বাজেট (Union Budget 2026) কি শুধুই কর ছাড় (Income Tax)? কিংবা তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কথার আগুনে সেঁকে নেওয়া? আমজনতার ক'জন আয়কর দেওয়ার মতো আয় করেন?

বাজেট কিন্তু সকলের।
শেষ আপডেট: 31 January 2026 13:12
আর ২৪ ঘণ্টাও বাকি নেই বার্ষিক আর এক মহাযজ্ঞের। কেন্দ্রীয় সরকার দেশের বাজেট (Union Budget 2026) পেশ করবে রোববার। অর্থমন্ত্রকের (Ministry of Finance) অন্দরমহলে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি (Budget 2026)। কী চমক থাকবে, দেশের রাজনীতি, বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে চর্চার মধ্যেও আসলে আমজনতা (Common People) আর তাদের নিয়েই রোজকার পথ চলার সংবাদ মাধ্যমের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের, বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে কিন্তু মূলত দুটি।
প্রথমত, আয়করে ছাড় মিলবে কিনা। আর বাজেট কতটা সফল নাকি ব্যর্থ, আমজনতার পক্ষে নাকি বড়লোকদের, শাসক-বিরোধী তরজায় ভরবে টিভি-স্টুডিওর আকাশ বাতাস।
কিন্তু বাজেট কি শুধুই কর ছাড়? কিংবা তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কথার আগুনে সেঁকে নেওয়া? আমজনতার ক'জন আয়কর দেওয়ার মতো আয় করেন? পুরোনো সেই কথা ধার করে ও একটু এদিক ওদিক করে হয়ত বলা যায়, শুধুই কর ছাড়, তোমার আর কিছু মনে হয় না কুসুম, থুড়ি বাজেট!
ব্যাপারটা যেন ক’মাস আগের সময়টার মত। যখন আকাশে ভেসেছিল সেই শরতের মেঘ। ছুটন্ত ট্রেন বা রাস্তা ধরে সওয়ারি নিয়ে গড়িয়ে চলা গাড়ির জানলা দিয়ে দেখা পাশের মাঠের ফুটেছিল কাশফুল। তখনও একটাই চর্চা, পুজো এসে গেল। কিন্তু শরতের মেঘ কিংবা কাশফুল কি শুধু দুর্গা পুজোরই বার্তা আনে! আর কিছু নয়?
আসলে বাজেটকে মোটা দাগে দু'ভাগে দেখা হয়। এক তো বললামই, আমজনতা হয়তো অতশত বোঝেন না। তাই সরলরেখায় কর ছাড় হল কি হল না, সেই কার্যত কঠিন হিসেব নিকেশের পক্ষে কে কতটা, তা প্রাণপণে প্রমাণ করতে রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরি।
দ্বিতীয়ত হল, বাজেট একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়। আর দেশের হলে তো কথাই নেই। বিপুল গুরুগম্ভীর এবং উল্লেখযোগ্য বিষয়। তার সব কটি ক্ষেত্রে হয়তো আমজনতার সরলরেখায় কিছু যায় আসে না। কিন্তু এতটাও কঠিন করে দেখিয়ে সমাজের উঁচু স্তরের বা বিষেশজ্ঞ মহলের একাংশের কুক্ষিগত করে রাখার মতো বিষয়ও নয় এটি। বরং সরলরেখায় না হলেও কোনও সিদ্ধান্ত আমজনতাকে প্রভাবিত করবে কিনা, সেটা খোঁজাই মূল চর্চা হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা নিরন্তর বলবেন, এবারও চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। এই লেখা তাই সেদিকে যেতে গিয়ে ব্যর্থ প্রচেষ্টা নয়। বরং বাজেটকে কীভাবে আমরা দেখি, কীভাবে আমরা আমাদের মতো করেও ভাবতে পারি, সেই চেষ্টাই মাত্র।
যে কোনও আয়-ব্যয়ের হিসেব ছাড়া আর তো কিছু নয়। কোনও এক পরিবারের বার্ষিক বা এক্ষেত্রে মূলত মাসের আয়-ব্যয় হতে পারে, কোনও সংস্থা চালানোর খরচ-আয় হতে পারে আবার নিছক কলেজ পড়ুয়ার কোনও মাসের হাত খরচ ও সেই মাসে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকের খরচ মেটানোর আয়-ব্যয়ের হিসেবের খাতাও তো এক একটি মাত্রার বাজেট। ছোট বা বড়র ফারাক মাত্র।
আবার ধরা যাক, মরসুমের গোড়ায় একজন কৃষক তাঁর চাষের খরচ ও তা থেকে আয়ের প্রাক-হিসেব কষতে পারেন। এক ছোট ব্যবসায়ী ব উদ্যোগপতি কিংবা শিল্পপতি তাঁদের ব্যবসা চালানো ও নয়া পরিকল্পনার জন্য অর্থ বর্ষের গোড়ায় প্রাথমিক আয়-ব্যয়ের হিসেবের খাতা তৈরি করতে পারেন।
