এখন প্রশ্ন একটাই। এই ছন্দ কি তিনি ধারাবাহিকভাবে বড় পেস আক্রমণের বিরুদ্ধে ধরে রাখতে পারবেন? নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আংশিক উত্তর মিলেছে। কঠিন পরীক্ষাগুলো এখনও বাকি।
.jpeg.webp)
সূর্যকুমার যাদব
শেষ আপডেট: 10 February 2026 14:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। রান নেই। আত্মবিশ্বাসে ফাটল। চতুর্দিকে উঠেছিল প্রশ্ন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, যেটা খুব কম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার নেন—সূর্য সরে দাঁড়ালেন। কিটব্যাগ বন্ধ করলেন। ব্যাট ছুঁলেন পর্যন্ত না। ক্রিকেট থেকে পুরদস্তুর ‘নো কানেকশন’!
গত ডিসেম্বর, প্রকাশ্যে বলেছিলেন—‘ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার আপাতত উধাও। কিন্তু খুব একটা বেশিদিনের নয়!’ কথাটা শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়। নিজের কাছেও একরকম স্বীকারোক্তি ছিল। নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পরিসংখ্যান ভয়াবহ—১১ ইনিংসে মাত্র ১০০ রান! ভারতের টি-২০ অধিনায়ক ব্যাট হাতে হয়ে ওঠেন নির্বাচকদের প্রবল অস্বস্তির কারণ!
এই সময়টাই তাঁকে ঠেলে দিল বিরতিতে। চাপের বধ্যভূমি থেকে নিজেকে জোর করে সরিয়ে তিনি হাঁটা দিলেন উল্টো দিকে।
গান বদলেই ফর্ম বদল?
দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়ার প্রশ্নের জবাবে সূর্য বলতেন—তিনি ‘আউট অফ ফর্ম’ নন, ‘আউট অফ রান’! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই বিশ্বাসেও চিড় ধরে। বন্ধুদের খোলাখুলি মতামত চাইতে থাকেন—কোথায় ভুল হচ্ছে? কেন পছন্দের শট বেরোচ্ছে না? সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তন ধরা পড়ে দৈনন্দিন জীবনে। একসময় গাড়ির স্পিকারে যে বেস-কম্পিত ‘পার্টি সং’ চলত, তার জায়গা নিল ভক্তিগীতি। ‘হনুমান চালিশা’ হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বেশি শোনা ট্র্যাক। কোনও লোকদেখানো আধ্যাত্মিকতা নয়। বরং নিজের ভেতরে ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা। যা কাজে দিল নিমেষে!
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে টি-২০ সিরিজ শেষ হওয়ার পরই কিটব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলেন। স্ত্রীকে জানিয়ে দেন, নতুন বছরের আগে ব্যাট ছোঁবেন না। মাথার ভেতরের কোলাহলটা থামানো দরকার। আর এই বিরতিই হয়ে উঠল সূর্যের সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট।
ছন্দ হারানোর বিজ্ঞান: কেন থেমে গিয়েছিল সূর্যের ব্যাট?
ব্যাট হাতে সূর্যকুমার যাদব মানেই ফটোজেনিক! তাঁর শটগুলো যেন ক্যামেরার জন্য বানানো। পিছনের পায়ে ভর দিয়ে, শরীর হেলে পড়ছে, অথচ কব্জির শেষ মুহূর্তের খেলায় বল উড়ে যাচ্ছে স্কোয়ার লেগের উপর দিয়ে! হাঁটু মুড়ে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, কখনও এক হাতে—এমন শট ক্রিকেটে হাতেগোনা কয়েকজনই খেলতে পারেন। এই তালিকায় একমাত্র প্রতিতুলনা এবি ডি ভিলিয়ার্স (AB de Villiers)।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছিল অন্য কথা। গত বছর বেশিরভাগ সময় আউট হয়েছেন পেসারদের বিরুদ্ধে। তাও ইনিংসের শুরুতেই। প্রথম ১০ বলের মধ্যে সিংহভাগ ঝুঁকি। কন্ট্রোল পার্সেন্টেজ কমে যাচ্ছিল।
আরও একটা সূক্ষ্ম ব্যাপার ধরা পড়ে: ট্রেডমার্ক শট—স্কোয়ার লেগের পিছনে পেসারদের বল পাঠানো—আগের মতো কার্যকর হচ্ছিল না। কব্জির সেই চেনা নমনীয়তা কি ক্রমশ উধাও? সওয়ালের জবাব খোঁজেন নিজেই। ঘাটতি মেরামতে তিনি বেশি করে ‘ডাউন দ্য গ্রাউন্ড’ খেলতে শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও ঠিকমতো শরীর ঢোকাতে না পারার সমস্যা। নিট ফল: মিড-অন, মিড-অফে লোপ্পা ক্যাচ। আসলে একজন ব্যাটসম্যানের ভারসাম্য নষ্ট হলেই বোলাররা ঘাতক হয়ে ওঠে। সূর্যের বিরুদ্ধে সিমাররা সেটাই করছিল। এই জায়গাতেই বিপন্ন ব্যাটার বুঝে গেলেন—আর টানাটানি নয়। এবার থামা দরকার।
প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত: আমেরিকা ম্যাচের ৮৪ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নিউজিল্যান্ড সিরিজে ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। শরীরটা হালকা। মাথা পরিষ্কার। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে, যুক্তরাষ্ট্রের (USA) বিরুদ্ধে সেই ৮৪ রানের ইনিংস আলাদা করে জাত চেনাল। হ্যাঁ, মার্কিন বোলিং আক্রমণ খুব শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু পরিবেশ বিচার করাও জরুরি! ভারত তখন ৭৭/৬। ভয়ঙ্কর চাপের মুহূর্ত। আগে হলে সূর্য তাড়াহুড়ো করতেন। এবার করলেন না। সময় নিলেন। নিজেকে গোছালেন, ইনিংস গড়লেন। কয়েকটা শট চোখে লেগে থাকার মতো। সৌরভ নেত্রাভালকারের (Saurabh Netravalkar) বিরুদ্ধে এগিয়ে এসে, তারপর হঠাৎ হাঁটু মুড়ে স্কোয়ার লেগের পিছনে পাঠানো। ১৯তম ওভারে শ্যাডলি ভ্যান স্কালকউইকের (Shadley van Schalkwyk) বল অফের বাইরে থেকে টেনে নিয়ে স্কোয়ার লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা। এগুলো শুধু রান নয়, ফর্মে ফেরার প্রচ্ছন্ন বার্তা!
আরও বড় কথা—ধৈর্য। যখন ব্যাট নীরব ছিল, তখন সূর্য অধৈর্য হয়ে উঠতেন। এবার তিনি অপেক্ষা করলেন। আইপিএলে তাঁর সেরা সময়গুলোতে যে গুণটা ছিল—ফ্রেনেটিক ফরম্যাটেও ইনিংস তৈরি করার ক্ষমতা—সেটা ফিরে আসতে দেখা গেল।
এখন প্রশ্ন একটাই। এই ছন্দ কি তিনি ধারাবাহিকভাবে বড় পেস আক্রমণের বিরুদ্ধে ধরে রাখতে পারবেন? নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আংশিক উত্তর মিলেছে। কঠিন পরীক্ষাগুলো এখনও বাকি। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—এই খারাপ সময়ে তিনি অধিনায়ক হিসেবে উজ্জ্বল, এখনও তাই। আর ব্যাটার সূর্যকুমার? তিনিও ফিরছেন। ধীরপায়ে। এক একটা দুরূহ কোণের শট হাঁকিয়ে।