বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের টানা জনসভা, সুদিনের প্রতিশ্রুতি ও নেতৃত্বের ধরনে অনেকেই খুঁজে পাচ্ছেন ২০১৪-র নরেন্দ্র মোদীর ছায়া।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 8 February 2026 13:43
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান (BNP chairman Tareq Rahaman) রবিবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (Dhaka north city) এলাকায় সাতটি সংসদীয় আসনে জনসভা করবেন। তিনি নিজে ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী। রবিরার তাঁর প্রথম সভা বেলা দু’টোয় ইসিবি চত্বরে। আগামীকাল সোমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রকাশ্য প্রচার শেষ হবে। আগামীকাল বিএনপি চেয়ারম্যান আরও সাতটি সভা করবেন ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার আসনগুলিতে।

বিএনপি-র মিডিয়া সেলের সদস্য সাইরুল কবীর খান (Shairul Kabir Khan, member of the BNP media cell) রবিবার ‘দ্য ওয়াল’-কে (thewall.in) জানিয়েছেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান শনিবার পর্যন্ত ৫০টি জনসভা করেছেন। এজন্য দেশের ১৩টি বড় শহর সফর করেছেন তিনি।’ শনি ও রবিবারের সভাগুলি ধরলে ৬৪টি জনসভায় ভাষণ দেবেন তারেক রহমান।
শুধু জনসভাই নয়, বেশ কিছু পথসভাও করেছেন বিএনপি-র নবর্নিবাচিত চেয়ারম্যান। গত মাসের ২২ তারিখ সিলেট থেকে জনসভা শুরু করেন তিনি। বিএনপি সূত্রের খবর, দলের ২৮৮ জন প্রার্থীই নিজের এলাকায় চেয়ারম্যানকে দিয়ে পৃথক সভা করাতে আর্জি পেশ করেছিলেন। তারেক রহমানের প্রচার টিম মিলিয়ে মিশিয়ে প্রায় সব সংসদীয় আসনেই চেয়ারম্যানের সভার ব্যবস্থা করে। বাদ যায়নি শরিকদের আসনগুলিও।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার যে সব নতুন দিক আছে তারমধ্যে অন্যতম হল এই মূহূর্তে ময়দানে সবচেয়ে বড় দল বিএনপি-র মুখ বদল। প্রায় সাড়ে চার দশক দল এবং ভোটের ময়দানে বিএনপি-র মুখ ছিলেন সদ্য প্রয়াত তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (Khaleda Zia, former prime minister of Bangladesh)।

অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন খালেদা পুত্র তারেক। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ডা: জোবাইদা রহমান ও মেয়ে র্যরিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পাঁচ দিনের মাথায় প্রয়াত হন খালেদা। গুরুতর অসুস্থতার কারণে তিনিও বহু বছর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। যদিও তাতে তাঁর জনপ্রিয়তায় যে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি, জানাজা অর্থাৎ বিদায় যাত্রায় মানুষের ঢল দেখেই তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
খালেদাকে ঘিরে দেশবাসীর এই আবেগ তারেক রহমানের লড়াইকে একদিকে যেমন সহজ করে তুলেছে, অন্যদিকে, মায়ের না থাকাটা তাঁর দায়িত্বের বোঝা শতগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ১৭ বছর দেশে না থাকায় দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বহু বছর লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।
সেই তারেক রহমান এবার শুধু নিজে প্রথমবারের মতো ভোটে লড়াই করছেন তাই-ই নয়, দলকেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর যে দায়িত্ব খালেজা জিয়া পালন করেছেন। ফলে তারেকের কাধে এক সঙ্গে দুটি দায়িত্ব এসে পড়েছে। গোটা দেশের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের কাছে নিজেকে সশরীরে হাজির করার দায় ছিল তাঁর। সেই দায় থেকেই কোনও কোনও দিন সাত-আটটি করে সভা করেছেন তিনি। মঞ্চে তুলে নিয়েছেন স্থানীয় মানুষকে। তাদের হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিয়ে বলতে বলেছেন দল ও তাঁর কাছে তারা কী চান। কোনও মঞ্চে স্থানীয় তরুণী বলেছেন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার কথা, বলেছেন পড়াশুনো শেষ করার পর চাকরি করতে চান। কোথাও মঝবয়সি মহিলা বলেছেন, ছেলেমেয়েদের যাতে চাকরিবাকরি হয় বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেটা যেন নিশ্চিত করে। এছাড়া স্থানীয় চাহিদা তুলে ধরতে কেউ বন্যা প্রতিরোধ কর্মসূচি নিতে বলেছে, কেউ বলেছেন, ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে। এরই ফাঁকে বিএনপি চেয়ারম্যান যোগ দিয়েছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একান্ত আলাপতারিতায়। জনসভা থেকে ঘরোয়া আলোচনা, সর্বত্রই তিনি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি-র নির্বাচনী ইস্তাহারে তাই মস্ত বড় চমক গরিব পরিবারগুলিকে মাসে আড়াই হাজার টাকা নগদ অথবা সমমূল্যের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী দেওয়া। এর পাশাপাশি প্রতিটি সভায় তারেক রহমান সব হাতে কাজ দেওয়ার কথা বলছেন। বলছেন, বিএনপি সরকার গড়লে সুদিন ফিরবে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের দেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়ানো এবং ভাষণে তাঁর বক্তব্য, জনসংযোগের ধরনের মধ্যে অনেকেই ভারতে ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নরেন্দ্র মোদীর মিল খুঁজে পাচ্ছেন। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়ার পর গোটা দেশের মানুষের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে দিনে তিন-চারটি করে রাজ্যে সভা করতেন। মোদীর প্রচারের মূল কথা ছিল অচ্ছে দিন অর্থাৎ সুদিন ফেরানোর প্রতিশ্রুতি। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তিনি সরকারি অর্থ লুটপাট, নয়ছয়ের অভিযোগ তুলে উন্নয়নের নতুন বার্তা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য হবে গোটা দেশের উন্নয়ন। উন্নয়নে বৈষম্য দূর করাই হবে প্রধান কর্মসূচি।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, তারেক রহমান বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ঢাকায় তৈরি মেট্রো রেল, উড়াল পথের মতো মেগা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সব জেলায় পরিকাঠামোর উন্নয়নের কথা বলেছেন।
মোদী ও তারেকের নির্বাচনী ময়দানে উপস্থিতিতে আরও কিছু মিল আছে। মোদী এমন সময় দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়েছিলেন যখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে দলের সম্পদ তথা পার্টিকে প্রথম ক্ষমতায় আনা অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রচারের আলো থেকে সরে গিয়েছেন। বিজেপিতে ভোট ক্যাচার নেতার তখন বড় অভাব। ফলে মোদীকেই দলের প্রচারে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করতে হয়। বিএনপিতেও সমস্যা একই। খালেদা জিয়ার প্রয়ানে তৈরি হয় আরও এক সমস্যা। তারেক ছাড়া দলে ভোট ক্যাচার নেতা প্রায় নেই বললেই চলে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-সহ শীর্ষস্থানীয় সিংহভাগ নেতার দেশ জুড়ে ঘুরে ঘুরে প্রচার করার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। তারেকের জনসভায় উপচে পড়া ভিড় দেখে দল আশাবাসী মা খালদার শূন্যস্থান অনেকটাই পূরণ করেছেন নতুন নেতা। কারও কারও মতে, খালেদা মারা যাওয়ার দেড় মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকদের তুমুল আগ্রহের মূল কারণ তিনটি। এক. দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই. খালেদা ওয়েব। যা তাঁর জানাজায় দেখা গিয়েছিল তার রেশ এখনও আছে। তিন. নতুন নেতা তারেক রহমানকে চাক্ষুষ করা।