সেরকমই সরকার গোটা একটি অর্থ বর্ষের তার জনগণের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কী কী প্রকল্পকে কত খরচ করবে, আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কিংবা জিএসটির মতো পরোক্ষ করের মাধ্যমে আয় করে সেই খরচ মেটাবে, অর্থবর্ষ শুরুর আগে দেশের সাংবিধানিক দায় হিসেবে জনসমক্ষে প্রকাশ করাই হল তাদের বাজেট।
কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলিও একই ভাবে তাদের নানা খাতে আয় (কেন্দ্রীয় অনুদান-সহ) ও ব্যয়ের হিসেবের বাজেট তারপর প্রকাশ করে। তবে সকলকেই নতুন অর্থবর্ষের আগে এইভাবে আগাম হিসেবের দলিল পেশ করতে হয়। সে অর্থে এমনিতে সরকারি বাজেট কিছুটা ভাবগম্ভীর হলেও এভাবেও দেখা যেতে পারে।
তবুও সমাজের সকলের কথা ভেবে অনেক সময় বলা হয়, বাজেটটা এমন ভাবে বোঝাতে হবে, যেন মা-মাসিরাও বুঝতে পারেন। এমনকি সংবাদমাধ্যমের একাংশের আঁতুড়ঘরেও এমন ব্যাখ্যা শোনা যায় না, তা হলফ করে বলা যায় কি?
অথচ কি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কি লিবারেল, সব ক্ষেত্রেই বাজেট করেন এমন মা-মাসির খুব একটা অভাব নেই। অনেকে চাকরি করেন। কেউ কেউ তো আবার ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা নানা উঁচু পদেই কর্মরতা। অনেককে তাঁর দফতরের আয়-ব্যয়ের হিসেবের খাতা বা বাজেট তৈরি করতে হয় বৈকি।
আর যাঁরা সামাজিক মতে কিছুই করেন না? সামাজিক ভাবে শুধুই গৃহবধূর তকমা পেয়েছেন, তাঁদের বাজেট-টাজেট করতে হয় না, তাই তো? সবই করেন কর্তা মশাই? না, একেবারেই এমন নয়। সংসারের হিসেব সে গৃহবধূ হন বা কর্মরতা, অনেককেই করতে হয় বৈকি।
সরকার বা সংস্থার মতোই সংসারের খরচও দু'রকমের, প্ল্যানড বা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে। আর অন্যটি আনপ্ল্যানড বা হঠাৎ করে কোনও খরচের দরকার পড়লে সেই মতো আগাম অন্তত কিছুটা অর্থের সংস্থান করে রাখা। যেমন ধরুন, বাজার, নিয়মিত যেসব ওষুধ, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, ভাড়া বাড়ি হলে সেটির ভাড়া, যাতায়াতের মতো বিভিন্ন স্থায়ী খরচ মোটের উপর নির্দিষ্ট। ফলে এগুলির জন্য অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনাও নির্দিষ্ট।
এবার যদি আচমকা পরিবারের কোনও সদস্য অসুস্থ হন, (স্বাস্থ্যবিমা থাকুক বা না থাকুক) কিংবা দুম করে কোনও নিমন্ত্রণের খবর আসে, যার কোনওটিরই আগাম কোনও নিশ্চয়তা ছিল না, তাহলে অর্থ কোথা থেকে আসবে? সেটিই হলো সেই 'unplanned expenditure'। কিন্তু কতটা অর্থ আলাদা করে সরিয়ে রাখা দরকার? কী হবে, তা তো জানা নেই। তবুও সাধ্যের মধ্যে একটা হিসেব আগাম কষে সরিয়ে রাখাও বাজেটেরএকটি অংশ বলা যেতে পারে।
ফেরা যাক, করছাড়ই বাজেটের মূল প্রাপ্তি কিনা, সে বিষয়ে। যাঁরা আয়কর দেওয়ার মতো রোজগার করেন, তাঁরাই শুধুমাত্র এই ঘোষণায় লাভবান হতে পারেন। বড় সংস্থা, কর্পোরেট বা সরকারি চাকুরেদের একাংশ ছাড়া ক'জন তেমন বেতন পান? টিডিএস নয়, আয়ের ভিত্তিতে মোট দেয় করের কথাই বলছি।
আবার সরকারি চাকুরেই বা কতজন? অতীতে নানা হিসেবে বলা হত, মোট কর্মসংস্থানের মাত্র কয়েক শতাংশ হবেন হয়ত। গত কয়েক দশকে সেই জায়গা কী আছে? বহু সরকারি কাজের জায়গাতেই কাজ এখন চুক্তিভিত্তিক। ফলে বাজারমূল্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মহার্ঘ ভাতার সুযোগ কই? তাও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা প্রায় নিয়মিত সেই ডিএ পেলেও এ রাজ্যের সরকারি কর্মীদের সেই প্রাপ্তির বিষয়টি আইনি জটে জড়িয়ে এখনও।
