আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘুরে দাঁড়ানোর রাস্তা কোথায়? কোচ কি পরিকল্পনা বদলাবেন? নেতৃত্বে কি পরিবর্তন দরকার? নাকি ভারতীয় ক্রিকেট আরও এক টালমাটাল সময়ের দিকে এগোচ্ছে?

গৌতম গম্ভীর
শেষ আপডেট: 24 November 2025 14:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইডেনের পিচ নিয়ে নাটকের ইতি। যদিও আফটার-এফেক্ট এখনও জারি। গৌতম গম্ভীরের শাগরেদ, কখনও ব্যাটিং কোচ, কখনও বোলিং কোচ পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করে পরিস্থিতি গুবলেট করে দিচ্ছেন। কেউ জানাচ্ছেন, পিচ প্রস্তুতকারক নাকি তাঁদের নির্দেশ বোঝেননি৷ অমন উইকেট তাঁরা চাননি। এদিকে কোচ স্বয়ং সাংবাদিক বৈঠকে খেলোয়াড়দের ট্রাকের তলায় ঠেলে ক্লিনচিট দিয়েছেন কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়কে। এমনকি ইডেন ছেড়ে গুয়াহাটি আসার দিন জড়িয়ে ধরে সাবাশিও জানিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল সেই ভিডিও!
দু’নম্বর টেস্ট শুরুর আগে ফোকাসে ছিল পিচ। প্রস্তুতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটারদের টেকনিক নিয়ে ইডেনে প্রশ্ন তুলেছিলেন গম্ভীর। ভুল যে বলেননি, তার প্রমাণ বর্ষাপাড়া ময়দান৷ যে পিচে প্রোটিয়ারা চালিয়ে-ধরে খেলে প্রায় ৫০০ তুলল, সেখানেই শেষ পাওয়া খবরে ১৮৫ রানে ৭ উইকেট খুইয়ে ধুঁকছে ভারতীয় টিম৷ রথী-মহারথীরা সাজঘরে৷ টেলএন্ডার কুলদীপ যাদব আর ওয়াশিংটন সুন্দর হাল না ধরলে এতক্ষণে বান্ডিল হয়ে ফলো-অনে যাওয়ার কথা। জাদেজা ৬, পন্থ ৭, ধ্রুব জুরেল ০ রানে আউট! গোটা টিম কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এই জুটি টিকে গেলে ভাল। নয়তো ল্যাজা গুটিয়ে যেতে সময় লাগবে না। কাল পর্যন্ত ড্র নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল অনুরাগীরা। আজ খেলা শেষে পরাজয় ও সিরিজে ফের একবার হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় কলঙ্কিত হওয়ার আতঙ্ক তাড়া করবে!
আর এই উদ্বেগ আর ভয়ের আবহে সমর্থকদের অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার করেছেন কোচ গৌতম গম্ভীর! বলা ভালো, তাঁর একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত৷ সেটা হতে পারে ব্যাটিং ক্রম নিয়ে, হতে পারে খেলোয়াড় বাছাই নিয়ে৷ একাধিক বড় ‘কল’ তিনি নিয়েছেন, যা একইসঙ্গে প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে৷
প্রথমত, ব্যাটিং অর্ডার। জুরেলকে চার নম্বরে নামানোর সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী বলছেন অনেকে। এমন পজিশনে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, কিন্তু নেতৃত্বে গিলের অনুপস্থিতি সামলাতে গম্ভীর যে পরিকল্পনা সাজালেন, তা বুমেরাং হল।
দ্বিতীয়ত, পন্থকে টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া। শুভমানের চোট যতই জটিলতা তৈরি করুক, ঋষভ এখনও টেস্টে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত নন—এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। উইকেটের পিছনে তাঁর আগ্রাসন আর ব্যাট হাতে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা—এই দুইয়ের চক্করে তিনি দলকে স্থিরতা দিতে ব্যর্থ। ডিআরএস ব্যবহারে অস্থিরতা পুরো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বোলিং পরিকল্পনাও প্রশ্নের মুখে। এই পিচে আক্রমণাত্মক ফিল্ড সেট দরকার ছিল, কিন্তু ভারত পুরো প্রথম সেশন ফিল্ডার ছড়িয়ে খেলল। বিস্মিত অনিল কুম্বলে আগেই বলেছিলেন—‘এই পিচে কিছু করতে চাইলে ঝুঁকি নিতে হবে!’ পন্থ সেটা করলেন না। এবং ব্যর্থতার তির সরে গেল কোচিং গ্রুপের দিকেই।
ফলে স্বভাবতই বিস্ফোরণ সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভারতের স্কোর যখন ১১৯/৬, তখন হ্যাশট্যাগ ‘Sack Gambhir’ ট্রেন্ডিং। কেউ লিখছেন—‘ইডেনের দোষ, গুয়াহাটির দোষ—সবাই ভুল, শুধু গম্ভীর ঠিক?’ কেউ বলছেন—‘এটা টেস্ট না টি২০ কোচিং?’ আবার কেউ কেউ মন্তব্য রেখেছেন—‘দলে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ভিতটাই নড়বড়ে।’
গত এক বছরে ভারতের টেস্ট দল যে ধারাবাহিকতা হারিয়েছে, তা পরিসংখ্যানে সাফ। দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে হোয়াইটওয়াশ, এবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ফের সেই সম্ভাবনা। রোহিত-কোহলি বাইরে, গিল আহত, বুমরাহ-সিরাজ রোটেশনে—মেরুদণ্ডই যে উধাও! তবুও প্রশ্নটা শুধু খেলোয়াড়দের নয়, গম্ভীরের কোচিং দর্শনকে কাঠগড়ায় টেনেছে। তাঁর আগ্রাসী, দ্রুত সিদ্ধান্ত, তীব্র শৃঙ্খলা—এই মডেল আইপিএলে কার্যকর হলেও টেস্টে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। পন্থের মতো ব্যাটারকে দড়ির উপর হাঁটতে পাঠালে ফল একটাই—‘অবিশ্বাস্য ধস’!
দলের ভেতরেও অস্বস্তির ইঙ্গিত। কোচ–অধিনায়ক–সিনিয়রদের যোগাযোগ পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পন্থ মাঠে একরকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কোচ বাইরে থেকে আরেকরকম নির্দেশ দিচ্ছেন। খেলোয়াড়দের বক্তব্য কোচের বক্তব্যকে খণ্ডন করছে। সেটা যে স্থিতিশীল ড্রেসিং রুমের লক্ষণ নয়, বলাই বাহুল্য।
এই সব মিলিয়ে ভারতের সমস্যাটা এখন স্পষ্ট—শুধু ব্যাটিং টেকনিক বা পিচ নয়, এটা মোট পরিকল্পনার ভাঙন। গম্ভীরের দর্শন, পন্থের অপরিণত নেতৃত্ব, স্কোয়াডের কম্বিনেশন, সিনিয়রদের অনুপস্থিতি—সব মিলেই পরিস্থিতি বিপন্ন। দ্বিতীয় টেস্ট হাতছাড়া হলে সিরিজ হার, হোয়াইটওয়াশ!
আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘুরে দাঁড়ানোর রাস্তা কোথায়? কোচ কি পরিকল্পনা বদলাবেন? নেতৃত্বে কি পরিবর্তন দরকার? নাকি ভারতীয় ক্রিকেট আরও এক টালমাটাল সময়ের দিকে এগোচ্ছে?
উত্তর মেলেনি। ইঙ্গিত, আবছা হলেও, সমর্থকদের হ্যাশট্যাগে লুকনো!