রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে প্রিয়াংশু আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর কণ্ঠ অসম্ভব পুরুষালি বলেই, ডাব করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 20 June 2025 17:26
ছবি: রবীন্দ্র কাব্য রহস্য
চরিত্র চিত্রণে: প্রিয়াংশু, ঋত্বিক, শ্রাবন্তী, ঋতব্রত
পরিচালনা: সায়ন্তন ঘোষাল
প্রযোজনা: এস কে মুভিজ
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭/১০
'ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে।
দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে
স্নেহময়ী তুমি মাতা।
জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা॥'
জাতীয় সংগীত জাতির প্রতীক। এই প্রতীক চিত্রপ্রতীক নয়, বাণীপ্রতীক। ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতে 'ভাগ্যবিধাতা' বলতে কি
রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের জয়গান গেয়েছিলেন? রবীন্দ্রবিরোধীরা বলেছিলেন, সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারত আগমনে প্রশস্তিমূলক 'ভারতভাগ্যবিধাতা' লেখেন গুরুদেব! যারা সামনে গুরুদেবের জয়গান করেন, তারাই পেছনে তাঁকে ঘৃণ্য অপবাদ দেন। সেই বিদ্বেষের আগুন এখনও নেভেনি। কদর্য আক্রমণের শিকার এ যুগের নেট দুনিয়াতেও হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

আজ শহরে আসছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এস কে মুভিজ প্রযোজিত সায়ন্তন ঘোষালের 'রবীন্দ্র কাব্য রহস্য' ছবিটি এই বিতর্কের ঝড়কে তুলে এনেছে পর্দায়।
রবীন্দ্রনাথের সময়, তাঁর পরবর্তী যুগ ও এই সময়, তিন যুগের মেলবন্ধনে এই ছবির প্রেক্ষাপট। একশো বছর আগের ঘটনাপ্রবাহর সঙ্গে এই সময়কে মিলিয়েছেন সায়ন্তন। ছবির প্রেক্ষাপট লন্ডন। রবীন্দ্রনাথের সময়ের লন্ডন এবং এখনকার লন্ডন, যা বেশ ইন্টারেস্টিং। রবি ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির সময় কয়েকবার লন্ডনে যাতায়াত করেছিলেন। আর ঠিক ওই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ছবির ফিকশনাল গল্প তৈরি করেছেন পরিচালক। লন্ডনবাসী এক যুবক একলব্য তাঁর পড়াশোনা বেড়ে ওঠা ওই দেশে। তিনি সিভিল সার্ভিসে থাকলেও তাঁর প্যাশন কবিতা লেখা। কবি একলব্যর একটি সুপ্ত ইচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে তাঁর কবিতা পড়াবেন। কারণ রবি ঠাকুর বারবার সেই সময় লন্ডনে যাতায়াত করতেন। কিন্তু রবি ঠাকুরের কাছাকাছি যাওয়া একলব্যের পক্ষে সম্ভবপর নয়। তখন ওখানে যেসব বাঙালি সম্প্রদায় রয়েছেন ওই যুবক তাঁদের সাহায্য চায়, যাতে রবি ঠাকুরের কাছে সে পৌঁছতে পারে। তাঁদের মধ্যে একজন একলব্যর কবিতার খাতা নিয়ে বলেন যে তিনি রবি ঠাকুরকে দিয়ে তাঁর কবিতা পড়াবেন। কিছু দিন যেতেই যুবক জানতে পারে যে সেই কবিতাগুলো চুরি করে নিয়ে নিজের নামে ছাপার অক্ষরে ভদ্রলোক প্রকাশ করেছেন, যা যুবকের সম্পূর্ণ অজানা। জানতে পেরেই তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এরপর যারা ওই যুবকের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল তাদেরকে একে একে খুন করে নিজেও আত্মঘাতী হন একলব্য। গল্পের সবে শুরু এখানে।
![Trailer [OV]](https://m.media-amazon.com/images/M/MV5BZTQ5NTA3YmItZGUxMi00ZjgzLWJlMGMtMjVlYTE1ZjAzNzQ2XkEyXkFqcGdeQXRyYW5zY29kZS13b3JrZmxvdw@@._V1_.jpg)
পরের অঙ্ক একলব্য নিজেই রচনা করে যান। আত্মহত্যা করার আগে একলব্য একটা চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে লেখা থাকে যে একশো বছর পর ওই চিঠি যেন খোলা হয়, তার আগে নয়। আত্মহত্যা করার আগে সেই চিঠি ডাকে কলকাতায় তাঁর ভাইকে পাঠিয়ে দেন তিনি। লন্ডনবাসী একলব্যর চরিত্রে অভিনয় করছেন ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়। প্রতারক ভদ্রলোকের চরিত্রে শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। একলব্য ছবির নায়ক নন। