেগ-স্পিনার। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে নাম লিখিয়েছেন মাত্র দু’জন—ভারতের কুলদীপ আর পাকিস্তানের আবরার আহমেদ। মিলিতভাবে খেলেছেন মাত্র ২৩ টেস্ট। দু’জনেরই ব্যাট হাতে প্রায় কোনও অবদান নেই। অথচ আধুনিক ক্রিকেটে লোয়ার অর্ডারে নেমে রান না করলে দলে জায়গা পাওয়া মুশকিল। কুলদীপ নিজে ইংল্যান্ড সিরিজে এর ভুক্তভোগী। ফলে টেস্টে তাঁরা বারবার ছিটকে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, জাদেজা বা অক্ষরের মতো ফিঙ্গার স্পিনাররা উইকেটও নিচ্ছেন, আবার ব্যাটও করছেন। তাই নির্বাচকেরা অবধারিতভাবে তাঁদের দিকেই ঝুঁকছেন।
এই প্রেক্ষাপটে আপাতত কাদের দিকে নজর রাখা উচিত? বিদর্ভের ২৩ বছরের হর্ষ দুবে গত মরশুমে ৬৯ উইকেট তুলে নজর কেড়েছেন। তবে টেস্টের মতো চাপ সামলাতে এখনও সময় লাগবে। মুম্বইয়ের তনুশ কোটিয়ান দীর্ঘদেহী। বাউন্স তোলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ময়দানের নিরিখে এখনও উন্নতি দরকার। রাজস্থানের মানব সুতারও লম্বা, ফ্লাইট দিয়ে ব্যাটারদের ফাঁদে ফেলতে ভালোবাসেন, ইকনমি রেট মাত্র ২.৯৭—অর্থাৎ, বল হাতে যথেষ্ট মিতব্যয়ী।
অভিজ্ঞদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে তামিলনাড়ুর সাই কিশোর। ইতিমধ্যেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দু’শোরও বেশি উইকেট নিয়েছেন। ধারাবাহিকতা আছে। ক্রিজ ব্যবহার করেন বুদ্ধি খাটিয়ে। জাদেজার মতোই ব্যালান্সড।
আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। প্রতিভা থাকলেও এখনও কেউ এমনভাবে উঠে আসেননি, যে জাদেজাদের জায়গা কেড়ে নেবেন। মনে পড়ে আটের দশকের কথা। কুম্বলে-হরভজন যুগ শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘদিন ভারতীয় ক্রিকেটে নির্ভরযোগ্য স্পিনার-জুটি পাওয়া যায়নি। তখনও সম্ভাবনা থাকলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। আজও সেই প্রশ্নই ঘুরে-ফিরে আসছে।
দলীপ ট্রফির এই মরশুম তাই নিছক আরেকটা টুর্নামেন্ট নয়। একপ্রকার অডিশন। এখান থেকেই বোঝা যাবে, আগামী দিনের টিম ইন্ডিয়ার স্পিন আক্রমণ কার হাতে থাকবে। ভিড় অনেক। কিন্তু জাতীয় দলে টিকে থাকার মতো যোগ্য কে? এর জবাব হয়তো প্রতিযোগিতা শেষে অনেকটাই স্পষ্ট হবে।