ছবিদার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। উনি আমাকে ভীষণ ভালবাসতেন। বাগবাজার থেকে আমি সোজা চলে গেলাম ছবিদার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 June 2025 14:33
মঞ্চ ও চলচ্চিত্র দু জায়গাতেই তিনি ছিলেন নটসম্রাট। ৬২ বছরের জীবনে বাংলা ছবি ও পেশাদার রঙ্গমঞ্চকে পৌঁছে দিয়েছিলেন আধুনিকতার আঙিনায়। তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। সেকালের থিয়েটার-ভক্তরা বলেন, অহীন্দ্র চৌধুরী-শিশিরকুমার ভাদুড়ীর পর বাংলার মঞ্চে ছিল ছবি বিশ্বাস যুগ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’, মনোজ বসুর কাহিনি নিয়ে ‘ডাকবাংলো’, দেবনারায়ণ গুপ্ত-র ‘শ্রেয়সী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’ প্রতিটি ঐতিহাসিক নাটকে ছবি বিশ্বাসের অভিনয় স্মরণীয়। সেসব ঝড়তোলা নাটকের কোনও সংরক্ষণ হয়নি বলে আজকের দর্শক সেই যুগের মাহাত্ম্য বুঝবে না। কিন্তু চলচ্চিত্র ও রঙ্গমঞ্চের স্বর্ণযুগ তখনই ছিল। আজ ছবি বিশ্বাসের প্রয়াণ দিনে তাঁর স্মৃতিকথায় দ্য ওয়ালে গল্প করলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী।
স্বর্ণযুগ থেকে এ যুগেও লিলি ফুলের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। 'অর্ধাঙ্গিনী', 'খাদ','রাজকাহিনি' ছবি থেকে 'নিম ফুলের মধু'র ঠাম্মি, লিলি আজও প্রাণোচ্ছল। তবে তাঁর অভিনয় জীবনের শুরুর দিনগুলিতে জড়িয়ে ছিল ছবি বিশ্বাসের অবদান।

লিলি চক্রবর্তী দ্য ওয়ালকে জানালেন ' 'মধ্য রাতের তারা' ছবিতে ছবি বিশ্বাসের বড় মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমি তখন একদম আনকোরা। পরিচালক পিনাকি মুখোপাধ্যায় থেকে বাড়ির সবাই বলল, পারবি তো ছবি বিশ্বাসের মতো তাবড় স্টারের সঙ্গে অভিনয় করতে? মনের জোরে আমি কিন্তু পেরেছিলাম। আরও পেরেছিলাম ছবিদার সাহচর্যে। উনি প্রথমদিনই আমার সঙ্গে খুব সহজ ভাবে মিশেছিলেন। এরপর 'বিপাশা' ছবিতে করলাম সুচিত্রা সেনের বান্ধবীর চরিত্র। আমার মতো নতুন মেয়ের সঙ্গে সুচিত্রা সেন একদমই সহজ ভাবে মেশেননি। কিন্তু ছবি বিশ্বাসের থেকে অসম্ভব স্নেহ পেলাম 'বিপাশা' করতে গিয়ে। উনি তখন অত সিনিয়র অভিনেতা কিন্তু আমাকে সেই স্টারডম বুঝতে দিলেন না।'
ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে মঞ্চে লিলির প্রথম অভিনয় 'ডাকবাংলো' নাটকে। সন্ধ্যা রায়ের পরিবর্ত হিসেবে লিলি সুযোগ পেয়েছিলেন।
এরপর আবার লিলি ছবি বিশ্বাসের মেয়ে হয়েছিলেন 'শ্রেয়সী' নাটকে। স্টার থিয়েটারে সেই নাটকে লিলির সঙ্গে ছিলেন সব বাঘা বাঘা শিল্পী— তুলসী চক্রবর্তী, কমল মিত্র, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপকুমার, সুখেন দাস প্রমুখ।
লিলি চক্রবর্তীর কথায় 'ছবিদার মেয়ের রোলে 'শ্রেয়সী' নাটকে তিনশো রজনী অভিনয় করেছিলাম স্টার থিয়েটারে। সেই নাটকে অত বড় বড় শিল্পীর সঙ্গে আমার মতো নতুন অভিনেত্রীর অভিনয়ও খুব প্রশংসিত হয়েছিল। সেখানেই অফার এল তপন সিনহার 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা' ছবির। নসুবালা চরিত্রে আমাকে পছন্দ করেছেন তপনদা। কিন্তু পনেরো দিনের আউটডোরে যেতে হবে। এদিকে 'শ্রেয়সী' নাটক তখন রমরমিয়ে চলছে। নাটকের পরিচালক, প্রযোজক, ম্যানেজার আমাকে ছাড়বেন না। তখন আমি ছবিদার শরণাপন্ন হলাম। বললাম ওঁরা আমাকে ছুটি দিচ্ছেন না। তপন সিনহার ছবির অফার শুনে ছবিদা নাটকের ম্যানেজার প্রযোজকদের ডেকে বললেন, তোমরা লিলিকে পনেরো দিনের জন্য ছাড়ো। আমাদের নাটক থেকে একটা মেয়ে তপন সিনহার ছবির অফার পেয়েছে, এটা কম কথা! একজন ভাল শিল্পী তৈরি হবে।' তখন তাঁরা ছাড়লেন। কিন্তু আমার রোলটা করতে একটি মেয়েকে আমার বাড়িতে ডেকে আমার সব পার্ট তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিলাম। স
তিনি আমার বান্ধবী ছিলেন। অফিস ক্লাবে নাটক করতেন। আমি যে কদিন করতে পারছি না, সেই মেয়েটি ছবিদার মেয়ের রোল করবেন। যাই হোক, আমি চলে গেলাম বীরভূমের লাভপুরে আউটডোরে। নসুবালার চরিত্র আমার কেরিয়ারের অন্যতম কাজ, চরিত্রটা করতে পেরেছিলাম ছবিদার সাহায্যেই।

