এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কী করছে? তারা একদা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ হলেও চরিত্রগতভাবে বিপরীত। সব দেশেই একটি সেনাবাহিনী থাকে। পাকিস্তানে সেখানে সেনাবাহিনীর হাতে একটি দেশ আছে।

শেষ আপডেট: 25 May 2025 16:02
বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনুস (Md Yunus, the Chief Advisor of Bangladesh) যে আরও একটি নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছেন, গত বৃহস্পতিবার রাতেই দ্য ওয়াল-(The Wall) -এ লেখা হয়েছিল। কারণ, তিনি যে একজন ক্ষমতালোভী মানুষ এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্ল্যাকমেলিংয়ে সিদ্ধহস্ত যেটা কারও বুঝতে বাকি নেই। যেমনটি ভাবা হয়েছিল তেমনই ঘটল, শনিবার বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মণ্ডলীর প্রস্তাবে (Resolution by Advisory Council of Bangladesh Interim Government) জানিয়েছে, ইউনুস থাকছেন।
ইউনুসের অনির্বাচিত সরকারের প্রধান হয়ে থেকে যাওয়া ইতিহাসের পাতায় তাঁর প্রধান পরিচয়গুলি অর্থাৎ অর্থনীতির পণ্ডিত, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার প্রবক্তা, নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপক, ইত্যাদি আড়ালে চলে গিয়ে একজন ক্ষমতালোভী ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে। শনিবার তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিটি খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়, বিগত নয়-সাড়ে নয় মাসে ইউনুসের রাজনৈতিক পরিপক্কতাও প্রশংসনীয়। বিবৃতির শুরুতে দাবি করা হয়েছে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর অর্পিত তিনটি প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন (Election in Bangladesh), সংস্কার (Reforms) ও বিচার (Judicial intervention) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।’ একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এই তিন দায়িত্ব কে বা কারা দিল সম্ভবত উপদেষ্টাদেরও জানা নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতা এবং ইউনুস সরকারের দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়ের উপস্থিতি থেকে ধরে নেওয়া যায়, এই অ্যাসাইনমেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।
বিবৃতিতে দুটি কথা গুরুত্বপূর্ণ, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘এক্তিয়ার বহির্ভূত’। কোনও সন্দেহ নেই সেনাপ্রধানকে সবক সেখাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সেনাপ্রধান ওয়াকার হুঙ্কার দেন, এক. নির্বাচন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে করতে হবে। দুই. অন্তর্বর্তী সরকার সেনাকে অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা মানা হবে না। তিন. হিউম্যান করিডর নিয়ে বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান এখন আর পাশাপাশি নন, মুখোমুখি।
সেনাপ্রধানের এই ঘোষণার সঙ্গে বিএনপি-র দাবিদাওয়ার সাযুজ্য কাকতালীয় নাও হতে পারে। বরং, তিনি খালেদা জিয়ার দলের দাবিতে জোরদার করছেন এমনটা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, আওয়ামী লিগের এই মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে ভাবার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে করিডর নিয়ে জোর গলায় আপত্তি তুলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি তাই ইউনুসের অপসারণের দাবিতে গলা চড়িয়েছেন। ইউনুসের পরিবর্তে কোনও ‘নিরপেক্ষ’ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ভোট চায় হাসিনার পার্টি। বলাইবাহুল্য হাসিনার প্রত্যাশা হল সেই সরকার আওয়ামী লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবে এবং তার আগে তাঁকে ও দলের বাকিদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করবে। ধরেই নেওয়া যায়, ইউনুস সরকার যতই অপ্রিয় হোক না কেন, খালেদা জিয়ার দল আওয়ামী লিগের তথাকথিত ‘জাতীয় সরকার’-এর প্রস্তাবে সায় দেবে না।
ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের শনিবারের বিবৃতির আরও একটি লাইন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাতে বলা হয়েছে, ‘শত বাধার মাঝেও গোষ্ঠীস্বার্থকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার তার উপর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যদি পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারের উপর আরোপিত দায়িত্ব পালনকে অসম্ভব করে তোলা হয়, তবে সরকার সকল কারণ জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
আমার মনে হয়, যে উদ্দেশ্য বা কৌশলকে বিবেচনায় রেখে এই বক্তব্য বিবৃতিতে যুক্ত করা হয়েছে, পরিস্থিতি সেদিকে গড়ালে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর দিকে মোড় নিতে পারে। আমার উপলব্ধি বলে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মহম্মদ ইউনুস সেনাবাহিনী এবং বিএনপি-সহ দ্রুত ভোটের দাবিদারদের ‘জনগণ’ দিয়ে শায়েস্তা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। রাজনীতির বৃত্তের বাইরের মানুষ এবং একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রধান ইউনুসের সঙ্গে যে ‘জনগণ’ আছে তা ধানমণ্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা, আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিতে সমাবেশ, আদালতে, অফিসকাছারিতে সরকার বিরোধীদের গণধোলাই, গণহত্যার একাধিক ঘটনায় প্রমাণিত।

জাতির পিতার বাড়ি ভাঙার দিন হাত গুটিয়ে ছিল ওয়াকারের সেনাবাহিনী
বিএনপি ইউনুসের সে দু’জন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছে তাঁদের একজন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইঞা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘BAL (বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ), North & Delhi (উত্তর এবং দিল্লি) জোটভুক্ত হয়ে যে কুমির ডেকে আনছেন তা আপনাদেরকেই খাবে।’ বাংলাদেশে এই উত্তর বা উত্তরপাড়া বলতে বোঝায় ঢাকার সেনানিবাস। সেই ক্যান্টনমেন্টের প্রধান বাসিন্দা সেনাপ্রধান ওয়াকার।
উপদেষ্টা মণ্ডলীর বিবৃতির আলোচ্য অংশটি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ইউনুস একপর তাঁর ‘জনসেনা’কে এবার সেনার বিরুদ্ধেও নামিয়ে দেবেন। প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নানা সুত্র থেকে ক্যান্টনম্যান্ট অভিযানের কথা শোনা যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার রাতে একদল লোক ঢাকায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়েছিল। সেনা বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির তৎপরতার মুখে তারা ফিরে যায়। সপ্তাহ দুই আগে সেনাবাহিনী ক্যান্টনম্যান্ট এলাকার বাইরে এক কিলোমিটার অসামরিক এলাকায় সভা-সমাবেশ, সমবেত চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। অর্থাৎ ক্যান্টনমেন্টে হামলায় ত্রস্ত সেনাবাহিনী। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আধুনিক অস্ত্রসস্ত্র এখন ইউনুসের জনগণের হাতে। যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাগি জঙ্গিরাও মুক্ত বিহঙ্গ। সেনাবাহিনী, ক্যান্টনমেন্টের উপর হামলা মোটেই অসম্ভব নয়। আসিফ মাহমুদ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ৫ অগাস্ট (২০২৪) হাসিনা সরকারের পতন না হলে তাঁরা অস্ত্র হাতে লড়াই শুরু করচেন। সেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। অর্থাৎ একটি গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি কিন্তু তৈরি হয়েই আছে। হুইসেল বাজানোই শুধু বাকি।

পিটিয়ে হত্যার ঘটনা পথ দুর্ঘটনাকেও ছাপিয়ে গেছে
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কী করছে? তারা একদা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ হলেও চরিত্রগতভাবে বিপরীত। সব দেশেই একটি সেনাবাহিনী থাকে। পাকিস্তানে সেখানে সেনাবাহিনীর হাতে একটি দেশ আছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর মুকুটের একটি উজ্জ্বল পালক হল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তারা একটি দেশকে স্বাধীন করেছে। স্বভাবতই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। গত বছর অস্থির পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সেই সরকারের মেয়াদ স্থির করে দেওয়ার নৈতিক অধিকার তাঁর আছে। সেই সরকার বিপরীত দিতে ধাবিত হলে হস্তক্ষেপ করার নৈতিক দায়ও তাঁর উপরই বর্তায়। সেই দায়ই তাঁকে ক্ষমতায়িত করেছে।
