যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে এলপিজি সরবরাহ চাপের মুখে। তাই বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তিন দশক পরে আবার আলোচনায় সোলার কুকার।

সোলার কুকার।
শেষ আপডেট: 14 March 2026 20:42
তিন দশক আগে যাদবপুর-সন্তোষপুরের খেলার মাঠ তখনও আজকের আধুনিক স্টেডিয়াম হয়নি। সেখানে এক মেলায় বিকল্প শক্তির ব্যবহার ও সেই শক্তি নির্ভর নানা সরঞ্জাম প্রদর্শনের স্টল দিয়েছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল রিনিউয়েবল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (WBREDA)। ওই সংস্থায় কর্মরত তাঁর দাদার আগ্রহে সেই স্টলে গিয়ে সন্তোষপুরে বাসিন্দা, পেশায় অঙ্কের শিক্ষিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য সোলার কুকারের কথা জানতে পারলেন। একটি সোলার কুকার কেনার আগ্রহ জানিয়ে নাম-ঠিকানা রেখে আসেন তিনি। পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থা গীতাঞ্জলি সোলারের প্রতিনিধি তাঁর বাড়িতে গিয়ে একটি সোলার কুকার বিক্রি করে। তখন দাম পড়েছিল ১২০০ টাকা। ছাদে তিনজনের সংসারের রান্না (ভাত, ডাল, মাছ) চাপিয়ে স্কুলে চলে যেতেন সুচিত্রাদেবী। ফিরে রাতের খাবার সেটাই। গ্যাসের খরচ বাঁচত অনেকটা।
কাট টু ২০২৬ সালের মার্চ।
আচমকাই কসবার শিল্প তালুকে গীতাঞ্জলি সোলারের দফতরে ফোন আসে। তাদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন আগে সোলার কুকার কেনা এক ক্রেতা ফের একটা কুকার কিনতে চাইছেন! জানা যায়, তিনিই সুচিত্রাদেবী। শনিবার জানালেন গীতাঞ্জলি সোলারের কর্ণধার তথা দীর্ঘদিন এই শিল্পে যুক্ত অনুপম বড়াল।
তাঁদের মতো সোলার কুকার নিয়ে আগ্রহী আরও অনেকেই। কারণ পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধের জেরে অশোধিত তেল ও গ্যাসের জোগানে ধাক্কা লেগেছে। রান্নার গ্যাস এলিপিজি সিলিন্ডারের জোগান এখন নিয়ন্ত্রিত। বিকল্প হিসাবে অবশ্য ইন্ডাকশন ওভেনের চাহিদা তুঙ্গে। মজুদ থাকা রান্নার গ্যাস আরও কিছু দিন চালাতে কিংবা নতুন সিলিন্ডারের জোগানের আশঙ্কায় সেটির পাশাপাশি অনেকেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন, বৈদ্যুতিক কেটলি ব্যবহার করছেন। তবে তাতে বিদ্যুৎ খরচ হবে।

কিন্তু সৌর-বিদ্যুৎ যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনই খরচও তুলনায় কম। ইন্ডাকশন ওভেনের মতো বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের তুলনায় কম হলেও সৌর-বিদ্যুৎ নির্ভর সোলার-কুকার সম্পর্কে ফের আগ্রহী হচ্ছেন অনেকেই, দাবি করে অনুপমবাবু জানান, বিয়ের উপহার হিসাবেও এটি দেওয়ার চল রয়েছে।
সুচিত্রাদেবীর চেয়েও আগে থেকে প্রাক-করোনা পর্ব পর্যন্ত নিয়মিত সোলার কুকারে রান্না করেছেন গল্ফগ্রিনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত বাংলার অধ্যাপক সত্যপ্রিয় মুখোপাধ্যায়। গত বছরও টুকটাক করেছেন। গোড়ায় ধাক্কা খেয়েছিলেন, রান্না করতে করতে শিখেছেন। এ পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন পাঁচটি সোলার কুকার। এ বারে আবার শুরু করবেন ভেবেছেন।
শনিবারও সোলার কুকারে ভাত-ডাল রান্না হয়েছে বর্ধমানের তেজগঞ্জের বাসিন্দা তথা ডিপিএলের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার শঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। ১৯৯৬ সাল থেকে কিনেছেন এখনও পর্যন্ত তিনটি কুকার। বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য হিসাবে কিছু দিন আগেও এ নিয়ে প্রচার চালিয়েছেন।

