নৌকা প্রতীকের ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন বলে ওই সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে। এর আগে আর একটি সংস্থা জানিয়েছিল, বিএনপি-কে ভোট দেবে আওয়ামী লিগের ৪৭ শতাংশ ভোটার।

শেষ আপডেট: 9 February 2026 15:38
‘আমি দেশেই আছি। যদিও বাড়িতে থাকতে পারছি না। জায়গা বদলে বদলে থাকছি। বুথে গেলে গ্রেফতার এমনকী মব হত্যার শিকার হতে পারি। তবে আমার বাড়ির লোকজনকে বলেছি ভোট দিতে। আমার এলাকায় বিএনপি-র (BNP) জয়ের সম্ভাবনা বেশি। আমাদের পরিবার এই প্রথম বিএনপি-কে ভোট দেবে।’ বলেছিলেন আওয়ামী লিগের ঢাকার এক স্থানীয় নেতা। নিরাপত্তার কারণে নাম গোপন রাখতে বলা ওই নেতা জানাচ্ছেন, তাঁর এলাকার আওয়ামী লিগের (Awami League) অনেকেই এবার প্রাণের দায়ে বিএনপি অথবা জামাতকে (Jamaat-E Islami) ভোট দিতে পারে। দুই দলই প্রকাশ্যে আর্জি জানিয়েছে। আড়ালে চলছে চোখ রাঙানি, আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লিগ নেতা-কর্মীদের এলাকায় ফেরা ও সুরক্ষার আশ্বাস। এলাকার বাস্তবতা নেতাদের জানিয়েছি।

নাম গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ পূজা পরিষদের (Bangladesh Puja Parishad) এক কর্তা জানাচ্ছেন, তাঁদের কাছে খবর স্থানীয় বাস্তবতা মেনে হিন্দুদের একাংশ এবার জামায়াতী ইসলামিকেও ভোট দিতে পারে। তাদের কেউ কেউ অতীতে আওয়ামী লিগের উপর গোসা করে বিএনপি-কে ভোট দিয়েছে। কিন্তু এবারই জামাতের দাঁড়িপাল্লায় ছাপ দিতে পারেন। পূজা পরিষদের ওই কর্তা জানাচ্ছেন, আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর বহু জায়গায় যেমন হিন্দুদের উপর হামলা হয়, তেমনই অনেক জায়গায় সংখ্যালঘুদের ঘর-বাড়ি, মন্দির, গির্জা পাহারা দিয়েছেন জামাতের স্থানীয় নেতারা। তাঁরা প্রতিদান চাইছেন। এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখলে জামাতকে চটানো কঠিন। তিনিও জানাচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে যে সংখ্যালঘু পরিবারগুলি আওয়ামী লীগের বাঁধা ভোটার ছিল তাদেরও অনেকে এবার বিএনপিকে ভোট দিতে পারেন।
এই দু’জনের বক্তব্যের প্রতিফলন এবারের ভোটে কতটা দেখা যেতে পারে? দেশের বাইরে থাকা আওয়ামী লিগের এক নেতা জানাচ্ছেন, এটাই বাস্তব। নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ায় দল ভোট বয়কটের ডাক দিলেও কর্মী-সমর্থকদের পাশে দাঁড়িয়ে অভয় দেওয়ার নেতা নেই। অনলাইন বৈঠকে দেশে থাকা স্থানীয় নেতারা অনেকেই জানিয়েছেন, ভয়ে কিংবা ভক্তিতে দলের একাংশ বুথে যাবে। সংখ্যাটা কত তা এখনই বলা মুশকিল।
একটি জনমত সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, আওয়ামী লিগের ৪৮ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপি-কে ভোট দেবেন। আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ (Uncovering public pulse: findings from a nationwide survey) শীর্ষক মতামত সমীক্ষার রিপোর্টে এই চিত্র পাওয়া গিয়েছে। কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (CRF-Communication and Research Foundation)) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ (Bangladesh election and public opinion studies) যৌথভাবে এই সমীক্ষা চালিয়েছে। তারা বলেছে, আওয়ামী লিগের ভোট বয়কটের আহ্বান উপেক্ষা করে মানুষ বুথে যাবেন। নৌকা প্রতীকের ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন বলে ওই সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে। এর আগে আর একটি সংস্থা জানিয়েছিল, বিএনপি-কে ভোট দেবে আওয়ামী লিগের ৪৭ শতাংশ ভোটার।

শেখ মুজিবুর রহমানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতার।
এমন প্রবণতা সামগ্রিক নয়, বিক্ষিপ্ত বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লিগের ভোট বয়কটের ডাক বানচাল করে দিতে ইউনুস সরকার মেটিকুলাস ডিজাইন কার্যকর করতে চাইছে। প্রশাসন এবং ভাড়াটে বাহিনী দিয়ে জোর জুলুম না করলে আওয়ামী লিগের কেউ বুথে যাবেন না।’ তাঁর দাবি, ‘সারা বাংলাদেশেই আওয়ানী লিগের দু কোটির উপর কর্মী-সমর্থক এলাকা ছাড়া। তাদের ভোট দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু তাদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ধমকানো হচ্ছে বুথে যেতে। তবে এত কিছুর পরেও ৬০ শতাংশের বেশি মানুষকে বুথে নিয়ে যাওয়াই কঠিন হবে।’
