সাধারণত বেশিরভাগ হিন্দু মন্দির পূর্বমুখী হলেও, সিমাচলম মন্দির পশ্চিমমুখী। আগম–গ্রন্থ ও স্থানীয় আচার অনুযায়ী, পশ্চিমমুখী মন্দির বিজয়ের প্রতীক।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 7 December 2025 17:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে দুরন্ত কায়দায় ওয়ানডে সিরিজ শেষ করেছেন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। তিন ম্যাচে দুই শতরান, একখানা অর্ধশতরান, মোট ৩০২ রান—সিরিজ–সেরার পাশাপাশি বছরশেষে দেশের সেরা ওডিআই ব্যাটারের আসনে। আর ঠিক তারপরের দিনই বিরাটকে দেখা গেল একেবারেই অন্য মুডে। ক্রিকেট কিট নয়, সাধারণ পোশাকে বিশাখাপত্তনমের সিমাচলম মন্দিরে (Simhachalam Temple) গিয়ে পুজো দিলেন টিম ইন্ডিয়ার সিনিয়র ব্যাটার।
বিশাখাপত্তনমের শেষ ওডিআই–তে দক্ষিণ আফ্রিকাকে (South Africa) ৯ উইকেটে হারিয়ে সিরিজ ২-১ জিতেছে ভারত। ডি ককের সেঞ্চুরিতে ২৭০ তুলেও প্রভুত্ব দেখাতে ব্যর্থ প্রোটিয়া বোলিং। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ (Prasidh Krishna) ও কুলদীপ যাদবের (Kuldeep Yadav) স্পেলে চাপে পড়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং। জবাবে যশস্বী জয়সওয়ালের সেঞ্চুরি, রোহিত শর্মা ও বিরাটের দ্রুত হাফসেঞ্চুরি—৪০ ওভারেই ম্যাচ শেষ! সিরিজে ৬৫ গড় ও ১১৭-এর বেশি স্ট্রাইক–রেটে রান তুলেছেন কোহলি। বছরের শেষে তাঁর ওডিআই রানসংখ্যান দাঁড়িয়েছে ৬৫১–এ (IND vs SA ODI Series 2025)।

এই ব্যস্ত সূচির মধ্যে এবার শান্ত, নিরিবিলি মন্দির–চত্বরে গিয়ে একা প্রার্থনা করলেন প্রাক্তন অধিনায়ক। সিমাচলম পাহাড়ের গা ঘেঁষে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উঁচুতে থাকা শ্রী বরাহ লক্ষ্মী নৃসিংহর (Varaha Lakshmi Narasimha) মন্দিরটি বিশাখাপত্তনম শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক গন্তব্য। এই মন্দিরে ভগবান বিষ্ণু বিরল এক মূর্তিতে পুজিত হন—বরাহ নৃসিংহ (Varaha Narasimha)। মানে একই বিগ্রহে দুই অবতারের মিলিত রূপ। পুরাণে কথিত, প্রহ্লাদকে বাঁচাতে এবং হিরণ্যাক্ষ–হিরণ্যকশিপুদের বিনাশ–গাথা নিয়েই গড়ে উঠেছে এই মন্দিরের ভাস্কর্য, খোদাই সমস্ত মোটিফ। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, প্রহ্লাদই নাকি প্রথম এখানে মন্দির নির্মাণ করেন। পরে অন্য যু্গে তা নষ্ট হয়ে গেলে ফের একবার গড়ে তোলেন পুরুরবা।
সিমাচলমের মূল দেবমূর্তি সারা বছরই চন্দনে লেপা। চন্দন–আবৃত বিগ্রহ অনেকটা শিবলিঙ্গের মতো দেখায়। বছরে একবার, আক্ষয় তৃতীয়ার (Akshaya Tritiya) দিন ভোরে সেই আবরণ তুলে কিছু সময়ের জন্য ভক্তদের সামনে আনা হয় নিরাভরণ বিরাহ নৃসিংহর মূর্তি। রাত নামতেই আবার নতুন করে চন্দন মাখানো শুরু!
