এই বিষয়ে ভারতীয় আইনে স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি এলপিজি সিলিন্ডার জমিয়ে রাখলে প্রশাসন সেই প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বিশেষ করে যখন বাজারে গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 12 March 2026 12:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ায় অশান্তির আঁচে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রান্নার গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতির খবর সামনে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাড়ির জন্য বা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগে একাধিক এলপিজি সিলিন্ডার সংগ্রহ (LPG cylinder hoarding at home) করে রাখতে চাইছেন, যাতে হঠাৎ করে রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেলে অসুবিধার মধ্যে পড়তে না হয়।
তবে এই অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত করার প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও তুলে দেয় - একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার আইন অনুযায়ী বাড়িতে ঠিক কতগুলি এলপিজি সিলিন্ডার রাখতে পারেন (LPG cylinder legal limit home)? আর কখন সেই মজুত বেআইনি বলে গণ্য হতে পারে (LPG cylinder hoarding law India)?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়ে ভারতীয় আইনে স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি এলপিজি সিলিন্ডার জমিয়ে রাখলে প্রশাসন সেই প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বিশেষ করে যখন বাজারে গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়।
বাড়িতে একসঙ্গে কতগুলি এলপিজি সিলিন্ডার রাখা যায়?
ভারতে সাধারণত একটি গৃহস্থ পরিবার একসঙ্গে ১৪.২ কেজি ওজনের দুটি এলপিজি সিলিন্ডার রাখতে পারে। এর মধ্যে একটি সিলিন্ডার রান্নার জন্য সংযুক্ত থাকে এবং অন্যটি বাড়তি বা ব্যাকআপ হিসেবে রাখা যায়।
আইনজীবী আলয় রাজভি, যিনি অ্যাকর্ড জুরিস-এর ম্যানেজিং পার্টনার, জানিয়েছেন যে তেল বিপণন সংস্থাগুলি এই নিয়মই অনুসরণ করে থাকে। ভারতের প্রধান তেল সংস্থাগুলি যেমন ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম সমস্ত সুরক্ষা বিধি মেনেই এই দুই সিলিন্ডারের নীতি কার্যকর করে।
রাজভি জানান, ভারতীয় আইনে সাধারণত একটি পরিবারকে একসঙ্গে দুটি ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়, একটি ব্যবহারের জন্য এবং অন্যটি সংরক্ষিত বা রিজার্ভ হিসেবে। এই নিয়ম গ্যাস সিলিন্ডার রুলস, ২০১৬ এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন-এর জারি করা নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসারেই নির্ধারিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এলপিজি একটি 'অত্যন্ত দাহ্য' পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত। তাই এর সংরক্ষণে কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
এ কারণে এলপিজি সিলিন্ডার অবশ্যই ভালভাবে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখতে হবে এবং আগুন বা অতিরিক্ত তাপের উৎস থেকে দূরে রাখতে হবে।
দুটি সিলিন্ডারের নিয়ম মূলত গৃহস্থালির প্রয়োজনের জন্যই নির্ধারিত। এর বেশি পরিমাণে সিলিন্ডার সংরক্ষণ করতে হলে সাধারণত বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের জন্য আলাদা লাইসেন্স প্রয়োজন।
কখন এলপিজি সিলিন্ডার মজুত বেআইনি বলে গণ্য হবে?
একটি বাড়তি সিলিন্ডার রাখা বৈধ হলেও, গৃহস্থালির প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সিলিন্ডার জমিয়ে রাখা আইনগত সমস্যার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেয়।
রাজভি বলেন, “যদি গৃহস্থালির স্বাভাবিক ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়ে একাধিক সিলিন্ডার জমা করা হয়, বিশেষ করে যদি তা সাধারণ সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ম বা বুকিং নীতির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তা হোর্ডিংয়ের সন্দেহ তৈরি করতে পারে।”
এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট, ১৯৫৫ (Essential Commodities Act, 1955) অনুযায়ী এলপিজি একটি “Essential Commodity” বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। ফলে যদি কেউ পুনরায় বিক্রি, কালোবাজারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করার উদ্দেশ্যে সিলিন্ডার মজুত করে, তাহলে সেই ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এছাড়াও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মও নির্দিষ্ট সীমার বেশি সিলিন্ডার রাখার ক্ষেত্রে বাধা দেয়।
গ্যাস সিলিন্ডার রুলস অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া বড় পরিমাণ এলপিজি সিলিন্ডার সংরক্ষণ করা নিষিদ্ধ। ব্যক্তিগত ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়ে বিপুল সংখ্যক সিলিন্ডার মজুত থাকলে, বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা চলাকালীন সময়ে, সেটিকে বেআইনি সংরক্ষণ হিসেবেও ধরা হতে পারে।
বাড়তি সিলিন্ডার মজুত করলে কী শাস্তি হতে পারে?
গ্যাসের সংকটের সময়ে এলপিজি সিলিন্ডার মজুত করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই ধরনের ক্ষেত্রে জরিমানা, জেল বা সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
রাজভি জানান, এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রশাসনের হাতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।
যদি দেখা যায় কেউ বা কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কালোবাজারি বা সরবরাহে কারচুপি করার উদ্দেশ্যে সিলিন্ডার জমিয়ে রেখেছে, তাহলে প্রশাসন অতিরিক্ত সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা শুরু করতে পারে।
শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে অপরাধের গুরুত্ব এবং উদ্দেশ্যের ওপর। কখনও শুধু জরিমানা হতে পারে, আবার গুরুতর ক্ষেত্রে জেলও হতে পারে - কখনও কখনও দুটোই একসঙ্গে প্রযোজ্য হয়।
বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ডিস্ট্রিবিউটরদের ক্ষেত্রে তেল বিপণন সংস্থাগুলি তাদের ডিলারশিপ বা সরবরাহের চুক্তিও বাতিল করতে পারে।
আইনের নির্দিষ্ট ধারাও রয়েছে এ বিষয়ে
এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট-এর ধারা ৭ অনুযায়ী হোর্ডিং বা বেআইনি মজুতের জন্য ন্যূনতম তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, সঙ্গে জরিমানাও ধার্য হতে পারে।
এছাড়া ধারা ৬এ অনুযায়ী প্রশাসন অতিরিক্ত সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রাখে।
সংকটের সময়ে সরকার আরও কড়া ব্যবস্থা নিতে পারে
যখন বাজারে এলপিজি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, তখন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও কঠোর নিয়ম চালু করতে পারে।
রাজভি জানান, এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট-এর আওতায় সরকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা বন্ধ করতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে। সংকটের সময়ে সরকার এলপিজির বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মজুতের সীমা নির্ধারণ করতে পারে এবং স্বাভাবিক গৃহস্থালির প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত সিলিন্ডার জমিয়ে রাখলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসন সাধারণত নজরদারিও বাড়িয়ে দেয়।
এতে এলপিজি এজেন্সিগুলিতে নিয়মিত পরিদর্শন, অতিরিক্ত সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করা এবং কালোবাজারি বা মজুতদারির অভিযোগে মামলা দায়ের করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই সমস্ত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য একটাই, যাতে সিলিন্ডার ন্যায্যভাবে সব পরিবারের কাছে পৌঁছয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকে।
রাজভির কথায়, সংকটের সময়ে প্রশাসন সাধারণত এলপিজি এজেন্সি এবং সিলিন্ডার সংরক্ষণের উপর বিশেষ নজর রাখে, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় এবং সাধারণ ভোক্তারা ন্যায্যভাবে গ্যাস পেতে পারেন।