.jpeg)
বাংলাদেশে লালমনিরহাটে মসজিদ ও পুজো প্যান্ডেল পাশাপাশি
শেষ আপডেট: 5 December 2024 16:47
অমল সরকার
ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বের অনন্য উচ্চতা থেকে হঠাৎ করেই নীচু স্তরের শত্রুতায় পর্যবসিত হয়েছে। গত কয়েকদিন যাবৎ সেই সম্পর্কে ধর্ম ঢুকে পড়েছে।
মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ধারাবাহিক নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনায় এপারের মানুষ সরব। অন্যদিকে, ভারতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে বলে অপারের নব্বই ভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বীর দেশটির অনেকে মুখ খুলেছেন।
কোনও পক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ এক আনা মিথ্যে নয়। আগামীকাল ৬ ডিসেম্বর ভারত-সহ গোটা উপমহাদেশের কাছে এক কালো দিন। ৩২ বছর আগে এই দিনে কয়েক শো টেলিভিশন ক্যামেরা, হাজার হাজার পুলিশ ও আধা সেনা এবং দেশের প্রথমসারির অতিপয় রাজনীতিকের সামনে সাড়ে-পাঁচশো-ছয়শো বছরের প্রাচীন সৌধ বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল। সেই ঘটনার জেরে দেশের নানাপ্রান্ত এবং উপমহাদেশের বহু জায়গায় সাম্প্রদায়িক সংহিসতার বলি হতে হয় কয়েকশো মানুষকে। আদালতের নির্দেশে অযোধ্যার সেই প্রাচীন মসজিদের জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন আধুনিক রাম মন্দির।
আবার ১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বরই ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় এসেছিল এরও দশদিন পর ১৬ ডিসেম্বর।
সেই বাংলাদেশের কতিপয় অশুভ রাজনৈতিক শক্তি যখন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাকে পুঁজি করে হিন্দুদের দেশ ছাড়া করতে মরিয়া, তখন ভারতে মসজিদের নীচে মন্দির খোঁজার অভিযান তীব্রতর করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। কাশী, মথরার পর উত্তর প্রদেশের সম্ভলের জামা মসজিদ, মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা, বিদিশা—মুসলিমদের একের পর এক উপাসনাস্থলকে মন্দির দাবি করে শুরু হয়েছে আন্দোলন, আইনি লড়াই। ভারতেও সরকার টুঁ শব্দটি করছে না।
স্বভাবতই সংখ্যালঘু নিপীড়ন নিয়ে প্রতিবাদে আমাদের নৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির কটাক্ষ এপারে গোটা দেশকে হজম করতে হচ্ছে। যদিও মন্দিরের নীচে মসজিদ খোঁজার অভিযান নিছকই হিন্দুত্ববাদীদের কর্মসূচি, যারা মোদী সরকারের প্রাণভ্রমরা। অধিকাংশ ভারতবাসীর যে অভিযানে সায় নেই।
অপারে হিন্দু নির্যাতনের ঘটনায় এপারে সংসদে, সংসদের বাইরে প্রায় সব দল সরব হওয়ায় বাংলাদেশের চলতি পরিস্থিতির সুযোগ এদেশের হিন্দুত্ববাদীরা অতীতের মতো একতরফা নিতে পারছে না। স্বভাবতই তারা দেশে অশান্তি তৈরিতে মেতেছে মসজিদের নীচে মন্দির খোঁজার অভিযান তীব্রতর করে।
এপারে সব দল সরব হওয়ায় অপারে মহম্মদ ইউনুস মঙ্গলবার সব দলকে ডেকে ‘বাংলাদেশ বিপন্ন’ বলে রব তুলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন, যা বাস্তবে ইসলামিক ঐক্য তৈরির চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। বৈঠকে কোনও দলই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনও নেতাকে নিয়ে যায়নি। এমনকী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলিও নয়। দেশে সংখ্যালঘুদের উপর লাগাতার নিপীড়িন, নির্যাতনের ঘটনায় মৃদু ভাষায় বিবৃতি দিয়েই দায় সেরেছে তারা। অতীতের মতো পথে নেমে প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটেনি।
