৪ মার্চ ২০২৬-এ দেশে সোনার দামে রেকর্ড বৃদ্ধি। কলকাতা, মুম্বাই ও দিল্লিতে নতুন উচ্চতা। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে মধ্যবিত্তের বাজেটে বড় ধাক্কা। বিস্তারিত জানুন।

শেষ আপডেট: 4 March 2026 11:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো : ভারতের বাজারে আজ সোনার দামে তৈরি হয়েছে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড। প্রতি ১০ গ্রাম পাকা সোনার দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছনোর ফলে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে দিশেহারা অবস্থা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাজেটে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে।
এই আকস্মিক ঊর্ধ্বগতির পেছনে রয়েছে একাধিক জটিল আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ, যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। কেন বাড়ছে সোনার দাম? তার নেপথ্যের কারণ জানলে অনেকেই সত্যিই চমকে উঠবেন।
সোনার দামে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি
৪ মার্চ, ২০২৬ অনুযায়ী দেশের বাজারে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
২৪ ক্যারেট সোনা (১০ গ্রাম): ₹১,৬৬,৪৫০ – ₹১,৭৩,০৯০
২২ ক্যারেট সোনা (১০ গ্রাম): ₹১,৫২,৪৬০ – ₹১,৫৮,৬৬০
শহরভিত্তিক দাম
মুম্বই :
২৪ ক্যারেট: ₹১৬,৭৬১ (প্রতি গ্রাম)
২২ ক্যারেট: ₹১৫,৩৬৪ (প্রতি গ্রাম)
কলকাতা:
২৪ ক্যারেট: ₹১৬,৭৬৮ (প্রতি গ্রাম)
২২ ক্যারেট: ₹১৫,৩৪৬ (প্রতি গ্রাম)
দিল্লি:
২৪ ক্যারেট: ₹১,৭৩,২৪০ (প্রতি ১০ গ্রাম)
গত এক সপ্তাহেই ২৪ ক্যারেট সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ₹৯,৪৩০ এবং ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ₹৮,৫৫০। এই লাগামছাড়া বৃদ্ধি ক্রমশ মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, বিশেষত উৎসব ও বিয়ের মরসুমে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম?
সোনার এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়লেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজার বা মুদ্রার পরিবর্তে সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নেন। ফলে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ে, আর দামও চড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির ব্যাপক সোনা ক্রয়
ভারতের Reserve Bank of India (RBI) এবং চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের উপর নির্ভরতা কমাতে ও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতে বিপুল পরিমাণ সোনা কিনছে। এই বৃহৎ ক্রয় বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে দাম বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি
মুদ্রাস্ফীতির জেরে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান কমছে। এমন পরিস্থিতিতে সোনা একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষও নিজেদের সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখতে সোনায় বিনিয়োগ করছেন।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সংস্কৃতি
ভারতে সোনা শুধু অলঙ্কার নয়—এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিনিয়োগের প্রতীক। বিয়ের মরশুম, দোল, হোলি ও অন্যান্য উৎসবের সময় সোনার চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই তুঙ্গে থাকে। এই বাড়তি চাহিদাও দামের উপর প্রভাব ফেলে।
সরকারি নীতি
আমদানি শুল্ক, সোনার মজুদ ক্রয়-বিক্রয় নীতি—এসব পরিবর্তনও দামের ওঠানামায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিয়ের বাজেটে কাটছাঁট
সোনার গয়না কেনা এখন বহু পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকেই বাজেট কমাতে বা গয়নার পরিমাণ কমানোর কথা ভাবছেন।
হালকা ও কম ক্যারেট গয়নার দিকে ঝোঁক
উচ্চ দামের কারণে ক্রেতারা কম ওজনের ও কম ক্যারেটের গয়না কিনছেন। কৃত্রিম হীরার হালকা ডিজাইনের গয়নার চাহিদাও বেড়েছে।
পুরনো গয়না বিক্রি বা এক্সচেঞ্জ
অনেকে পুরনো গয়না বিক্রি বা বদলে নতুন গয়না নিচ্ছেন। তবে মেকিং চার্জ ও হলমার্ক সমস্যার কারণে প্রাপ্য মূল্য অনেক সময় কমে যায়।
বিকল্প বিনিয়োগে ঝোঁক
উচ্চ দামের কারণে অনেকে এখন গোল্ড ETF, গোল্ড বন্ড বা ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ করছেন। World Gold Council-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ভারতে গয়না কেনা ২৬% কমেছে, যেখানে সোনায় বিনিয়োগ বেড়েছে ১৩%।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ভবিষ্যৎ প্রবণতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে সোনার দাম উচ্চস্তরেই থাকতে পারে। ইজরায়েল, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলে সোনা ও রূপার দামে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা যেতে পারে।
Multi Commodity Exchange of India (MCX)-এ সম্প্রতি সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ₹১,৬৬,১৯৯ ছুঁয়েছে।
কিছু বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে সোনার দাম আরও ২৫%–৪০% বাড়তে পারে। যদি ২০২৬ সালে বড় আর্থিক সংকট দেখা দেয়, তবে দীপাবলি (অক্টোবর-নভেম্বর) নাগাদ প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ₹১,৬২,৫০০ থেকে ₹১,৮২,০০০ টাকার মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—শুধু পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর না করে মুদ্রাস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ঐতিহাসিকভাবে সোনা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধক এবং অনিশ্চিত সময়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত। স্বল্পমেয়াদে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সোনার দাম সাধারণত ঊর্ধ্বমুখী থাকে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—বাজার বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।