ভারতে অবস্থানকালে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শংকর, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সহ পদস্থদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক হয় ভারতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গেও।

শেষ আপডেট: 9 April 2026 17:52
আড়াই দিনের দিল্লির সফর শেষ করে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার মরিশাস রওনা হয়েছেন ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে অংশ নিতে। দিল্লি থেকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে একই বিমানে যাওয়ার কথা বাংলাদেশি অতিথিদের। কূটনৈতিক মহল যে সিদ্ধান্তকে দু'দেশের মধ্যে সম্পর্কের উদীয়মান নব প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলে মনে করছে।
ভারতে অবস্থানকালে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শংকর, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সহ পদস্থদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক হয় ভারতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গেও।
হুমায়ুন কবির একই সঙ্গে বাংলাদেশের শাসক দল বিএনপি'র অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশ্বস্ত এই নেতা দিল্লিতে আলাদা করে বৈঠক করেন ভারতের শাসক দল বিজেপির বৈদেশিক বিষয়ক দুই নেতা বিজয় চৌথালিয়া এবং শিশির বাজোরিয়ার সঙ্গে। সেই বৈঠকে নানা বিষয়ে আলোচনার ফাঁকে হুমায়ুন কবির বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লেখা একটি চিঠি বিজেপি নেতাদের হাতে পৌঁছে দেন। তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন। এজন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা ও প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বিএনপির সভাপতি তারেক রহমান বিজেপি সভাপতিকে তাঁর সময় সুযোগ মতো দলীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। 
অন্যদিকে, বিজেপির দুই নেতা বাংলাদেশি অতিথিকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শংকরের লেখা 'হোয়াই ইন্ডিয়া ম্যাটার্স' বইটি উপহার দেন। হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বিজেপি নেতারা দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অফিস বাংলাদেশ হাউসে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে নৈশ ভোজে মিলিত হন। তারেক রহমানের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন আমাদের মধ্যে খুব ভাল আলোচনা হয়েছে।
টেলিফোনে দ্য ওয়াল-এর প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির তাদের দিল্লি সফরকে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার শুভ সূচনা বলে উল্লেখ করেছেন। দিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ার আগে হুমায়ুন কবির সংবাদ মাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার আর কোনও সম্পর্ক হবে না। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অনেক আগেই রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে। হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লিগ বাংলাদেশে এখন অস্তিত্বহীন। ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি হবে। সেই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন নতুন সম্পর্কে অগ্রাধিকার পাবে দু-দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক। তিনি আরও বলেন, ভারতের বর্তমান সরকারও নতুন সম্পর্ককে সমমর্যাদা ও জনগণের প্রত্যাশার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে।
ঘটনাচক্রে ওই দিনই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন বিদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।

মরিশাসের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে দিল্লি থেকে হুমায়ুন কবির দ্য ওয়াল-কে আরও বলেন, ভারতের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা যথেষ্ট গঠনমূলক এবং ইতিবাচক হয়েছে। বিজেপির বৈদেশিক বিষয়ক দুই নেতার সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা দলীয় পর্যায়ে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন নিয়ে কথা বলেছি। অনুযোগের সুরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে আওয়ামী লিগের আপত্তির কারণে বিএনপি'র সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক গতি হারিয়েছিল। আমরা আশা করছি আগামী দিনগুলিতে দলীয় পর্যায়েও সম্পর্ক স্বাভাবিক গতিতে এগবে। তিনি বলেন, আমরা দু দলের সব পর্যায়ের সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে কথা বলেছি। কথা বলেছি, দু'দেশের জনগণের মধ্যেও সর্বস্তরে যোগাযোগ স্থাপন নিয়ে। কথা হয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়েও। তিনি বলেন আমরা সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উপর জোর দিতে চাইছি যাতে দু'দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বিএনপি ভারতের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। বিজেপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠেছিল। বিজেপি নেতারা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত, স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিএনপি'র বিপুল জয়ের পর ওই দলের সভাপতি তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিয়েছিলেন। তারেকের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলেও লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠিয়েছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ব্রিটেনের বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ভারত সরকার ও আওয়ামী লিগের অবস্থানের গুরুতর ফারাক লক্ষ্য করা গিয়েছে। ২০২৪ এর ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ভারত সরকার বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটের কথা বলে আসছিল। অর্থাৎ বকলমে ভারত আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার পক্ষে মত পেশ করে আসছিল বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের আগে ভারত আর আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার বিষয়ে পীড়াপীড়ি করেনি। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি থেকে ভারত সরকার সরে যায়। নয়া দিল্লির প্রত্যাশা ছিল যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত স্থায়ী সরকার ক্ষমতায় আসুক। নির্বাচনের আগেই এই ব্যাপারে নয়া দিল্লির তরফে বিএনপির জয় আশা করা হয়েছিল। ফল প্রকাশের পর কালক্ষেপ না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। বিএনপি নেতার নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে আশা ব্যক্ত করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা সে দেশের বিদেশ মন্ত্রকের ভাষায় নয়া দিল্লিতে 'শুভেচ্ছা সফরে' এসেছিলেন।
এদিকে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সে দেশের বিদেশ মন্ত্রী ভারতের রাজধানীতে পৌঁছানোর পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় উভয় পক্ষ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা করেন।
ড. রহমান বলেন, সম্প্রতি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ভিত্তিতে, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং লাভের ওপর নির্ভর করে তাঁদের বিদেশ নীতি পরিচালনা করবে।
ড. রহমান ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়াত আহ্বায়ক ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান। উভয় পক্ষ একমত হয় যে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃতদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা এবং তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করে, যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আলোচনায় মন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে।
ড. রহমান সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের জন্য মন্ত্রী পুরিকে ধন্যবাদ জানান এবং ডিজেল ও সার সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। মন্ত্রী পুরি জানান, ভারত সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
উভয় পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলিতে পরামর্শ অব্যাহত রাখার বিষয়েও সম্মত হয়।