এই সাফল্য কি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে? নাকি ইতিহাসের পাতায় পাদটীকা হিসেবে আত্মগোপন করেছে? যুগান্তর পেরিয়ে এই কৈফিয়ত সবচেয়ে ভাল দিতে পারবেন ভারতের নাগরিক, যাঁদের বড় অংশই ক্রিকেটকে ‘ধর্ম’ জ্ঞানে অর্চনা করে থাকেন।

১৯১১ সালের জাতীয় ক্রিকেট দল
শেষ আপডেট: 18 June 2025 18:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯১১-র গ্রীষ্ম।
আতলান্তিকের প্রণালী বেয়ে ভেসে চলেছে একটি জাহাজ। ডেকে বসে সূর্যাস্ত দেখছেন কেউ। সাগরের নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে তক্ষুনি গন্তব্যে পৌঁছনোর উন্মাদনায় অধীর অনেকে। দু-একজন সমুদ্রপীড়ায় কাতর।
সেদিন মহারাজা ভূপিন্দর সিংয়ের নেতৃত্বে বিলাতযাত্রী প্রায় পনেরো জন ক্রিকেটার জানতেন না ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের শুরুয়াত হতে চলেছে। কাহিনিতে কেউ মুখ্য চরিত্র নন—সকলেই নায়ক। পরাধীন দেশ যখন লড়ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, সংঘাত চলছে জাতিভেদ-বর্ণভেদ নিয়ে, তখন ‘কালাপানি’ পেরিয়ে শাসক ইংরেজদের ডেরায় গিয়ে চোখে চোখ রেখে খেলে আসার হিম্মত দেখান তাঁরা।
জয়-পরাজয় তুচ্ছ। সমস্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, স্বাধীনতা আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে খেলার ময়দানে লড়াইকে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কিলভিরি শেষাচারি, বেঙ্গালোর জয়রামের মতো একঝাঁক উদ্যমী তরুণ। ১৯১১ সালেই প্রথমবার ইংল্যান্ডে পা রাখে পুরোদস্তুর ভারতীয়দের নিয়ে গড়া ‘জাতীয় দল’। এরপর ক্রিকেটের ময়দানে একের পর এক নজির গড়বে টিম ইন্ডিয়া। কিন্তু সোনালি স্বপ্নের জার্নি শুরু হয় আজ থেকে ১০৪ বছর আগে!
যদিও বিলাতে খেলতে যাওয়ার চল নতুন নয়। উনিশ শতকের শেষে পার্সিদের তরফে দু’দফায় দুটি দল ব্রিটেনে যায়। একাধিক ম্যাচে মাঠে নামে। মোটামুটি গোছের সাফল্য আসে।
কিন্তু সেটা ছিল বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। ১৯১১ সালে যেটা ঘটল, তা নজিরবিহীন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও সমাজের খেলোয়াড় হাতে হাত মিলয়ে এগিয়ে এল।
কেমন ছিল সেই বিন্যাস? ক্রিকেটারের যে তালিকা রেকর্ড বুকে নথিভুক্ত, তা ঘাঁটতেই মালুম হয়, দল গড়া হয়েছিল ছ’জন পার্সি, পাঁচ হিন্দু এবং তিন জন মুসলিম নিয়ে। আর ছিলেন দু’জন দলিত। যাদের সমাজের মূলস্রোত মেনে নেয়নি। স্বদেশের মাটিতে অচ্ছুৎ যাঁরা, তাঁরাই দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে জাহাজে ওঠেন। পেরোন আতলান্তিক। নামেন ব্রিটেনের ময়দানে। ওড়ান বিজয়-পতাকা!
অথচ এই এক সুতোয় বাঁধার কাজটা মোটেও সহজ ছিল না! বাধা এসেছিল উপরের মহল, সমাজের তথাকথিত উচ্চবর্গ থেকে। রঞ্জিত সিংকে সামনে রেখে গোড়ায় দল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে খেলাধুলোয় উৎসাহ হারিয়েছেন মহারাজ। নিজের রাজ্যের প্লেগ সামাল দিতে নাজেহাল। গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে খরা, শস্যের আকাল। মানুষ অভুক্ত, অনাহারে মারা যাচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধ। সেখানে ক্রিকেট খেলতে বিলাতযাত্রা চোখে লাগে!
