দায়মুক্তি অর্ডিন্যান্স কী এবং কেন তা নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক, সেই প্রশ্নই এখন কেন্দ্রে। একই অপরাধে কেউ দোষী, কেউ নির্দোষ—আদালতের অনুমোদন ছাড়াই দায়মুক্তির অভিযোগ ঘিরে উঠছে প্রশ্ন।

অধ্যাদেশ জারি করল মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার
শেষ আপডেট: 27 January 2026 10:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতে আন্দোলনকারীরা যেসব অপরাধ করেছেন তা মাফ করে দিল দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন স্বাক্ষরিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর মূল মূল বক্তব্য হলো গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া।
এরপরই আলোচনা শুরু হয়েছে এই অধ্যাদেশের মেয়াদ কতদিন? অধ্যাদেশ বা ইন্ডেমনিটির ফলে অপরাধীদের কি আইনের ছোবল থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলবে?
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, আন্দোলনে অংশ নিয়ে কেউ অপরাধমূলক কাজ করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। ইতিমধ্যে মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে থাকলে অবিলম্বে তাকে নিষ্কৃতি দিতে হবে। প্রশাসন এবং আইন আদালতকে বলা হয়েছে নতুন করে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
শুধু খুনের মামলার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে এই ব্যাপারে নিহত ব্যক্তির পরিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। সেই অভিযোগ কমিশন তার নিজস্ব তদন্তকারীদের দিয়ে তদন্ত করবে। তদন্তে পুলিশ প্রশাসনকে যুক্ত করা যাবে না।
সোমবার এই অধ্যাদেশ জারির পর থেকেই বাংলাদেশের আইন ও বিচার মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে এর বৈধতা নিয়ে। একাধিক আইনজীবী বলেছেন এইভাবে রাষ্ট্র একদল অপরাধীকে নির্দোষ ঘোষণা করে অপরাধে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায় বিচার পাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিল। এই ধরনের অধ্যাদেশ কখনই সাংবিধানিক বৈধতা পেতে পারে না।
এই সমালোচনার মুখে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের আইন উপদেষ্টা আসিঊ নজরুল। তিনি দাবি করেন, অধ্যাদেশ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনেও সুযোগই নেই। এই অধ্যাদেশে কোনো অবস্থাতেই জুলাই গণ অভ্যুত্থানকারীদের হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনও বিচারের বিধান রাখা হয়নি। এখানে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে যেমন, কোনো সম্পত্তির লোভে বা পূর্ব শত্রুতাবশত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে একদম সম্পর্কহীনভাবে যদি কোনেও হত্যাকাণ্ড করা হয় সেটার বিচারের কথা বলা হয়েছে। কাজেই এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নাই।'
বাংলাদেশ সরকারের পদস্থ কর্তারা বলছেন বিশ্বের বহু দেশে এই ধরনের পরিস্থিতিতে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেখানে গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার পতন ঘটে সেখানে আন্দোলনকারীরা কোন হিংসাত্মক কাণ্ডে জড়িয়ে থাকলে সেটাকে পরিস্থিতি জনিত অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। এমন অপরাধে সাজা না দেওয়ার বিধান অসংখ্য।
যদিও এই অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ফের আরেকবার একই অপরাধে দু'রকম বিধান ব্যবস্থা চালু হল বলে আইনজ্ঞদের অনেকের অভিমত। কারণ গণঅভ্যুত্থান দমনে পুলিশ প্রশাসন যেমন দমন পীড়ন চালিয়েছিল তেমনই আন্দোলনকারীরা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা হত্যার ঘটনায় যুক্ত ছিল। আওয়ামী লিগের দাবি ২০২৪ এর ৫ অগস্টের আগে-পরে প্রায় ৪০০ পুলিশ কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এই সব হত্যার ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের অবিলম্বে জামিন দিতে বলা হয়েছে। তারা প্রকৃত হত্যাকারী কিনা তা বিচার করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। একাধিক আইনজীবীর প্রশ্ন মানবাধিকার কমিশনের এই ধরনের বিচারের এক্তিয়ার আদৌ আছে কিনা। কারণ ফৌজদারি অপরাধের বিচারের একটি আর শুধুমাত্র আদালতের।
