শেষবিচারে চূড়ান্ত সাফল্য বলতে তো দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক মাঠে, পোড়খাওয়া প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে দামামা বাজানো। সেই সুযোগও জুটল আজ, ম্যাঞ্চেস্টারে। প্রথম একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন অংশুল।

অংশুল কম্বোজ
শেষ আপডেট: 23 July 2025 17:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হরিয়ানার ফাজিলপুর থেকে খান্দ্রা গ্রামের দূরত্ব মেরেকেটে ৬০ কিলোমিটার। প্রথম গ্রামে বেড়ে উঠেছেন অংশুল কম্বোজ। টিম ইন্ডিয়ার পেসার, যিনি ম্যাঞ্চেস্টারে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ময়দানে নেমেছেন। কেরিয়ারে প্রথমবার।
দ্বিতীয় গ্রাম, খান্দ্রা, জ্যাভলিন তারকা নীরজ চোপড়ার জন্মভূমি।
নীরজের সঙ্গে অংশুলের দেখা হয়েছে কি না কিংবা দুজনের পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, জানা নেই। কিন্তু একটি সূত্রে গাঁথা দুই খেলোয়াড়ের জীবন। তাঁদের ময়দানে পা রাখা আসলে ওজন কমানোর পাকচক্রে। অংশুলকে নিয়ে যান তাঁর বাবা। নীরজকে কাকা। ফারাক বলতে স্রেফ এটুকুই।
এরপর আলাদা মঞ্চে নিজেদের আলাদাভাবে গড়ে তুলেছেন দুজন। নীরজের কেরিয়ারে সাফল্য এসেছে দ্রুত এবং প্রভূত। অলিম্পিক্সে সোনা, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন—মুঠো মুঠো পদক আর খেতাব। পরিশ্রমের স্বীকৃতি অঙ্ক মেনে হাজির!
অংশুলকে ধৈর্য ধরতে হয়েছে, অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতীক্ষার ফল শেষমেশ মিঠে হয়ে ধরা দিয়েছে। রঞ্জিতে অপ্রত্যাশিত সাফল্য, বিজয় হাজারেতে নজরকাড়া বোলিংয়ের প্রতিদান আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে ময়দানে নামা। কিন্তু শেষবিচারে চূড়ান্ত সাফল্য বলতে তো দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক মাঠে, পোড়খাওয়া প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে দামামা বাজানো। সেই সুযোগও জুটল আজ, ম্যাঞ্চেস্টারে। প্রথম একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন অংশুল। জসপ্রীত বুমরাহর ডেপুটি হিসেবে কতটা ছাপ ফেলছেন বাইশ গজে, সেটা আগামী পাঁচদিনে স্পষ্ট হবে।
যদিও বল হাতে নামার আগে একটি ছবি স্পষ্ট—বাবা উধম সিংয়ের মুখের হাসি। যা গত কয়েক বছর ধরে স্রেফ উবে গিয়েছিল। এপিলেপ্সি আক্রমণ হানে। কয়েক দশক ধরে স্রেফ মৃগীরোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন উধম। হাসতে ভুলে যান। আনন্দ কী বস্তু, সেটাও মনে ছিল না। ছেলের সাফল্যে অধরের এক প্রান্তে চিলতে হাসির রেখা। উধম আজ প্রাণ খুলে কথা বলছেন। জানাচ্ছেন অকথিত জীবন ইতিহাস! তাঁর কথায়, ‘সবকিছু শুরু হয় কম্বোজের ছেলেবেলার কোচ সতীশ রানার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। আমি তাঁকে বিশেষভাবে জানিয়েছিলাম, অংশুলকে দিয়ে বল করাও। আসলে ও খুবই মোটা ছিল। মেদ ঝরাতে চেয়েছিলাম। এরপর খেলায় এমনভাবে মজে গেল যে, ক্রিকেটই হয়ে উঠল অংশুলের জীবন!’
বাবা শারীরিক অবস্থার জন্য কার্যত শয্যাশায়ী। মায়ের কিডনিতে পাথর ধরা পড়ে। অপরারেশন করাতে হবে বলে তিনিও ছেলেকে এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে যেতে পারেননি। অলরাউন্ডার নীতীশকুমার রেড্ডি, পেসার আকাশ দীপ এবং অর্শদীপ সিং চোট পেয়ে মঠের বাইরে। তাই মূল দলে না থাকা সত্ত্বেও ম্যাঞ্চেস্টারে সুযোগ জুটেছে অংশুলের।
অথচ ইংল্যান্ড অভিযান গল্পের শুরুটা এরকম ছিল না। ভারতীয় এ টিমের হয়ে ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিরুদ্ধে নামেন। হর্ষিত রানা, মুকেশ কুমারদের ছাপিয়ে স্পটলাইট কেড়ে নেন অংশুল। তীক্ষ্ম সিম এবং তার সঙ্গে ক্ষুরধার সুইং—প্রস্তুতি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। কিন্তু তারপরেও লিডসে আয়োজিত প্রথম টেস্টের টিম লিস্টে নাম ওঠেনি। ওয়ার্ম আপ ম্যাচে নিষ্প্রভ হর্ষিতের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে।
মনের দুঃখে গ্রামে ফিরে আসেন অংশুল। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। দ্বিগুণ উদ্যমে চালিয়ে যান প্রস্তুতি। অ্যাকাডেমিতে ডিউক বল হাতে নেমে পড়েন। নিশানায় একটিমাত্র স্ট্যাম্প। নাগাড়ে বল করে যান। সতীশ রানা, অংশুলের ছেলেবেলার কোচের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন, ‘সব ঠিক আছে তো?’
উত্তরে ‘ব্রাত্য’ বোলারের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘স্যার, আমি আশাবাদী!’
দু’বছর আগে চ্যাম্পিয়ন হরিয়ানার হয়ে বিজয় হাজারে ট্রফিতে ১০ ম্যাচে ১৭ উইকেট নাকি রঞ্জিতে কেরলের বিরুদ্ধে ৩০ ওভার বল করে এক ইনিংসে ১০ উইকেট—কোন সাফল্য অংশুলকে আশায় বুক বাঁধার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে? সতীশের কাছে এর উত্তর নেই। তাঁর চোখে ভেসে উঠছে উধম সিংয়ের অশ্রুসজল মুখ। অংশুল যখন রণক্লান্ত, নিজের সর্বস্ব উজাড় করে পারফর্ম করার পরেও যখন একের পর এক দরজা বন্ধ, কিছুতেই ফাঁক গলে বেরতে পারছেন না, ছেলের পিঠ চাপড়ে মৃদু গলায় স্রেফ একটাই কথা বলেছিলেন, ‘বেটা, সির্ফ টাপ্পা পাকড় কে ডালতা র্যাহ!’ (তুমি শুধু সঠিক লাইনে বল করে যাও)
ব্যর্থতা আর বঞ্চনার কানাগলিতে হারিয়ে না গিয়ে সাফল্যের নিশান দেখতে পেয়েছেন অংশুল। জীবনের লাইনে তিনি অবিচল। বাইশ গজের হিসেবটা শুধু বুঝে নেওয়া বাকি!