বাংলাদেশে এবার ভোটার প্রায় ১৩ কোটি। ২০২৪-এর জানুযারিতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ১২ কোটির সামান্য বেশি। সেবার বিএনপি, জামাত-সহ অধিকাংশ বিরোধী দল ভোট বয়কট করেছিল। ভোট পড়েছিল ৪০ শতাংশের সামান্য বেশি। এক তরফা সেই নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৯৩ শতাংশ পেয়েছিল আওয়ামী লিগ ও তাদের সমর্থিত স্বতন্ত্র বা নির্দলেরা। অর্থাৎ প্রদত্ত ৪০ শতাংশ ভোট আওয়ামী লিগই পেয়েছিল বলা চলে। দলের নেতাদের দাবি, গত দেড় বছরে আওয়ামী লিগের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘটনা হল, আওয়ামী লিগ বিরোধী সব দল নৌকা শিবিরের ভোটকে পাখির চোখ করেছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লিগের কাছে চ্যালেঞ্জের হল ভোট প্রদানের হার যত কম রাখা।
ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দলের ভোটারদের বুথে যাওয়া কি আটকাতে পারবে আওয়ামী লিগ? দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিমের বক্তব্য, 'আমরা শতভাগ আশাবাদী। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় রেখে আমরা ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছি। মানুষই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন। তিনি আরও বলেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা কর্মীদের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রাখছি।
আওয়ামী লিগ সমর্থকদের ভোট পেতে অভিনব কৌশল নেওয়ায় বাংলাদেশে গোপালগঞ্জের আইনজীবী হবিবুর রহমানকে নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব পরিচিতির তুলনায় আলোচনা বেশি। মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান তথা তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার সাড়ে তিন দশকের নির্বাচনী কেন্দ্র গোপালগঞ্জ-৩ এ এবার স্বতন্ত্র তথা নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন স্থানীয় এই বিএনপি নেতা। বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে প্রচার শুরু করায় রাতারাতি প্রচারের আলোয় চলে এসেছে তিনি। বলাই বাহুল্য আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়া তাঁর লক্ষ্য।
ভোটের বাংলাদেশের কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, হবিবুর রহমান ব্যতিক্রম নন। বিএনপি-র ২৮৮ এবং জামায়াতে ইসলামীর ২৫৩ জন প্রার্থীই আওয়ামী লিগ সমর্থকদের ভোট পেতে কোনও না কোনও কৌশল অবলম্বন করেছেন। এমনকী রুমিন ফারহানার মতো বিএনপির পরিচিত নেত্রী সহ দলের ৭৮ জন বিক্ষুব্ধ তথা বহিষ্কৃত প্রার্থীও হাসিনার অর্থাৎ নৌকা প্রতীকের ভোটারদের ভোট পেতে আগ্রহী। বেশিরভাগেরাই আওয়ামী লিগের এলাকা ছাড়া নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আশ্বাস দিচ্ছেন বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিলে তাদের আগামী পাঁচ বছর যাবতীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। তারা নির্বিঘ্নে চাকরি, ব্যবসা করে আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন। কোথাও বিএনপি নেতারা আওয়ামী লিগের কর্মী সমর্থকদের মামলা প্রত্যাহার, জামিনের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক কারণে নিহত ও আহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, এমনকি ছেলে মেয়ের পড়াশুনো, মেয়ের বিয়ের খরচ জোগানোর প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো বিএনপির প্রথমসারির নেতার আওয়ামী লিগ সম্পর্কে বলছেন, 'শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তাঁর অপকর্মের সাজা দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লিগের সবাই তো খারাপ নয়। বিনা দোষে কারও প্রতি অবিচার হোক, আমরা চাই না।'