কিন্তু যখন 'শ্রেয়সী' নাটকে ফিরলাম যে ডুপ্লিকেট মেয়েকে আমার চরিত্রে রেখে গিয়েছিলাম সে আর জায়গা ছাড়বে না। সে মেকআপ করে বসে আমায় বলছিল 'তুই তো নাটকে ফিরবি বলে যাসনি।' সে ধরে নিয়েছিল আমি আর ফিরব না। তার জায়গাটা পাকা ঐ রোলে। আমিই যাকে শিখিয়ে পড়িয়ে জায়গা কদিনের জন্য ছাড়লাম সেই এমন করল। তখন আবার আমি ছবিদার কাছে গিয়ে বললাম 'আমি আজকে ফিরে এলাম কিন্তু আমাকে মঞ্চে নামতে দেবে না বলছে। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।' ছবিদা তখন আমার হয়ে বলায় সেই ডুপ্লিকেট মেয়েকে বাদ দিয়ে আমায় নামতে দিল নাটকে।'

'শ্রেয়সী' নাটক ১৯৬২ সালে তখন রমরমিয়ে চলছে। ১১ জুন হঠাৎই খবর এল ছবি বিশ্বাস নেই! আকস্মিক দুঃসংবাদ! দেশের বাড়ি যাবার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ছবি বিশ্বাস মারা গেছেন। তিনিই সেদিন ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন। হঠাৎ বড় ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। একেবারে স্পটডেড হন ছবি বিশ্বাস। পেছনের সিটে ওঁর আত্মীয়রা আহত হলেও বেঁচে গিয়েছিলেন। বাংলা ছায়াছবি ও মঞ্চজগৎ সেদিন পিতৃহারা হয়েছিল।
সেই দিনটার কথা লিলি চক্রবর্তী বললেন 'আমি তখন বাগবাজারে থাকতাম। ছবিদার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ উনি আমাকে ভীষণ ভালবাসতেন। বাগবাজার থেকে আমি সোজা চলে গেলাম ছবিদার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে। ছবিদার মরদেহ আসতে কত লোক যে জড়ো হয়েছিল। ইন্ডাস্ট্রির লোকেরা, পাড়ার লোকেরা সবাই জড়ো হয়ে গিয়েছিল। আজকে ছবিদার মৃত্যুদিনে সেই কথা মনে পড়ছে।অত আগের দিনটার কথা আজও ভুলিনি। ছবিদা মারা যাবার পরে 'শ্রেয়সী' নাটকটা আর সেভাবে চলেনি। বন্ধ করে দেওয়া হল। পরের বছর 'শ্রেয়সী' সিনেমা হলে কাস্টিং প্রায় একই ছিল। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী, অনুপকুমার। কিন্তু আমাকে আর ছবিতে ডাকা হয়নি। তাতে যদিও কোনও আফসোস নেই। ছবিদাই তো 'শ্রেয়সী' ছবি করে যেতে পারলেন না।'