পূর্ব পাকিস্তানে লাহোর, করাচি, রাওয়ালপিন্ডির একদা শাসকেরা অভ্যন্তরীণ বিপদে আপদে হিন্দুস্তানের দিকে আঙুল তুলে ‘ইসলাম খরতে মে হ্যায়’ আওয়াজ তুলতেন। মঙ্গলবারের বৈঠকে ইউনুস নাম না করেও সর্বদলীয় বৈঠকে বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের দ্বারা বিপন্ন। এই সময় সকলকে দেশের পাশে থাকতে হবে। এমনভাবে বিপন্নতার কথা বলেছেন যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
চট্টগ্রামের হিন্দু সাধু চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতার এবং আদালত চত্বরে তরুণ সরকারি আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে খুনের অভিযোগ নানা সমস্যায় জর্জরিত ইউনুস সরকারের জন্য সূবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে সব দলকে পাশে পাওয়ার। জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতি এবং আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি নিয়ে সরকারকে চেপে ধরার পরিবর্তে সব দল এক সুরে ইউনুসের পিঠ চাপড়ে দিয়েছে ভারত বিরোধিতার ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেওয়ায়। বলাইবাহুল্য বৈঠকে আওয়ামী লিগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
তিনি হিন্দু এবং ভারতকে এক করার কৌশল নিয়ে সফল। এই ব্যাপারে তাঁর জন্য সহায়ক হয়েছে ভারতে ক্ষমতাসীন সরকার ও শাসক দলের রাজনীতি।
৫ অগাস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে উগ্রবাদী ইসলামিক শক্তি ও ইসলামপন্থী দল, যারা সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লিগকে এক করে দেখছিল, তারাও এখন একতরফা হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সন্দেহ নেই অতীতের তুলনায় হিন্দুদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ এবার অনেক বেশি দৃশ্যমান। সেই কারণেই চিন্ময়কৃষ্ণকে দেশদ্রোহিতার মামলায় গ্রেফতার করে হিন্দুদের জোটবন্ধ লড়াই ভাঙার কৌশল নিয়েছে ইউনুস সরকার। সেই চেষ্টা সফল হবে কি না এখনই বলা মুশকিল। দু-পক্ষই প্রাণবাজি রেখে লড়াই চালিয়ে গেলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্মের পর জমানা নির্বিশেষে যে সাম্প্রদায়িক সংহিসতার ঘটনা ঘটেছে; আইনের পরিভাষায় সেগুলিকে দাঙ্গা বলা যাবে না, সবটাই সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর একতরফা সন্ত্রাস। চট্টগ্রামের আদালত লাগোয়া রাস্তায় আইনজীবী সাইফুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড হিন্দুদের পরিকল্পিত হিংসা হয়ে থাকলে তা ব্যতিক্রমী ঘটনা।
দুর্ভাগ্যের হল, কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে রাজনীতির সওদা করতে এপারে অনেকেই চাইছেন অপারের হিন্দুরা পাল্টা মারের এমন আরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শহিদের মৃত্যু বরণ করুক, জেলে পচে মরুক। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রাণ বাঁচাতে মানুষ অস্ত্র ধরে, পাল্টা হিংসায় মাতে। একদিকে, সীমান্ত সিল, ভিসা দেওয়াতে ভারত সরকারের কড়াকড়ি, অন্যদিকে, দেশে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লাগাতার হুমকি, সন্ত্রাসের মুখে ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রাণ বাঁচাতে নিজেরাই নিজেদের পথ বেছে নেবেন, কারও পরামর্শ, প্রেরণার প্রয়োজন হবে না। বরং তারা এপারের হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী সুবিধাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ফাঁদে পা না দিলেই ভাল করবেন।
