আমেরিকার ২৫% শুল্কের হুঁশিয়ারি ভারতের রপ্তানি ও শেয়ারবাজারে ধাক্কা লাগিয়েছে। শুনুন বিশ্লেষকরা কী বলছেন।

মার্কিন শুল্কে ধাক্কা! ছবি: এআই নির্মিত।
শেষ আপডেট: 1 August 2025 14:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের রফতানি ও অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল আমেরিকার ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি (US Tariff)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ১ আগস্ট থেকে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে তেল ও অস্ত্র কেনা–বেচা, তা নিয়েও অতিরিক্ত জরিমানার ইঙ্গিত দিয়েছেন (Economy Impact)।
এই ঘোষণা সামনে আসার পর থেকেই ভারতের অর্থনৈতিক মহল, শিল্পপতি থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, ভারতের মোট রপ্তানির একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রমুখী, যা প্রায় ১৭ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দেশের মোট জিডিপি-র প্রায় ২.২ শতাংশ। এই বিপুল অর্থনৈতিক স্রোতে ২৫ শতাংশ শুল্কের বাধা মানে, ভারতের বহু খাতেই মারাত্মক ধাক্কা লাগতে পারে।
শুধু রপ্তানিই নয়, এর সরাসরি প্রভাব দেখা দিয়েছে ভারতের শেয়ার বাজারে। শুল্ক ঘোষণার দিন সেনসেক্স খুলেই ৬০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। নিফটি নামে প্রায় ০.৭ শতাংশ। রিলায়েন্স, এয়ারটেল, ইনফোসিস, টিসিএসের মতো বড় কোম্পানির শেয়ারে বড়সড় পতন দেখা যায়। একদিনেই বাজার থেকে উবে যায় প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নিছকই এক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক কূটনীতিও কাজ করছে। ভারত এখন রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কিনছে, যা আমেরিকার নজরে পড়েছে বহু দিন ধরেই। এই কারণেই হুঁশিয়ারি হিসেবে ট্রাম্প ‘অতিরিক্ত জরিমানা’-র কথা তুলেছেন। যদিও কী ধরনের জরিমানা হবে, তা এখনও খোলসা করেননি তিনি।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে গয়না, বস্ত্র, ওষুধ এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্প। গয়না ও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ, শুল্কে দাম বাড়লে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যাবে। একইভাবে, ওষুধ শিল্পের বার্ষিক প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রেও সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে, তাতে অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি ঘটবে। এতে ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পকেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
এই শুল্ক ঘোষণার জেরে ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষণ সংস্থা ICRA জানিয়েছে, এই শুল্কে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০ থেকে ৪০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি পুরোপুরি ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তা হলে ৩০ বেসিস পয়েন্ট জিডিপি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ফেডারেশনের তরফে ড. অজয় সাহাই জানিয়েছেন, এই শুল্কের চাপ ভারতের রপ্তানিকারকরা পুরোপুরি বইতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলি সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খাবে।
এদিকে, ভারত সরকারের তরফে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভারত কোনও আন্তর্জাতিক চাপে সিদ্ধান্ত নেবে না। দেশের স্বার্থই তাঁদের কাছে প্রধান। এই অবস্থায় আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমঝোতায় পৌঁছনো যায় কি না, সেটাই এখন দেখার।
বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি "চাপ সৃষ্টি করে দরদাম আদায়ের কৌশল" বলেই মনে করছেন। অনেকে বলছেন, এই শুল্ক পরে ১৫–২০ শতাংশের মধ্যে স্থির হতে পারে, পুরো ২৫ শতাংশ নয়।
তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। ভারতের অর্থনীতি মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদাভিত্তিক। ফলে আন্তর্জাতিক ধাক্কা লাগলেও তা সাময়িক হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার কমাতে পারে, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা ও লগ্নি বজায় থাকে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ আপাতত ভারতের অর্থনীতির সামনে একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বাজার, ব্যবসা ও রাজনীতি— তিনের কূটজালে এই পরিস্থিতি কোথায় গড়ায়, তা সময় বলবে। তবে রফতানিকারক থেকে বিনিয়োগকারী, সবাই এখন নজর রাখছেন সরকার এবং আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার ওপর।