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে গল্প আবর্তিত হয়। এই সময়ের পরপর খুন হতে থাকে। আর খুন করার পর রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখে যায় খুনি। এমন কবি খুনিকে খুঁজে বার করতে এক কবি গোয়েন্দাকে আনা হয়। তিনি সাহিত্যিক কবি অভীক বোস। যে চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী। ছবির আরও এক প্রধান চরিত্র রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী হিয়া সেন, যে চরিত্রে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। ছবিতে ঋত্বিক-শ্রাবন্তী কিন্তু জুটি নন। কিন্তু দু'জনের পারস্পরিক রসায়ন ছবিটিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আর 'রবীন্দ্র কাব্য রহস্য' ছবির মূল আকর্ষণ যিনি তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গুরুদেবের চরিত্রে প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়।
প্রথমেই যাঁর কথা আসবে রবীন্দ্রনাথ আধারে প্রিয়াংশু। রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে প্রিয়াংশু আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর কণ্ঠ অসম্ভব পুরুষালি বলেই, ডাব করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। রবি ঠাকুরের কন্ঠ অনেক নরম স্বরের ছিল, সে কারণে দেবজ্যোতি মিশ্র কণ্ঠ দিয়েছেন প্রিয়াংশু রবীন্দ্রনাথকে । ছবির সংগীত পরিচালকও দেবজ্যোতি মিশ্র। প্রিয়াংশুকে নবকলেবরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেগেছে অনেকটাই। তাঁর সাধনাকে কুর্নিশ। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথ হাঁটলে চললে বা মুখ খুললে আর রবীন্দ্রনাথ লাগে না। বরং রবীন্দ্রনাথ হতে অনেকখানি এগিয়ে থাকবেন পাবলো সিজারের 'থিঙ্কিং অফ হিম' ছবির রবীন্দ্রনাথ ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। তবু প্রিয়াংশু রবীন্দ্রনাথকে হাস্যকর করে তোলেননি, সেই আভিজাত্য রেশ বজায় রেখেছেন।

ছবি মূল দুই প্রধান চরিত্র ঋত্বিক আর শ্রাবন্তী। গোয়েন্দার চালের সঙ্গে কণ্ঠে কবিতার দারুণ যুগলবন্দিতে ঋত্বিকের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়। শ্রাবন্তী কিন্তু চমকে দিয়েছেন! এই ধরণের থ্রিলার ছবিতে শ্রাবন্তী দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছেন। পরতে পরতে তাঁর চরিত্রের জট খুলেছে।
একলব্য কবির চরিত্রে ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় সপ্রতিভ অভিনয় করেছেন, তবে এই চরিত্রে আরও পরিণত অভিনেতার প্রয়োজন ছিল। ঋতব্রতর বয়স আন্দাজে চরিত্রটি অনেক উচ্চস্তরের। একলব্যর প্রেমিকা নীহারিকার চরিত্রে রাজনন্দিনী পাল ঘুম জাগানিয়া। তবে তিনি অতিথি চরিত্র। শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় ভিলেন চরিত্রে দারুণ। রবীন্দ্রসাহিত্য বিশেষজ্ঞ সুজননীল মুখোপাধ্যায় যথাযথ। তবে লন্ডনবাসী জার্নালিস্ট শালিনী সেনগুপ্তর চরিত্রে খুব ভাল লাগল বিদীপ্তা চক্রবর্তীর স্মার্ট অভিনয়।
সায়ন্তন ঘোষালের পরিচালনা খুব পরিণত। চিত্রনাট্য বেশ টানটান। কোনও অংশে মন সরালে এই ছবি থ্রিল কমে যাবে। সবথেকে আগ্রহ বাড়ায়, রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জনদের মৃত্যুর তারিখের সঙ্গে পরবর্তী যুগের কবি খুনির দিনগুলো মিলে যাওয়া রহস্য কিনারা করা।
সঙ্গীত পরিচালনায় দেবজ্যোতি মিশ্র বরাবরের মতোই ভাল। 'কত বারও ভেবেছিনু' মেখলার কণ্ঠে শ্রাবন্তীর গান পর্দায় দেখতে চোখের আরাম। তেমনই প্রতিটি রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ ছবিতে যথাযথ। যা থ্রিলার ছবির চার্ম নষ্ট করেনি।
রবীন্দ্রনাথের দৃশ্য গুলি বিশেষ করে টুবানের সিনেমাটোগ্রাফিতে বেশ ভাল।
'রবীন্দ্র কাব্য রহস্য'র কিছু প্লট হয়তো আলগা কিন্তু তবু বাংলায় এমন মার্ডার মিস্ট্রির নির্মাণ যা আশায় জাগায় টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঞ্চম জর্জের প্রশংসায় 'জন গণ মন' গানটি লেখেননি, 'ভারতভাগ্যবিধাতা' বলতে তিনি পরম ঈশ্বরকে বুঝিয়েছেন। যা ছবিটির প্লটের ক্লাইম্যাক্সকে আরও জমিয়ে তোলে।
'রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে---
গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।
তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা।
জয় জয় জয় হে, জয় রাজেশ্বর ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥'