মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ নীতির জবাবে ভারত এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ আরব দুনিয়ার সঙ্গেও আমদানি-রফতানির সংস্কারমুখী দরজা খুলে দিয়েছে।

ব্যক্তিগত ব্যবহারের পণ্যে শুল্ক কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ রফতানি শিল্পের (Export Industries) জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা (Duty-Free Access) বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
শেষ আপডেট: 1 February 2026 16:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ (Union Budget 2026) পেশ করার সময়ে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) বিশ্ব বাণিজ্যের দরজা একেবারে উন্মুক্ত করে দিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ নীতির জবাবে ভারত এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ আরব দুনিয়ার সঙ্গেও আমদানি-রফতানির সংস্কারমুখী দরজা খুলে দিয়েছে। রবিবার সংসদে বাজেট বক্তৃতায় সীতারামন বলেন, এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি ভারত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র (United States) ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক (50 Percent Tariffs) বসিয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক (25 Percent Penalty) আরোপ করা হয়েছে রাশিয়া (Russia) থেকে তেল কেনার জন্য।
তিনি বলেন, আজ আমরা এমন এক বহির্বিশ্বের পরিবেশের মুখোমুখি, যেখানে বাণিজ্য (Trade) এবং বহুপাক্ষিকতা অপরিহার্য। তিনি আরও জানান, ভারত বিকশিত ভারত (Viksit Bharat) হওয়ার লক্ষ্যে এগোতে থাকবে এবং এই নতুন বাজেটের মাধ্যমে একটি ‘সংস্কার এক্সপ্রেস’ (Reform Express) যাত্রা শুরু হবে। রবিবার অর্থমন্ত্রী তার বাজেট ভাষণে আমদানি শুল্কের (Customs Duties) ক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিন্যাস (Calibrated Reset) প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবহারের পণ্যে শুল্ক কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ রফতানি শিল্পের (Export Industries) জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা (Duty-Free Access) বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
এই প্যাকেজে গৃহস্থদের খরচ (Household Costs) কমবে, বিদেশে বাড়তি বাণিজ্যিক বাধার (Trade Barriers) মুখে থাকা রফতানিকারকদের সুরক্ষা মিলবে এবং প্রতিরক্ষা (Defence), পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ (Clean Energy) ও দুষ্প্রাপ্য খনিজে (Critical Minerals) উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে। সীতারামনের প্রস্তাব, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আমদানি করা সব শুল্কযোগ্য পণ্যের উপর শুল্কহার (Tariff Rate) ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হবে। এতে সরাসরি ভোক্তাদের ঝুড়িতে সাশ্রয় (Consumer Savings) হবে এবং আধুনিক খুচরো বাজার (Modern Retail) ও ই-কমার্সের (E-Commerce) মতো আমদানি-নির্ভর খাতের জন্য নীতিগত স্থায়িত্বের (Policy Predictability) বার্তা দেবে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর এই শুল্কছাড় ও রফতানি সহায়তার ঘোষণা করলেন নির্মলা। এই সিদ্ধান্তে বিশেষ করে ভারতের বস্ত্র (Textile), সমুদ্রের মৎস্য সহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য (Seafood) ও রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন বাজারে বাড়তি শুল্কের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণকারী সংস্থাগুলি (Seafood Processors)। তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্বস্তি (Targeted Relief) ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমি প্রস্তাব করছি, সামুদ্রিক খাদ্য রফতানির জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কাঁচামালের উপর শুল্কমুক্ত আমদানির সীমা (Duty-Free Import Limit) বর্তমান এক শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের বছরের রফতানি টার্নওভারের (FOB Value) তিন শতাংশ করা হোক। পাশাপাশি চামড়া বা সিন্থেটিক জুতোর (Leather or Synthetic Footwear) ক্ষেত্রে যে সুবিধা রয়েছে, তা জুতোর উপরের অংশ (Shoe Uppers) রফতানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হবে, বলেন সীতারামন। এই ঊর্ধ্বসীমা রফতানিকারকদের আরও বেশি কাঁচামাল ও উপকরণ শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দেবে, ফলে উৎপাদন খরচ (Per Unit Cost) কমবে এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলের (Coastal Clusters) কর্মসংস্থান (Jobs) ও প্রতিযোগিতা (Competitiveness) বজায় থাকবে। জুতোর এই নীতি ছোট কারখানাগুলিকে স্বস্তি দেবে বলে জানান নির্মলা।
প্রতিরক্ষা খাতে রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত (MRO) ব্যবস্থায় খরচ ও সময়— দু’দিকেই সুবিধা মিলবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এমআরও প্রয়োজনের জন্য বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের উপর ন্যূনতম আমদানি শুল্ক (Basic Customs Duty) তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করছি, বলেন অর্থমন্ত্রী। এতে দেশেই দ্রুত ও সস্তায় যন্ত্রাংশ পাওয়া যাবে এবং বহরের প্রস্তুতি (Operational Readiness) বাড়বে।
পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ (Clean Energy and Storage) ক্ষেত্রেও বড় শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে দেশীয় উৎপাদন (Domestic Manufacturing) বাড়ে এবং গ্রিড সংযুক্তি (Grid Integration) সহজ হয়। নির্মলা বলেন, আমি প্রস্তাব করছি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (Lithium-Ion Batteries) তৈরির জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রাংশে যে শুল্কছাড় রয়েছে, তা ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (Battery Energy Storage Systems) তৈরির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হোক। সৌর কাচ (Solar Glass) তৈরিতে ব্যবহৃত সোডিয়াম অ্যান্টিমোনেট (Sodium Antimonate) আমদানিতে শুল্ক তুলে দেওয়া হোক। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণের (Critical Mineral Processing) জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশেও শুল্কছাড় দেওয়া হোক। এই ছাড়ে নতুন কারখানার মূলধনী ব্যয় (Capex) কমবে এবং ব্যাটারি, সৌর কাচ ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণে প্রযুক্তি গ্রহণ দ্রুত হবে।
দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ নীতির (Long-Term Energy Policy) ক্ষেত্রেও নীতিগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্মলা বলেন, আমি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে (Nuclear Power Projects) প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর আমদানি শুল্কছাড় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করছি এবং সব ক্ষমতার পারমাণবিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে। এর ফলে প্রকল্প ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি কেন্দ্র ওড়িশা (Odisha), কেরল (Kerala), অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) ও তামিলনাড়ু (Tamil Nadu)-র মতো খনিজসমৃদ্ধ রাজ্যে (Mineral-Rich States) বিরল খনিজ করিডর (Rare Earth Corridors) গড়ে তুলবে, যা ইলেকট্রনিক্স (Electronics), প্রতিরক্ষা (Defence) ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (Electric Mobility) শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। সীতারামনের এই প্যাকেজ পাল্টা শুল্কযুদ্ধে (Tit-for-Tat Tariffs) না গিয়ে বিশ্ব বাজারে ভারতের বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়ানোর দিকেই নজর রেখেছে। ব্যক্তিগত আমদানিতে শুল্ক ২০ থেকে ১০ শতাংশে নামানোয় ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কমবে।