রঞ্জিত সিং সরে দাঁড়াতে বাকি রাজ্যের মহারাজরাও দোনোমনো করতে শুরু করেন। একে একে হাত তুলে নেন মহারাজ সয়াজিরাও গায়কোয়াড় এবং কোচবিহারের নৃপেন্দ্র নারায়ণ। যখন মনে হচ্ছে, গোড়াতেই সবকিছু ভেস্তে যাবে, বিদেশ যাওয়া তো দূর, দলই তৈরি হবে না, ঠিক তখন এগিয়ে আসেন পাতিয়ালার মহারাজ ভূপিন্দর সিং। হাতে হাত মেলান মন্ত্রী কেখাশ্রু মিস্ত্রি।
এরপর শুধু মহারাজের অন্দরমহল নয়। সারা দেশ থেকে দলে দলে ‘ক্রিকেটার’ আবেদন জমা দেন। চলে ঝাড়াই-বাছাই। শেষমেশ ১৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হয়। ১৯১১ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু। ১ জুন থেকে আরম্ভ হয় সিরিজ। চলে ২৬ অগস্ট পর্যন্ত। নেতৃত্ব দেন ভূপিন্দর। বয়স উনিশের চৌকাঠও পেরোয়নি। কিন্তু বুকে একরাশ স্বপ্ন। যদিও উদ্যম সত্ত্বেও সিরিজের মাঝপথ থেকে অসুস্থতার জেরে সরে যেতে হয় মহারাজ ভূপিন্দরকে।
ইতিহাস বলছে, নবাব-বাদশা নন। ময়দানে আসল নায়ক হয়ে উঠেছিলেন যিনি, তিনি একজন দলিত। নাম: পালোয়াঙ্কর বালু। বাঁহাতি স্পিনার। কাউন্টি ব্যাটসম্যানদের ঝিঁঝিঁ লাগে। অমন ঘূর্ণি ডেলিভারি পেস, সিম খেলে হাত পাকানো ইংরেজ ব্যাটাররা চোখে দেখেননি।
দেশের উঁচু জাত মানুষ জ্ঞান করে না। অথচ বল হাতে দেশেরই মান বাঁচান বালু। নেন একশোর উপর উইকেট। ২৩ টেস্টে মাত্র ছ’টি ম্যাচ জিতেছিল ভারতীয় দল। দুটি ড্র, পনেরোটি পরাজয়। ব্যাট হাতে শিরোনামে উঠে আসেন এস কোলা ও জে মিস্ত্রির মতো ব্যাটসম্যান। বাকিরা ইয়র্কশায়ার, লেস্টারশায়ারের স্যাঁতসেঁতে পিচে খুব একটা সুবিধে করতে পারেননি। সমালোচকরা ভারতীয় দলের দুর্বল ব্যাটিং, জঘন্য ফিল্ডিং এবং খারাপ ফিটনেসকে তুলোধনা করলেও স্মরণীয় হতে থাকবে এগারো জন ‘পরাধীন’ ক্রিকেটারের অদম্য লড়াই।
এই সাফল্য কি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে? নাকি ইতিহাসের পাতায় পাদটীকা হিসেবে আত্মগোপন করেছে? যুগান্তর পেরিয়ে এই কৈফিয়ত সবচেয়ে ভাল দিতে পারবেন ভারতের নাগরিক, যাঁদের বড় অংশই ক্রিকেটকে ‘ধর্ম’ জ্ঞানে অর্চনা করে থাকেন। কিন্তু দশক, শতক পেরিয়ে যে সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়েছে টিম ইন্ডিয়া, তুলেছে বিশ্বজয়ের রোশনাই, তার সলতে পাকানোর কাজ কিন্তু শুরু হয়েছিল ১৯১১ সালেরর সেই জাহাজযাত্রায়।