শেষ পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলিকে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তা এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। গত ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শেষ যাত্রা তথা জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 14 February 2026 08:22
তারেক রহমানের (Tarique Rahman) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিদের ডাকা হবে কিনা সে বিষয়টি এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি বিএনপি। দলের দুজন শীর্ষস্থানীয় নেতা দ্য ওয়াল-কে (The Wall News) আভাস দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কভুক্ত দেশগুলিকে (SAARC) আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। বাংলাদেশ ছাড়াও ওই সংস্থার সদস্য দেশগুলি হল ভারত পাকিস্তান নেপাল ভুটান আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। ঢাকার কূটনৈতিক মহলের একাংশ সার্ককভুক্ত দেশগুলির প্রতিনিধিদেদের আমন্ত্রণ জানানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। এছাড়া চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং তুরস্কের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারেন। ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও সার্কভুক্ত দেশগুলি তো বটেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলিকে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে (Tarique Rahman Oath Ceremony) আমন্ত্রণ জানানো হলে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তা এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। গত ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার (khaleda Zia) শেষ যাত্রা তথা জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। উপস্থিত ছিলেন নেপাল ভুটানসহ একাধিক দেশের বিদেশ মন্ত্রীও। পাকিস্তানের তরফে উপস্থিত ছিলেন সে দেশে জাতীয় সংসদের স্পিকার। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন তারেক রহমান। ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শংকর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাঠানো শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। সেখানেই করমর্দন করে সৌজন্য বিনিময় করেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী ও পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার। অপারেশন সিঁদুরের পর সেটাই ছিল ভারত ও পাকিস্তানের দুই শীর্ষ কর্তার সৌজন্য সাক্ষাৎ। তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো হলে ঢাকায় ফের একহাত হতে পারে ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল মনে করছে, বিএনপি'র বিপুল জয় দলটিকে জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারমধ্যে অন্যতম হল ভঙ্গুর আর্থিক পরিস্থিতি। যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী দামে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। ইউনুস সরকারের সময় পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। দিন কয়েক আগে চালু হয়েছে ঢাকা করাচি বিমান পরিষেবা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দুদেশের মধ্যে ফ্লাইট চালু করেছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে অবনতি লক্ষ্য করা গেলেও বাণিজ্যে তেমন একটা ঘাটতি নেই।
ভারতের রপ্তানির পরিমাণ বরং হাসিনা সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খানিকটা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে তলানিতে ঠেকা সম্পর্ক দ্রুত মেরামত করা বিএনপি সরকারের আশু কর্তব্য হয়ে উঠবে। কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে নয়া দিল্লির আগাম ইতিবাচক বার্তা। নরেন্দ্র মোদীর সরকার শুধু খালেদা জিয়ার জানাজায় বিদেশ মন্ত্রীকে পাঠিয়ে দায়িত্ব সারেনি। তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি'র চেয়ারম্যান হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। তাঁর সঙ্গে তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়েছে। মনে করা হচ্ছে শপথ অনুষ্ঠানের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে যাবেন। তবে একটি বিষয়কে ঘিরে দু'দেশের মধ্যে বোঝাপড়ায় খানিকটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তা হল আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চ সার্কের পুনরুজ্জীবনে বিএনপি'র অতি উৎসাহ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরই ঢাকায় বিএনপি নেতৃত্ব বিদেশ নীতি নিয়ে তাদের অবস্থান পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। দলের বর্ষীয়ান নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন কোন দেশের সঙ্গেই বিশেষ সম্পর্কের দিকে ঝুঁকবে না তাঁদের সরকার। সবার আগে বাংলাদেশ দলের এই ঘোষণা বিদেশ নীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তিনি আরও বলেছেন সার্কের আধারে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেবে নতুন সরকার।
শুক্রবারই বিএনপির চেয়ারম্যানের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও সার্ককে ভিত্তি করে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলার কথা বলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তাকে ইতিবাচক কূটনৈতিক নজির বলে উল্লেখ করেছেন ওই নেতা। তিনি বলেছেন এভাবেই কূটনৈতিক সম্পর্ক এগোয়।
১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের একটি আন্তঃসরকার ও ভূ-রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে সার্ক যাত্রা শুরু করেছিল। বাংলাদেশে তখন ক্ষমতায় ছিলেন সেনা শাসক হুসেন মহম্মদ এরশাদ। যদিও এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর সময়ে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক এই ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। তাতে ভারত সহ আঞ্চলিক দেশগুলি সায় দিয়েছিল। বিদেশ নীতিতে সার্ক-কে বাংলাদেশ একটা সময় পর্যন্ত বিশেষ সাফল্য বলেই তুলে ধরেছে। পরিস্থিতির বদল ঘটে ২০১৬ সালে। ওই বছর ভারতে পাকিস্তানি জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে ইসলামাবাদে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয় নয়া দিল্লি। ভারতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাতে সায় দেয় নেপাল ভুটান বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র। সেই থেকে সার্ক একপ্রকার অচল হয়ে আছে। সার্কভুক্ত দেশগুলির মধ্যে শুধু ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিরাজ করছে। যদিও সে ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিও এর দু'বছর আগে ২০১৪ তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদী পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রিত ছিলেন সার্কভুক্ত বাকি দেশগুলির শীর্ষ নেতারাও।
বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূস এর অন্তর্ভুক্তি সরকার প্রথম থেকেই সার্ক পুনরুজ্জীবনের কথা বলে আসছিল। এই বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক বার শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। মহম্মদ ইউনূসের ইচ্ছায় সায় দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাহবাজ শরিফ। সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি বাংলাদেশের তরফে ভারতের কাছেও বেশ কয়েকবার পেশ করা হয়েছে। বিএনপি কাছেও সার্কের গুরুত্ব অনেক বেশি তাদের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এই মঞ্চ তৈরিতে বিশেষ আগ্রহের কারণে। কূটনৈতিক মহল আরও একটি কারণ উল্লেখ করে থাকে। তাদের বক্তব্য, ভারতকে চাপে রাখতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সার্ককে সচল করতে আগ্রহী। অন্যদিকে নয়া দিল্লি সার্কের বিকল্প হিসেবে বিমসটেককে শক্তিশালী করতে চায়। আঞ্চলিক সহযোগিতার ওই মঞ্চে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পাকিস্তান না থাকায় বিমসটেক নিয়ে ভারত বেশি আগ্রহী বলে মনে করে কূটনৈতিক মহল।