স্রেফ ইতিহাস নয়। স্থাপত্যের দিক দিয়েও সিমাচলম মন্দির অনন্য। পূর্বতন কালিঙ্গ অঞ্চলের (Kalingan architecture) একমাত্র বড় বৈষ্ণব মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম। বর্তমান গর্ভগৃহ ও মূল কাঠামো তৈরি হয় ত্রয়োদশ শতকে রাজা প্রথম নরসিংহদেবের আমলে। পরে তাঁর পুত্র ভানুদেব মূর্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নানা অনুষঙ্গ যোগ করেন। বাইরে থেকে পুরো মন্দির দেখায় অনেকটা দূর্গের মতো—তিনখানা পাঁচিল, একাধিক ফটক, পাঁচ–তলা রাজগোপুরম (rajagopuram), আর ভেতরে পিরামিড–আকৃতির খিলান।
দক্ষিণ ভারতের একাধিক শৈলীর মিশেলে তৈরি এই মন্দিরের গায়ে গায়ে খোদাই করা বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার, লক্ষ্মী আর সিংহের মোটিফ। গর্ভগৃহের বাইরের দেওয়ালে চোখে পড়বে নৃসিংহের হিরণ্যকশিপু–বধ, বরাহের পৃথিবী উদ্ধারের দৃশ্য, কৃষ্ণের কালীয়দমন ও গোবর্ধনধারণ—সবই খাঁটি কালিঙ্গ–শৈলীর উদাহরণ।

বিশেষত্ব আরও এক জায়গায়—সাধারণত বেশিরভাগ হিন্দু মন্দির পূর্বমুখী হলেও, সিমাচলম মন্দির পশ্চিমমুখী। আগম–গ্রন্থ ও স্থানীয় আচার অনুযায়ী, পশ্চিমমুখী মন্দির বিজয়ের প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরেই এই মন্দিরকে উপকূল আন্ধ্রের অন্যতম শক্তিশালী তীর্থ হিসেবে ধরা হয়। অন্ধ্র, ওড়িশা, তামিলনাডু—তিন রাজ্য থেকেই ভক্তরা নিয়মিত আসেন।
ঐতিহাসিকভাবে সিমাচলম মন্দির পেয়েছে চোল (Chola), গঙ্গা, রেড্ডি, গজপতি, বিজয়নগর—বহু রাজবংশের দাক্ষিণ্য। মন্দির–চত্বরে মিলেছে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি শিলালিপি, যার বড় অংশই দানধ্যান–সংক্রান্ত। আজ রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে মন্দির কমিটি পুজো–আর্চা, উৎসব আর যাবতীয় প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকে।
অতীতে শ্রী বৈষ্ণবাচার্য রামানুজ–সহ একাধিক আচার্য এখানে এসেছেন। বরাহ নৃসিংহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলাদা সঙ্গীত–সাহিত্য পরম্পরা। এক সময় দেবদাসীরা ছিলেন মন্দিরের নিত্যসেবিকা। এখন সেই প্রথা বন্ধ। কিন্তু প্রতিদিনের প্রভাতী অর্চনা থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আরতি—সবই হয় পঞ্চরাত্র আগম (Pancharatra Agama)–মেনে।
শুধু বিরাট নন। ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরও (Gautam Gambhir) বিশাখাপত্তনমে শেষ ওডিআইয়ের আগে এই মন্দিরে এসে প্রার্থনা জানান। তাঁর কৌশল ও বোলার–রোটেশনই সিরিজের শেষ ম্যাচে তফাত গড়েছে বলে মানছেন অনেকেই। কোহলির সফর তাই শুধু ব্যক্তিগত ভক্তি বা আস্থার জায়গা থেকে নয়, দলের সাম্প্রতিক ঘুরে দাঁড়ানো–অধ্যায়ের সঙ্গেও জুড়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্যর্থ, টেস্ট থেকে সরে দাঁড়ানো, তারপর দীর্ঘ বিরতি—সব মিলিয়ে ২০২৫–এর শুরুতে বিরাটকে ঘিরে প্রশ্ন ছিল অনেক। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজে ব্যাট হাতে সেই চাপ সামলেছেন সহজ ছন্দে। এবার মাঠের বাইরে, সিমাচলম পাহাড়ের মন্দির–চত্বরে নিভৃত আরাধনায় যেন নিজের ভেতরের ভারও খানিক নামিয়ে রাখলেন বিরাট।