অধিনায়ক শুভমান গিল নেই। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে স্থিরতা, ধৈর্য, উপযুক্ত পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা—এসবই যেন উবে গেছে। তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে।
.jpeg.webp)
রবীন্দ্র জাদেজা
শেষ আপডেট: 25 November 2025 18:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্ষাপাড়ার গ্যালারিতে তখন একটাই গুঞ্জন—আরও একটা ইনিংস ধস কি অপেক্ষা করছে?
৫৪৯ রানের পাহাড় দেখা যাচ্ছে না, বরং চোখে পড়ছে দলের আত্মবিশ্বাসহীনতার অতল খাদ। আর ঠিক এই সময়েই রবীন্দ্র জাদেজা বলছেন—‘ড্র করলে ওটাই জয়!’ কথাটা শুনে প্রথম দৃষ্টিতে অবাক লাগে, কিন্তু পরিস্থিতি বুঝলে তাৎপর্য স্পষ্ট—এই ভারতীয় দল এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরাজয় এড়ানোই বড় প্রাপ্তি। আর এখানেই প্রশ্ন—লাল বলের ক্রিকেটে আর কতটা পিছু হটবে ভারতীয় দল?
গুয়াহাটির চতুর্থ দিনের শেষ সেশন টিম ইন্ডিয়ার ব্যাটিংয়ের সাম্প্রতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বল হাতে যখন ভারত বোলিং করছিল, তখন পিচ যেন ‘হাইওয়ে’। কিন্তু ব্যাটিং করতে নামতে না নামতেই সেই বাঁধানো সড়ক বদলে গেল বাম্পি লেনে। মার্কো জানসেন (Marco Jansen) ভালো লেন্থ থেকে এমন বাউন্সার তুললেন, যে আঙুলে চোট লেগে যশস্বী জয়সওয়ালের (Yashasvi Jaiswal) চোখমুখ ব্যথায় বিকৃত হয়ে গেল। তার পর সাইমন হার্মার (Simon Harmer)—যাঁর স্পিনে সিরিজজুড়ে টিম ইন্ডিয়া দিশেহারা—কেএল রাহুলের (KL Rahul) ব্যাট-প্যাডের ফাঁক এতটাই চওড়া, যে ট্রাকও বুঝি গলে যেতে পারত!
২৭/২—শুধু স্কোরবোর্ড নয়, মানসিকতারও মাপকাঠিও বটে।
কিন্তু কেন এভাবে ভেঙে পড়ছে ভারতীয় ব্যাটিং? দুই টেস্ট মিলিয়ে দল একবারও ২৫০ পেরোয়নি। কলকাতায় ১৮৯ ও ৯৩। গুয়াহাটিতে ২০১। এরপর ৫৪৯ তাড়া করার আগেই আবার শুরু ব্যবসায়িক ছুটির মতো আউট-ইন। অধিনায়ক শুভমান গিল নেই। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে স্থিরতা, ধৈর্য, উপযুক্ত পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা—এসবই যেন উবে গেছে। তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে। জানসেন বা হার্মার শুধু বল হাতে নয়—বুদ্ধিমত্তা দিয়েও ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার ভুল শট খেলতে বাধ্য করেছে!
স্টাবস (Tristan Stubbs) ৯৪ করে বোল্ড হওয়ার পর টেম্বা বাভুমা ইনিংস ডিক্লেয়ার ঘোষণা করেন। তখনই লিড ৫০০ ছুঁয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—আরও আগেই ঘোষণা করা যেত। কিন্তু প্রোটিয়াদের আত্মবিশ্বাস যে কোথায়, তা বোঝা যায় তাদের শরীরী ভাষায়। ভারত তো আর ২ দিনেও ২৫০ করতে পারেনি। ৫৪৯ রান তুলবে কী করে?
ভারতের ফিল্ডিং—উদাসীনতা না আত্মসমর্পণ?
সত্যি বলতে, গম্ভীরের ছাত্রেরা দ্বিতীয় ইনিংসে এমনভাবে ফিল্ডিং করেছে যেন সবাই অপেক্ষায়, কখন বাভুমা ডিক্লেয়ার ঘোষণা করবেন। চাপ তৈরি করা দূর অস্ত, ফিল্ডাররা যেন সময় গুনছিল। কোনও দল যদি ঘরের মাঠে দু’দিনেও লড়াই দিতে না পারে, সেটা চরম সতর্কসংকেতই বটে।
এই পরিস্থিতিতে জাদেজা স্পষ্ট জানিয়েছেন—দিনের প্রথম সেশন যদি উইকেট না পড়ে, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের ওপর চাপ বাড়বে। আর পুরো দিন ব্যাট করতে পারলে ড্রয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। যা আসলে ‘জয়ের সমান’। কথাটা শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তব কঠিন। ভারত গত ৪৫ বছরে একবারই ৯৫ ওভার খেলে লড়াই ড্র করতে পেরেছে। কাল, পঞ্চম দিন, পিচ আরও টার্ন করবে, বাউন্স করবে—জাদেজা নিজেই বলছেন। ফলে ড্রয়ের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত বলেই মনে হচ্ছে।
এই সিরিজে ভেসে উঠেছে কিছু গভীর সমস্যা—পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করার অক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও সংযমের ঘাটতি, কোচিং স্টাফের পরিকল্পনার ছন্নছাড়া ভাব। একসময় ঘরের মাঠে ভারত ছিল অপরাজেয়। এখন পরিস্থিতি এমন যে, দু’টেস্ট মিলিয়ে ৭০০-৮০০ রান উঠছে না। তরুণদের উপর অতি নির্ভরতা, পরীক্ষানিরীক্ষা, সিনিয়রদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে টিম ইন্ডিয়ার রোডম্যাপ প্রশ্নচিহ্নে ভরপুর। গত ১৩ মাসে দল দ্বিতীয়বার ঘরোয়া সিরিজে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হওয়ার মুখে। এবং সেটা দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে—যারা ঘরের মাঠেও অনেক সময় টেস্টে ধুঁকছে। এই অবস্থায় ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে পৌঁছবে—এই আশা অবাস্তব শোনাচ্ছে।
প্রশ্ন শুধু একটাই—আর কতটা পিছিয়ে গেলে টিম ম্যানেজমেন্টের ঘুম ভাঙবে?