এবারে বেসরকারি ক্ষেত্রে ক’জনের সেই ডিএ প্রাপ্তির সুযোগ হয়? ক‘টি সংস্থা তার কর্মীদের দেয় এই সুযোগ? আর স্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধি? নিশ্চয় হয়। তবুও এই ক্ষেত্রের কর্মী মহলের একাংশ হয়তো মনে মনে হাসবেন। এই ক্ষেত্রের বেশিরভাগই করযোগ্য বেতন পান না, তা কার্যত নিশ্চিত, দাবি করবেন সেই কর্মী বা শ্রমিক মহল।
তাহলে কর ছাড় পেলে আসলে কর্মসংস্থানের কতটুকু উপকৃত হয়? খুব বেশি নয় নিশ্চয়। তবুও কর ছাড়ই মূল চর্চা। কাগজে, টিভিতে, সব জায়গায় পাঠক-দর্শককে সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করে, জানতে চেয়ে মাত করে দেয়, আয়কর ছাড় পেলে কতটা সুবিধা হবে তাঁদের? বছরভর কাজের পর ক্লান্ত মনে নিশ্চিন্তে ঘুম আসা সহজ হবে? বছরের পর বছর, বিশেষ করে এই বাংলায় বাজেটের ঠিক আগে আর ঠিক পরে একটাই চাওয়া যেন। আর তা পাওয়া হয়ে গেলে হাতে স্বর্গ! বাকি যে বিপুল অংশ এই সুযোগ থেকে ব্রাত্যই থাকবেন, বাজেটের মতো একটা গুরুত্বপূর্ন অংশের বাইরে থাকল কি থাকল না, অত আর কে মাথা ঘামায় !
অথচ দেখুন, দোকান থেকে নিত্যপণ্য কিনছেন, প্রান্তিক থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সেখানে জিএসটি বাবদ অনেক কর থাকে। সেই কর হ্রাস বা পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক বেশি মানুষের রোজকার বাজেটে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। সেই সিদ্ধান্ত কিন্তু বাজেট হয় না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পৃথক জিএসটি কাউন্সিল রয়েছে। যারা গত বছর কিছু ক্ষেত্রে এই করে কমিয়েছে।
তাহলে বাজেট থেকে কি আর কিছু নেই আমজনতার জন্য? থাকতে পারে। ধরুন, বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা অথবা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি তৈরির জন্য সরকার হয়তো কোনও ছাড় দেবে বাজেটে। কিংবা চাষিদের জন্য বিশেষ কোনও সুরাহা। অথবা শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি বা দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ কোনও উৎসাহ প্রকল্প। সে সবের সঙ্গে আর্থিক সুবিধাও মিলতে পারে।
পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ নানা সামাজিক উন্নয়ন খাতে সরকার তাদের জন্য কোষাগার থেকে কত বরাদ্দ করছে, বাজেটে তার স্পষ্ট প্রতিফলন থাকা জরুরি। গত কয়েক দশক ধরে এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি ও চর্চা হয়েছে, তথ্যের তরজা বেঁধেছে, সেই অর্থ বরাদ্দ কমেছে কিনা।
কর্মসংস্থান বাড়াতে সেই অভিমুখে সরকার কতটা অর্থ বরাদ্দ করছে, তা সহজেই একজন গ্রামীণ বা প্রান্তিক মানুষকে কিন্তু বোঝানো সহজ, যদি এ ধরনের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের সহজ ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক বেশি চর্চা করা হয়, কর ছাড়ের তুলনায়।
দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়টি আজ সার্বিক বিশ্বের নিরিখে উপেক্ষা করার জায়গায় আর নেই। এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই খাতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের মতো দেশের উন্নয়নের মূল স্তম্ভগুলি কোনও ভাবে উপেক্ষিত বা দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে কিনা, তার সহজসরল চর্চাও আমজনতার ভাবনার জন্য জরুরি। কারণ, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান-- এই তিনটি যে সভ্যতার মূলে, সে কথা কারওই অজানা নয়।
তাই কাশফুল থাকুক, দুর্গাপুজোর আনন্দে ভেসে ওঠা যাক, কিন্তু শরৎ মানে শুধু সেটুকুই নয়, মনে মনে সেই চর্চা যেমন সারা বছরই চলে, তেমনই বাজেটকে নিছক কর ছাড়, বা কিছু জটিলতার আখ্যানে না মুড়ে, একটু সহজভাবে ভাবাও শুরু হোক।