তবুও এই সোলার কুকারের বাজার এখনও তত নয়। তাই এক সঙ্গে খুব বেশি এগুলি তৈরি করত না গীতাঞ্জলি সোলার। অনুপম জানান, তাঁদের ভাড়ারে যে ক’টি ছিল, বিক্রি হয়ে যায়। এখন রান্নার গ্যাসের অনিশ্চয়তায় এমন অনেকেরই আগ্রহ উৎপাদন বাড়াচ্ছেন তাঁরা।
অবশ্য যুদ্ধের প্রেক্ষিতে সে ভাবে বাড়তি কোনও গ্রাহক এখনও আসেননি, এমনটাই জানালেন কসবা এলাকাতেই সোলার কুকার তৈরিতে যুক্ত আর এক সংস্থা সুর্য্য ইঞ্জনিয়ারিংয়ের অন্যতম কর্ণধার সৌমিত্র দে। তবে অল্প হলেও তাঁরা দু’ধরনের সোলার কুকার তৈরি করেন। কেউ পরিবারের জন্য নেন। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, স্কুল ইত্যাদির মতো প্রতিষ্ঠানও কেনে।
অনুপমবাবু বা সৌমিত্রবাবু দাবি করছেন, ভাত, ডাল, কিছু তরকারি, মাছ, মাংস-সহ অনেক রান্নাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করা যায়। অমুপমবাবু বলেন, “সোলার কুকারে ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা ওঠে। তবে ধাপে ধাপে হওয়ায় রান্নার গুণগত মান ভাল হওয়ার আশা বেশি। ৭০-৮০ ডিগ্রি থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে আমরা বিভিন্ন পদ প্রয়োজনীয় মশলা দিয়ে কুকারের ভিতরের দুটি বড় ও দুটি ছোট অ্যালুমিনিয়ামের পটে রাখতে বলি। তারপরে সেগুলি বাক্সের ভিতরে রেখে কুকার নির্দেশিত ভাবে বন্ধ করে ও আয়না খুলে সু্র্যালোকের জন্য ছাদে রেখে দিতে বলি। ভিতরের তাপমাত্রা যাতে বেরিয়ে না আসে, সে জন্য কুকারের বাক্সের চারপাশে ইনসুলেশন থাকে। দেড়-দু'ঘণ্টায় রান্না হয়ে যাওয়ার কথা। খাবার পোড়ার আশঙ্কাও নেই। তবে আমাদের কুকারে ভাজা, রুটি ইত্যাদি হবে না।”

তাঁর দাবি, এর ফলে যে সিলিন্ডারের খরচ বাঁচবে, তাতে কুকার কেনার টাকা বছরখানেকের মধ্যে উঠে আসবে।
সৌমিত্রবাবুর অবশ্য দাবি, তাঁদের তৈরি করা দুটি সোলার কুকারের মধ্যে একটিতে ভাজাও করা সম্ভব।
সুচিত্রাদেবী, সত্যপ্রিয়বাবু, শঙ্করবাবুদের মতো ক্রেতাদেরও দাবি, তাঁরা দিব্যি রান্না করেছেন। সুচিত্রাদেবী জানান, কুকারের ভিতরের ফাঁকে আবার পলিথিনের ব্যাগে পুরে ডিম সিদ্ধও করেছেন। করেছেন আমের চাটনিও। সত্যপ্রিবাবু বলছেন, ঘণ্টাখানেকের মধ্য জলখাবার উপমা, চিঁড়েভাজার পাশাপাশি ইলিশের ভাপা-সর্ষে-ঝোল, চিংড়িমাছের ভাপা, মাংস সবই করেছেন। নিজের রেসিপিও তৈরি করেছেন। শঙ্করবাবুর মতো তিনিও এ নিয়ে প্রচার করেছেন নানা জায়গায়।
তবে বৃষ্টি বা মেঘলা হলে এই কুকার খানিকটা অনিশ্চিত। যদিও সুচিত্রাদেবীর দাবি, বর্ষায় মেঘ সরে গেলেও যে রোদ ওঠে, তাতেও রান্না ভালই করা সম্ভব। সত্যপ্রিয়বাবুর সমীক্ষা বলছে, কলকাতা শহরে বছরে ছ’মাস ভালরকম কার্যকরী সোলার কুকার। তবে বীরভুম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মতো জায়গায় বছরভরই সম্ভব বলে জানান তিনি।

তবে অনেকেরই মত, এলপিজি বা ইন্ডাকশনের পুরোপুরি বিকল্প হবে না এই সোলার কুকার। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য, এ ভাবে এলিপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেশ খানিকটা কমানো সম্ভব। আর বিশেষ করে যদি সিলিন্ডার জোগানে নিয়ন্ত্রণ চলে, তখন বেশ খানিকটা ভরসা দিতে পারে সোলার কুকার।