অর্থমন্ত্রকের রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, “এই সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা রুপির বিনিময় হার, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।” এর পাশাপাশি বিশ্ব আর্থিক বাজারে যদি বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যাকে বলা হয় ‘ফ্লাইট টু সেফটি’, তাহলেও বিভিন্ন দেশের মুদ্রার উপর চাপ বাড়তে পারে।

সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে
শেষ আপডেট: 9 March 2026 15:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাত (Middle East Crisis) যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তবে তার প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে (World Economoy)। বিশেষ করে তেলের দাম (crude oil price) দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে বিশ্ব জুড়ে মুদ্রাস্ফীতি (global inflation) আরও বাড়তে পারে, এমনই সতর্কবার্তা দিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (International Monetary Fund)।
সোমবার আইএমএফ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান, আরব দুনিয়ার চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে আবারও পরীক্ষার মুখে ফেলছে (IMF warns global inflation)। জাপানের অর্থমন্ত্রকের আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আরব দুনিয়ায় নতুন করে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা আবারও বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতাকে পরীক্ষা করছে।”
তেলের দাম বাড়লে বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি (oil price hike gloabl inflation)
জর্জিয়েভার মতে, এই সংকট যদি আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটায়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানির দামের উপর, আর সেই সূত্রেই বাড়তে পারে বিশ্ব জুড়ে মূল্যবৃদ্ধি। তিনি জানান, যদি তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ে এবং বছরের বেশিরভাগ সময় সেই দাম বজায় থাকে, তবে তার ফলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই নতুন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। জর্জিয়েভার কথায়, “এই নতুন বৈশ্বিক পরিবেশে নীতিনির্ধারকদের জন্য আমার পরামর্শ, অকল্পনীয় পরিস্থিতির কথাও ভাবুন এবং তার জন্য প্রস্তুত থাকুন।”
ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ রুটগুলি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এদিকে ভারতের অর্থমন্ত্রকের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টেও সতর্ক করা হয়েছে, আরব দুনিয়ার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
সর্বভারতীয় এক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রকের প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি মাসের মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সংঘাত ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে হয়, ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলা, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই ঘটনাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওই ঘটনার পর থেকেই প্রতিশোধমূলক হুমকি ও উত্তেজনা বেড়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিমধ্যেই বেড়েছে তেলের ও গ্যাসের দাম
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG-র দামও প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থমন্ত্রকের রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, “এই সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা রুপির বিনিময় হার, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।” এর পাশাপাশি বিশ্ব আর্থিক বাজারে যদি বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যাকে বলা হয় ‘ফ্লাইট টু সেফটি’, তাহলেও বিভিন্ন দেশের মুদ্রার উপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে রিপোর্টে এটাও বলা হয়েছে, ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার, তুলনামূলক কম চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ভারতের অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৬ শতাংশ হতে পারে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে সেই বৃদ্ধির হার ৭ থেকে ৭.৪ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়তেই চাপ বাড়ছে পাকিস্তানে
আরব দুনিয়ার উত্তেজনার প্রভাব ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলিতে পড়তে শুরু করেছে। পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি জ্বালানির দামে বড়সড় বৃদ্ধি ঘোষণা করেছে। পেট্রোল এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৫৫ পাকিস্তানি রুপি বাড়ানো হয়েছে, যা প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধির সমান।
৭ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে লিটার প্রতি ৩২১.১৭ পাকিস্তানি রুপি, আর হাই-স্পিড ডিজেলের দাম হয়েছে ৩৩৫.৮৬ পাকিস্তানি রুপি।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত বাড়ার ফলে তেলের সরবরাহ রুটে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানি বাজারে চাপ বেড়েছে,এই পরিস্থিতিতেই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রমজানের সময় বাড়তি চাপ সাধারণ মানুষের উপর
এই দাম বৃদ্ধির ফলে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে যখন রমজানের সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ এমনিতেই বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহণ ও লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে, ফলে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির ঢেউ তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই চাপ ভোক্তাদের উপর না চাপিয়ে উপায় ছিল না। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং আইএমএফের সঙ্গে চলা আলোচনার শর্ত পূরণ করতেও এই পদক্ষেপ জরুরি বলে জানানো হয়েছে।