২০২৫ সালের ১ অগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশের রফতানি খাতে বড় ধাক্কা। এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত ভারতীয় শিল্পপতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলেছে।

ছবি- এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 6 August 2025 16:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ভারতীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের (Indian Economy) ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। একদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দার সম্ভাবনা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১ অগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশের রফতানি খাতে বড় ধাক্কা। এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত ভারতীয় শিল্পপতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলেছে। তারই সঙ্গে চলছে মূল্যবৃদ্ধি, চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে ভাটা। ফলে গোটা অর্থনীতিতেই চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, এই কঠিন সময়ে ভারতীয় ব্যবসা কীভাবে টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যতে কী চ্যালেঞ্জ আসতে পারে?
অস্থিরতার উৎস এবং বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র
বর্তমান বিশ্বজুড়ে একাধিক কারণে অর্থনৈতিক (Economy) অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, অতিরিক্ত ঋণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ (যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য), জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য। ২০২৩ সাল ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য কঠিন এক বছর, এবং ২০২৪ সালেও তেমনই পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী গড় মুদ্রাস্ফীতি ৬.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ উভয়কেই চাপে ফেলেছে। ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকে মন্থর করছে। বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপির ৩৩০ শতাংশ। এই চিত্র নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য উদ্বেগজনক।
ভারতীয় রফতানি ও আমদানি খাতে ধাক্কা
বিশ্বব্যাপী চাহিদা হ্রাস এবং নানা দেশের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ভারতের রফতানি-আমদানি খাতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানি ৭৭৬.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁয়ে রেকর্ড গড়লেও, বিশ্ববাজারের চাহিদা কমায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে রপ্তানি ৫.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০.৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি বড় ধাক্কা দিতে চলেছে। যদিও সাময়িকভাবে তাদের গড় ট্যারিফ ২৪.৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৭.৩ শতাংশ করা হয়েছে, তবে ১ আগস্ট ২০২৫ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতের আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে।
২০২৪ সালের জুনে ভারতের আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় ৬.২৯ শতাংশ বেশি। আর পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ৬২.২৬ বিলিয়ন ডলার, যা রিজার্ভে চাপ ফেলছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে RBI-এর ভূমিকা
বিশ্বজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে ভারতের অভ্যন্তরেও। জ্বালানি, খাদ্য ও সারের দামের অনিশ্চয়তা মুদ্রাস্ফীতিকে তীব্র করেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে RBI রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করেছে। এতে যেমন বাজারে নগদ প্রবাহ কমছে, তেমনই ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের পুঁজি সংগ্রহে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগে মিশ্র চিত্র
বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা ভারতের FDI প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট FDI ৯৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫৩ মিলিয়ন ডলারে। তবে গ্রস FDI বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। সর্বাধিক বিনিয়োগ এসেছে পরিষেবা খাতে (১৯ শতাংশ), তারপর সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও বাণিজ্য খাতে।
MSME খাতের সংকট ও সরকারি পদক্ষেপ
বৈশ্বিক সংকটে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME)-এর ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে। এই খাত বছরে প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করে। অথচ, ঋণ সংগ্রহ, মূলধনের অভাব এবং কাঁচামাল সমস্যা এদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।
সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
PLI স্কিম: উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
সাশ্রয়ী ঋণ: প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা, ৫৯ মিনিটে ঋণ ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু হয়েছে।
আমদানি নির্ভরতা কমানো: দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে কৌশলগত পদক্ষেপ।
বাণিজ্য চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
IMF-এর জুলাই ২০২৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের GDP বৃদ্ধির হার হবে ৬.৪ শতাংশ, যা আমেরিকা ও চীনের থেকেও বেশি। ডেলয়েটও ৬.৪-৬.৭ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও বেসরকারি বিনিয়োগ ও রাজস্ব আদায়ে চ্যালেঞ্জ থাকবে, তবুও ভারতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।