ক্রিকেটে ফেরা সহজ ছিল না। শরীর আগের মতো নয়… সন্দেহ জানান নির্বাচকদের বড় অংশ। কিন্তু যুবরাজের নিজের কাছে একটাই তাগিদ—ফিরে আসা, তারপর নিজেকে প্রমাণ করা।

যুবরাজ সিং
শেষ আপডেট: 6 January 2026 10:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনার ঠিক পরেই জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। শিয়রে শমন… কর্কট-সংক্রমণ! দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিতে ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট’—সেই যুবরাজকেই (Yuvraj Singh) কয়েক মাসের মধ্যে শুনতে হয়েছিল ভয়ানক বাক্যটা: ‘বাঁচার সময় হয়তো আর তিন থেকে ছয় মাস’। ক্যানসারের বিরুদ্ধে সেই লড়াই, মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখা, তারপর সেখান থেকে ফিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন—এই পুরো পর্ব আজও খেলদুনিয়ার সবচেয়ে অনুপ্রেরণা জোগানো গল্পগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকবে।
বিশ্বকাপের নায়ক থেকে রোগশয্যা
২০১১ সালে ভারতে বিশ্বকাপ জয়ে যুবরাজ কার্যত দলের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠেন। ব্যাট হাতে রান, বল হাতে উইকেট—সব মিলিয়ে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স। কিন্তু এগারোর টুর্নামেন্ট জুড়ে যুবির শরীর ভালো ঠেকছিল না। ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট—একগাদা উপসর্গ থাকলেও তখন কেউ বুঝতে পারেননি ভেতরে কী ভয়ংকর অসুখ বাসা বাঁধছে।
বিশ্বকাপের কয়েক মাস পর পরীক্ষা। তখনই ধরা পড়ে বিরল গোত্রের ক্যানসার। ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের মধ্যিখানে টিউমার। চিকিৎসকদের কথায়, চিকিৎসা না হলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা প্রবল। যুবরাজ পরে জানান, তাঁকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—সময় খুব কম। যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যুর থাবা নেমে আসতে পারে। আজ সেই দিন ফিরে দেখতে বসে প্রাক্তন ক্রিকেটারের উপলব্ধি, ‘যখন কেউ বলে দেয়, তোমার হাতে তিন থেকে ছয় মাস সময় আছে, তখন প্রথম ভাবনাটাই জন্মায়—মরে যাব কি না!’
আমেরিকায় চিকিৎসা, মানসিক যুদ্ধ
সময়টা উল্লেখযোগ্য, কারণ ঠিক তখনই যুবরাজের টেস্ট কেরিয়ার একটু একটু করে গতি পাচ্ছিল। সাত বছর অপেক্ষার পর নিয়মিত জায়গা মিলছিল ভারতের টেস্ট দলে। অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতিও শুরু। কিন্তু সব থেমে যায় এক নিমেষে, এক ঝটকায়। চিকিৎসার জন্য যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রে। কেমোথেরাপির কঠিন পর্ব—শারীরিক যন্ত্রণা যেমন ছিল, তেমনই ভয়ংকর মানসিক চাপ। এই সময় যুবির বড় ভরসা হয়ে ওঠেন, সাহস জোগান খ্যাতনামা ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডক্টর লরেন্স আইনহর্ন (Dr Lawrence Einhorn)। ‘ডক্টর আইনহর্ন যখন বলেছিলেন, “তুমি এখান থেকে এমন একজন মানুষ হয়ে বেরোবে, যার কখনও ক্যানসার ছিল না”—ওই কথাগুলো আমায় বাঁচিয়ে রাখে!’ স্মৃতিচারণ যুবরাজের। এক লাইনের সেই আশ্বাসই তাঁকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়!
মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসা
২০১২ সালে সব পরীক্ষার পর যখন চিকিৎসকেরা সবুজ সঙ্কেত দেন, যুবরাজের কাছে সেটা দ্বিতীয় জীবন। ক্রিকেটে ফেরা সহজ ছিল না। শরীর আগের মতো নয়… সন্দেহ জানান নির্বাচকদের বড় অংশ। কিন্তু যুবরাজের নিজের কাছে একটাই তাগিদ—ফিরে আসা, তারপর নিজেকে প্রমাণ করা। ‘আমার ভেতরের লড়াই-ই আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। সবাই যখন বলছিল সম্ভব নয়, তখনই দেখাতে চেয়েছিলাম—সবকিছু সম্ভব!’ অকপট সুরে স্বীকারোক্তি যুবির।
প্রত্যাবর্তনের পরেও স্মরণীয় ইনিংস এসেছে। ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টি–২০ ম্যাচে ৭৭* (৩৫), ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কটকে ১৫০—সবই হয়ে ওঠে মৃত্যুকে হারিয়ে কামব্যাক করা এক ক্রিকেটারের দৃঢ়, বলিষ্ঠ বার্তা। ২০১৭ সালেই শেষবার ভারতের জার্সিতে মাঠে নামা। শেষমেশ ২০১৯ সালে অবসর ঘোষণা করেন যুবরাজ সিং। কিন্তু কেরিয়ার শুধু রান বা উইকেটের হিসেব নয়। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার এই অধ্যায় তাঁকে ক্রীড়াজগতের বাইরেও এক অনন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলেছে।