ছোটদের কথা, ছোটদের কাজ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তারাও সম্মান, শ্রদ্ধা, গুরুত্ব আশা করে। এই ছবি আমাদের শিক্ষা দিল হাতে কিছু একটা রাখার, যদি বিপদে কাজে লেগে যায়।

'অঙ্ক কি কঠিন'। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 26 May 2025 19:06
ছবি: অঙ্ক কি কঠিন
পরিচালনা: সৌরভ পালোধী
প্রযোজনা: রানা সরকার
দ্য ওয়াল রেটিং: ৯/১০
'জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলো, অখ্যাত কীর্তির ধূলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল
সংসারের দশদিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝর ঝর বরষার মত—
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলা খেলা
চারিদিকে করি’ স্তূপাকার
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতি বৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণ নিশার।'
এই শহরের প্রান্তিক মানুষদের প্রাত্যহিক জীবনের খোঁজ রেখেছি আমরা কজন? রোজের হিসেবে তাদের আয়, যে কোনও মূহুর্তে তাদের কাজ চলে যেতে পারে, সঙ্গে আছে জীবনের বাঁকে বাঁকে বিপদের থাবা। জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো সরিয়ে দিয়েও এই মানুষগুলো এক দুঃসাহসী স্বপ্ন দেখে। না কোনও অর্থ,যশ,সম্পত্তির স্বপ্ন নয়। এক নতুন বিপ্লবের স্বপ্ন। তেমনই তিন ছোটো মানুষের এক অলীক স্বপ্নের খেলাকে সত্যি করে দেখালেন পরিচালক সৌরভ পালোধী, তাঁর 'অঙ্ক কি কঠিন' ছবিতে। আর তাঁর সেই স্বপ্নকে সত্যি করে তোলার জন্য প্রযোজক রানা সরকারের প্রশংসা প্রাপ্য। কারণ এমন গল্পকে তিনি ভরসা করেছেন। এটা আরও অনেক নবাগত পরিচালককে ছবি বানাতে সাহস জোগাবে।
![]()
'অঙ্ক' শব্দটাই ছোট থেকে অনেকের কাছে আতঙ্কের। যেমন সবার কৈশোরের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্কুলে কেশব চন্দ্র নাগের বইয়ের অঙ্ক মিলিয়ে ফেলা। অনেকে পাঠ্যবইয়ের অঙ্ক মেলাতে পারদর্শী হলেও জীবনের অঙ্ক মেলাতে পারে না। কিন্তু সৌরভ পালোধীর ছবির তিন হিরো হিরোইন ছোট বয়সেই জীবনের বড় অঙ্কটা মিলিয়ে ফেলে।
'অঙ্ক কি কঠিন' 'চন্দ্রবিন্দু'র গানে শুনেছিল বাঙালি। এবার সেই নামেই সৌরভের ছবি।
ছবির গল্পে তিনটি প্রধান চরিত্র, দুই কিশোর বাবিন (ঋদ্ধিমান বন্দ্যোপাধ্যায়), টায়ার (তপোময় দেব) আর এক কিশোরী ডলি (গীতশ্রী চক্রবর্তী), তারা এক বন্ধ হতে বসা সরকারি স্কুলের পড়ুয়া। আর সবার মতোই স্কুলশিক্ষক যখন জিজ্ঞেস করেন তারা কী হতে চায় তখন বাবিন বলে সে ডাক্তার হতে চায়, টায়ার হতে চায় ইঞ্জিনিয়ার আর ডলি হতে চায় নার্স। শুধু বলার জন্য বলা নয়, তিনজনে এই স্বপ্নতে যাপন করতে থাকে। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েই তারা 'আব্বুলিশ' বাড়িতে গড়ে ফেলে স্বপ্নের 'আরোগ্য নিকেতন'। তেমন তাদেরই এক সহপাঠী স্বপ্ন দেখে ঘুষ না নিয়ে সে সরকারি স্কুল শিক্ষক হবে। এদের বাবা-মায়েরা কিন্তু অভাবের চাপে সন্তানদের স্বপ্নগুলোকে নষ্ট করে দেন না। বরং তারাও সন্তানের স্বপ্নে যাপন করেন। দিন মজুর বাবা ফুসফুসের রোগে কাশতে কাশতেও ভাবেন তার ডাক্তার ছেলে ঠিক সারিয়ে দেবে। অথচ এত স্বপ্নদেখা কৈশোরে তাদের স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায় করোনার থাবাতে। আর খোলে না তাদের স্কুল। তবু স্বপ্ন দেখা কিন্তু এরা ছাড়ে না।

পরিচালক রূপে সৌরভ পালোধী তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। সে অর্থে কোনও বড় স্টার নেই ছবিতে, ছবির বাজেট ভীষণ অল্প, কিন্তু কথায় বলে সাধ থাকলেই সাধ্যপূরণ হয়। তেমনই অল্পেতে স্বপ্নের মতো দুঃসাহসিক উপস্থাপন 'অঙ্ক কি কঠিন'।
ছবির কিছু সংলাপ মনে দাগ কেটে যায়। অঙ্ক কষতে গিয়ে কিশোর বাবিনকে যখন তার বাবা (শঙ্কর দেবনাথ) বলেন, হাতের একটা যোগ কর? ওটা নে হিসেবে। বাবিন বলে, থাক না বাবা একটা এক হাতে, যদি কাজে লেগে যায়। এমনই হাতে থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সে বাঁচিয়ে ফেলে বাবার প্রাণ। আবার ছবির শেষে মন ভরে যায় যখন দুই খলনায়ক হয়ে ওঠে সহায় সম্বল জীবনত্রাতা। কিংবদন্তি পরিচালক তরুণ মজুমদার যেমন বলতেন 'খলনায়ক কেউ নিজের ইচ্ছেতে হয় না, পরিস্থিতি তৈরি করে।'

এই ছবির আরও দুই উল্লেখযোগ্য চরিত্র শাহরুখ আর কাজল। হিন্দু-মুসলিম প্রেমের সহজ সরল উপস্থাপন। নেই এতটুকু রক্ত, এতটুকু ভায়োলেন্স। এখানেও পরিচালক ছবির নির্মল আনন্দ নষ্ট করেননি। শাহরুখের চরিত্রে অনলাইন খাবার ডেলিভারি বয়ের ভূমিকায় প্রসূন সোমের সাবলীল অভিনয় মন কাড়ে। তেমনই তাঁর সঙ্গে পার্নো মিত্রর রসায়ন অনবদ্য। পার্নোকে অনেকদিন পর এই ছবিতে দখিন হাওয়ার মতো লাগল। এই ছবির আর এক স্তম্ভ বাবিনের বাবার চরিত্রে শঙ্কর দেবনাথের অনবদ্য অভিনয়। বাড়ি তৈরি করা দিনমজুরদের ঘামেঝরা জীবন উঠে এসেছে তাঁর চরিত্রে। বাবিনের মা সাহায্যকারিণীর কাজ করতে গিয়ে বড় অ্যাপার্টমেন্টের মালকিনের টাকা যখন তাদের কাছে ফিরিয়ে দেন, তখন দারুণ জবাব হয় উচ্চবিত্তর বিরুদ্ধে। এই চরিত্রে সঞ্জিতা দারুণ। দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছেন টায়ারের মা দীপান্বিতা নাথ। তাঁর চোখে মুখে খেলা করেছে পোক্ত অভিনয়ের ছাপ। সে পেশায় যৌনকর্মী কিন্তু মা তো মা-ই হন। যখন সেই দেহ ব্যবসার টাকা জমান একটা বিউটি পার্লার করার স্বপ্নের কৌটোতে আর ছেলে লেখা আর এক কৌটোতে, যা দেখে চোখে জল চলে আসে। ডলির নার্স মায়ের চরিত্রে উষসী চক্রবর্তী চিত্রনাট্যের দাবী মিটিয়েছেন। কিন্তু গরীব সাজতে কালো মেকআপ করেও তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের সফিস্টিকেশন ঝেড়ে ফেলতে পারেননি।

ছবির গানে রেশ রয়ে যায় লগ্নজিতা চক্রবর্তীর কন্ঠে 'একটা গল্প বলো', সমবেত কন্ঠে 'চাপ নিয়ে লাভ নেই' ছবির বাঁকে বাঁকে মন ছুঁয়ে যায়। আর ছবির শেষে পরম পাওয়া নচিকেতার কন্ঠে 'বাহান্নটা পাখি'। সংগীত পরিচালক দেবদীপ মুখোপাধ্যায় মন কাড়লেন যথাযোগ্য গানে।
এই ছবির দৈর্ঘ্য কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত হয়েছে যা আরও পরিণত সম্পাদনা আশা করে। তবু চোখ জুড়োয় অঙ্কিত সেনগুপ্তর সিনেমাটোগ্রাফি।
'অঙ্ক কি কঠিন' জীবনের কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দেখিয়ে দিল। ছোটদের কথা, ছোটদের কাজ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তারাও সম্মান, শ্রদ্ধা, গুরুত্ব আশা করে। বড়দের অজান্তেই ছোটদের অলীক পৃথিবী বাস্তবের কঠিন সমস্যাকে সহজ করে দিতে পারে। এই ছবি আমাদের শিক্ষা দিল হাতে কিছু একটা রাখার, যদি বিপদে কাজে লেগে যায়।