অভ্যুত্থানকারীদের অব্যাহতি দেওয়া হলেও অন্তর্ভুক্তি সরকারের বিগত আঠারো মাসে আওয়ামী লিগের কয়েক হাজার কর্মী সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের সিকিভাগেরও জামিন মেলেনি।
প্রশ্ন হল দায়মুক্তির মেয়াদ কতদিন? নিয়ম অনুযায়ী নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দায়মুক্তি অধ্যাদেশকে পাশ করাতে হবে। বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী অথবা তাদের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হলে সেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে অধ্যাদেশটি সংসদে পাস করানো হবে কিনা। ইউনুস সরকারের সিদ্ধান্তে এই দুই দল আপত্তি তোলেনি। ফলে ধরে নেওয়া যায় অধ্যাদেশটির সংসদে পেশ এবং পাশ হয়ে যাবে। যদিও বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত এই অর্ডিন্যান্স নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেনি। মনে করা হচ্ছে, আওয়ামী লিগের ভোটারদের সমর্থন পেতেই বিএনপি ও জামাত নেতৃত্ব অর্ডিন্যান্সের পক্ষে ক্ষীর চড়াচ্ছে না।
প্রশ্ন হল, সংসদে পাশ হলেই কি দায়মুক্তি চিরস্থায়ী হবে? এই ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগের নেতা মহবুবুল হাসান চৌধুরী নওফেল অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান সরকার প্রধান হওয়ার পর দায়মুক্তির অর্ডিন্যান্স সংসদে পাশ করিয়েছিলেন তাই শুধু নয়, তিনি সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু উচ্চ আদালত এই সংশোধনী বাতিল করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অনেকেরই বিচার এবং সাজা হয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিএনপি ও জামাতের জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়া অপারেশন ক্লিনহার্টে অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে সেনা পুলিশের অপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযানে প্রায় ৪০ জন নিরীহ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মী খুন হন। ওই অধ্যাদেশও আদালত বাতিল করে দিয়েছিল। আদালতের বক্তব্য কোনও নাগরিককে নির্দোষ ঘোষণা করে রাষ্ট্র কারও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
বাংলাদেশ দায়মুক্তি বিতর্কে নাম জড়িয়ে আছে আওয়ামী লিগ সরকারেরও। তবে শেখ হাসিনার প্রশাসন কোন ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়নি। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আইনে দায়মুক্তির বিধান রাখা হয়েছিল। গতবছর বাংলাদেশ হাইকোর্ট দায়মুক্তির সেই বিধানটিও বাতিল করে দিয়েছে।
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সোমবারে জারি করা অধ্যাদেশের ফলে বাংলাদেশের ফের এক দেশ দুই বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন হলো। নওফেল বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লিগের কর্মী সমর্থকদের উপর নির্বিচারে হামলা করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের আগে পরে কয়েকশো পুলিশ কর্মীকে ফোন করা হয়। হত্যা করা হয় কয়েকশো আওয়ামী লিগ কর্মীকে। ধ্বংস করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি। তিনি বলেন, এইসব অপরাধীদের নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে দায়মুক্তি অর্ডিন্যান্স জারি করে। তিনি বলেন আত্মরক্ষার্থে পুলিশ সহ নিরাপত্তা বাহিনী কোথাও কোথাও হয়তো বা প্রতি আক্রমণ করেছিলেন। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। অথচ আন্দোলনের নামে যারা দেশে অস্থিরতা তৈরি করল, শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা সংখ্যালঘুদের নিশানা করা, তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় হামলা ইত্যাদির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা হল না।
তাঁর বক্তব্য, অতীতের মতই দায়মুক্তির এই অর্ডিন্যান্সও আদালত খারিজ করবে এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।