কিন্তু তিনি কি তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন? বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙা, নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে তাঁর বাহিনী কি আন্তরিক, দৃশ্যমান পদক্ষেপ করেছে? করেনি। ওয়াকারের সেনাও বাংলাদেশ পুলিশের মতো একটি রাজনৈতিক বাহিনীতে পরিণত, যাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লিগের কর্মী-সমর্থকদের জেলা পাঠানো।
ওয়াকার উজ জামান ডিসেম্বরের মধ্যে ভোটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ফোঁস করে হাততালি কুড়িয়েছেন, কিন্তু নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে অবস্থা বদলের চেষ্টা করেননি। সত্যি কথা বলতে কী, বিগত নয়-সাড়ে নয় মাসে তিনি নিজেকে ভীত-সন্ত্রস্ত জেনারেল এবং হুঁশিয়ারিকে শূন্যগর্ভ প্রতিপন্ন করেছেন। দুর্বলচিত্ত সেনাপ্রধানকে তাই নাম না করে এক্তিয়ার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ইউনুসের উপদেষ্টামণ্ডলী। এই সুযোগে ইউনুসও দাবি করতে পারছেন, তাঁর সঙ্গে ‘জনগণ’ আছে। কে না জানে সেই জনগণ হাতে মাথা কাটতে সিদ্ধহস্ত।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ইউনুসের এমন নিষ্ফলা বৈঠক এখন চোখের বিরক্তির কারণ বাংলাদেশের বহু মানুষের
কিন্তু মুদ্রার বিপরীত দিকটি অবাক করা। আমার পর্যবেক্ষণ বলে, বাংলাদেশে এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রথম সে দেশের বিপুল অংশের মানুষ সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন চাইছে। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (সেনা নিয়ন্ত্রিত) সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনার ভূমিকা নিয়ে কোনও জাতীয় সহমত ছিল না, যা বর্তমানে বিরাজ করছে। মানুষ চাইছে স্বাধীন বাংলাদেশের অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনটি সেনাবাহিনীর অধীনে অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু সেনাপ্রধান সম্ভবত তাঁর প্রতি জনসাধারণের অর্পিত শক্তি ও সমর্থন উপলব্ধি করতে পারছেন না অথবা তাঁর সে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নেই। উল্টে বারে বারে শূন্যগর্ভ হুঁশিয়ারি দিয়ে নিজের কুর্সিকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছেন, উপদেষ্টামণ্ডলীর বিবৃতিতে তেমন ইঙ্গিত আছে।
বাংলাদেশের চলতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং ইউনুস সরকারের ইনিংসকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছে সাবেক শাসক দল বিএনপি, যারা মনে করেছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লিগবিহীন বাংলাদেশে তারা ফাঁকে মাঠে গোল দিয়ে গণভবনে গিয়ে বসবে। কিন্তু বিগত ছ’-সাত মাস ধরে তাদের রাজনীতি একই খাতে বইছে। দল ডিসেম্বরে ভোট চেয়ে নির্বাচনের রোড ম্যাপ দাবি করছে। অন্যদিকে, ইউনুস তা এ কান দিয়ে শুনে ও কান দিয়ে বের করে দিচ্ছেন। শনিবারও (২৪, মে, ২০২৪) তিনি বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়ে রা কাড়েননি।
মজার দিক হল, সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিএনপির আচরণের আশ্চর্য মিল। খালেদা জিয়ার দলও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য নিয়ে বারে বারে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ময়দানে না নেমে নিজেদের এতটাই হাস্যকর, দিশাহারা দলে পরিণত করেছে যে ইউনুসের মতো রাজনীতিব বৃত্তের বাইরের মানুষও দেশের তিনবারের সাবেক শাসক দলকে লেজে খেলাচ্ছেন। ঢাকা দক্ষিণ পুর নিগমের মেয়র পদে বিএনপি নেতার নির্বাচন আদালত মেনে নিলেও তাঁকে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না ইউনুস সরকার। এমন একাধিক ঘটনায় স্পষ্ট, বিএনপি-র এখন নর্দমার জলে ডুবে মরার দশা।
খালেদা জিয়ার দলের এই পরিণতির অন্যতম কারণ জিয়া পরিবার। খালেদা অসুস্থ, তারেক জিয়া রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডন প্রবাসী। তাঁরা এতদিন দলের এমন কোনও আন্দোলন চায়নি যার সামনের সারিতে জিয়া পরিবারের কেউ নেই। তারেক জিয়া তাঁর স্ত্রী’কে দেশে পাঠিয়েছেন। ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে দলের হাল ধরছেন। সফল-অসফল নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে সন্দেহ নেই। বিএনপিকে ঘিরে নিয়েছেন ইউনুস। এইভাবে বাংলাদেশ কি বহুচর্চিত ‘মাইনাস-টু’-র দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটাই দেখার।