একই কথা বলছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, জামায়াতের লড়াই আদর্শিক। আমরা ব্যক্তিকে শুধু রাজনীতি দিয়ে বিচার করি না। আওয়ামী লিগের নিরীহ, বিপদগ্রস্থ কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই নয়।' আওয়ামী লিগ নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, বিএনপি, জামাত যতই চেষ্টা করুক, নৌকার ভোটারদের গণ হারে বুথে নিয়ে যেতে পারবে না।
একান্তে সেই নেতারাই মানছেন, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। নেতারা এলাকা ছাড়া থাকায় কর্মীরা ভরসা পাচ্ছে না। অতীতে, ১৯৯৬ সালের খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে প্রথম নির্বাচন আওয়ামী লিগ বয়কট করেছিল। নেতারা গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে বয়কটের পক্ষে প্রচার করেছিলেন। হাতে হাতে ফল মিলেছিল। পরিস্থিতির চাপে এক-দে়ড় মাসের মাথায় ফের ভোট হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল ফের ক্ষমতায় ফিরেছিল। এবার নেতৃত্ব এলাকায় নেই। কর্মীদের ভরসা দেূবে কে?

মাদারীপুরে বিএনপি প্রার্থীর সমর্থনে আওয়ামী লিগ নেতাদের প্রচার
বস্তুত এই প্রশ্নকে বিবেচনায় রেখেই শেখ হাসিনার দলের একাংশ মনে করছেন, ভোটের পর পরই মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে ফিরতে না পারলে দলের অবস্থা পশ্চিমবঙ্গে বাম-কংগ্রেসের মতো হওয়া অসম্ভব নয়। তৃণমূলের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ধর্মনিরপেক্ষ ওই দুই দলের কর্মী-সমর্থকেরা দলে দলে বিজেপিতে চলে গিয়েছে। ফলে ২০০১ সাল থেকে বাংলার বিধানসভা বাম-কংগ্রেস শূন্য। আসন শূন্য হওয়ার পাশাপাশি দুই দলের ভোটও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে, এবার নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ায় বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ বিহীন সংসদ গঠিত হতে যাচ্ছে। ভোট বয়কটের ডাক সফল অর্থাৎ দলের সমর্থকদের বুথে যাওয়া আটকাতে না পারলে পার্টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হবে।
পরিস্থিতি নিরন্তন পর্যালোচনা করছেন আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দিল্লিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে খবর। শনিবারও দলের ফেসবুক পেজে দায়মুক্তি অনুষ্ঠানে তিনি বুথে না যেতে আওয়ামী লিগ সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। দলীয় সূত্রের খবর, শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে অধিকাংশ জেলার সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেছেন। বেশ কয়েকটি উপজেলা নেতৃত্বের সঙ্গেও ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন তিনি। মহম্মদ ইউনুস ভোটের দিন ঘোষণার পর থেকে হাসিনা বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসন ভিত্তিক সভা করেছেন।
আওয়ামী লিগ ভোটারদের অনেকেই বুথে যেতে পারেন, ভোট দিতে পারেন অন্য দলকে, এমন সম্ভাবনা উসকে দিয়েছে মাদারিপুরের ঘটনা, মনে করছে আওয়ামী লিগের একাংশ। মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের সমর্থনে আয়োজিত উঠান বৈঠকে দীর্ঘদিন পলাতক তথা কার্যক্রম–নিষিদ্ধ আওয়ামী লিগের আলোচিত অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী। বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে তারা উঠান বৈঠকে ভাষণ দেন। সেখানে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ‘জয় জিয়াউর রহমান’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষে ছাপ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন আওয়ামী নেতারা।
যদিও মাদারিপুরের ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ আওয়ামী লিগের আর এক সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। তিনি বলছেন, ‘আওয়ামী লিগকে হেয় করতে অনেক মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। বাস্তব হল, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বুথে যাবে না।’