সেই সুবিধাবাদীরা এপারে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীদের দিকে আঙুল তুলে হিন্দু ভোট এককাট্টা করার লক্ষে অশান্তি বাঁধানোর ছক কষছে। কিন্তু এপারের যুক্তিবাদী, চিন্তাশীল মানুষের মনে রাখা উচিৎ, ভারতে কট্টোর হিন্দুত্ববাদীদের মতো বাংলাদেশেও উগ্র ইসলামপন্থীরা শেষ কথা নয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ৫০ শতাংশ মানুষ এক সুরে কথা বললে মনে হয় তারাই একশো শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশের নীরবতা নজরে আসে না। ধর্তব্যের মধ্যে আসে না তারা কী চান, কী ভাবছেন। বাংলাদেশে এখন তেমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা ১৯৭৫-এর পর দেখা গিয়েছিল। সে বছর অগাস্টে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ তার অতীতকে অস্বীকার করে নতুন পথে যাত্রা শুরু করে। মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জন্ম নেয় জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, যে আদর্শের অর্ন্তরাত্মা হল ইসলাম, যা আর এক সেনা শাসক হুসেইন মহম্মদ এরশাদের হাত ধরে পল্লবিত হয়েছে। সংবিধান থেরে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ছেঁটে ইসলামকে যিনি রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন।
শেখ হাসিনার সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম রেখেই সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ফিরিয়ে এনেছিলেন। ইউনুস সরকার আদালতে গিয়েছে সংবিধান থেকে শব্দটিকে এখনই ছেঁটে ফেলতে। ১৯৭৫ পরবর্তী দশ-বারো বছর বাংলাদেশেও আজকের মতোই উগ্রবাদী ইসলামপন্থীদের দাপাদাপি ছিল। আওয়ামী লিগের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত না। বহু বছর পার্টি অফিস মুখো হননি নেতারা। মুজিব হত্যার প্রতিবাদে বর্তমান রাষ্ট্রপতি, তখন বয়সে তরুণ মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের মতো হাতে গোনা কয়েকজন বাদে কেউ পথে নামেননি।
কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় গত শতকের আটের দশকের গোড়া থেকে শেখ হাসিনা দলের হাল ধরার পর। তাৎপর্যপূর্ণ হল সেই থেকে আওয়ামী লিগের ভোট যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি, কমেওনি।
অন্যদিকে, অবাধ রাষ্ট্রীয় মদত পেয়েও জামায়াতে ইসলামির মতো রাজনৈতিক শক্তি ভোটের বাক্সে সুবিধা করতে পারেনি মানুষ দলটির উগ্র ইসলামিক আদর্শকে গ্রহণ না করায়। দুর্ভাগ্যের হল, দেশের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লিগ এবং বিএনপি, যারা সরকারিভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী তারা ভোটের স্বার্থে মৌলবাদীদের খুশি করতে নানা সময়ে জামাতের হাত ধরে ঐতিহাসিক ভুলের নজির গড়েছে। আবার বৃহৎ দুটি দলের হাত ধরেও ভোটের ময়দানে একক শক্তিতে লড়াইয়ের জায়গা তৈরি করতে পারেনি জামাত।
বিগত নির্বাচনগুলির ফল বলছে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের ধর্মীয় রাজনীতিতে সায় নেই। এই মানুষদের সামান্য অংশই সংখ্যালঘু, সিংহভাগ মুসলিম, বাংলাদেশের ইউনুস সরকার এবং সহযোগী শক্তি জামাত-বিএনপি’র চলমান রাজনীতির সঙ্গে মানাতে না পেরে যারা এখন অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। ৫ অগাস্টের পর ইউনুসের শাসনের গত চার মাসে যে কয়েকশো মানুষ খুন হয়েছেন তাদের নব্বুই-পঁচানব্বুই ভাগই মুসলিম। ধর্ম পরিচয়ের জন্য রেহাই মেলেনি তাদের।
অপারের মুখ বুজে থাকা মানুষ প্রতিবাদে সবর হলে ভাল হত। তাই বলে মুখ না খোলায় আমরা তাদের দোষারোপ করতে পারি না, পারি না তাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে। বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের ঘটনায় সরব হতে গিয়ে আমরা যেন মুড়ি-মুড়কি এক করে না ফেলি। হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালনে ভারত যেমন হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাবে না, তেমনই ইউনুসের সাধ্য নেই সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ছেঁটে দিয়ে বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র করে দেবেন।