নির্বাচনের আগেই একাধিক জনমত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল সরকার গড়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে বিএনপি এবং তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাইছেন অধিকাংশ বাংলাদেশি। তবে তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে তারক রহমানের বিগত কয়েক বছরের যাত্রা ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই গোটা পৃথিবীতেই বিরল।

শেষ আপডেট: 13 February 2026 08:31
দলের বিপুল জয় নিশ্চিত হওয়ার পর নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় তারেক রহমান (Tarek Rahman) বলেছেন বিজয় মিছিলের নামে কেউ যেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে না পড়েন। আজ শুক্রবার জুম্মার নামাজে সকলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রী (Bangladesh future Prime Minister) তারেক রহমান। বিএনপির সূত্র বলছে, প্রায় দু'দর্শক পর ক্ষমতায় ফিরতে চলা দলের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে এই বিজয়কে ঘিরে উন্মাদনা যাতে কোন অশান্তির কারণ তৈরি না করে সে ব্যাপারে তিনি সকলকে সতর্ক করে দিয়েছেন। বিএনপির (BNP) এক কর্তা বলেন আমরা বদল চেয়েছিলাম বদলা নয়।
এখনও পর্যন্ত যা খবর তাতে ১৬-১৭ তারিখের মধ্যে তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ (Tarek Rahman oath as Bangladesh Prime Minister) নিতে পারেন। নির্বাচনের আগেই একাধিক জনমত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল সরকার গড়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে বিএনপি এবং তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাইছেন অধিকাংশ বাংলাদেশি। সেদিক থেকে বিএনপির জয় এবং তারেকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা।

তবে তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে তারক রহমানের বিগত কয়েক বছরের যাত্রা ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই গোটা পৃথিবীতেই বিরল। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসন জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। এর ৫ দিনের মাথায় বিএনপির চেয়ারপারসন তথা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হন। তবে মায়ের প্রয়াণের শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারেক এই প্রথম নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এবং দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঢাকা এবং বগুড়ার দুটি আসনেই তারেক রহমান বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এবার তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
যদিও সরকার প্রধান হওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত সমস্যা সঙ্কুল। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কিছু অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলেকে গ্রেফতার করে। প্রায় দু'বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক ছিলেন তারেক রহমান। সেই সময় তার ওপর কারাগারে অকথ্য নিপীড়ন নির্যাতন হয়। তাঁকে আদালতে পেশ করার সময় দেখা যেত কারাগারের অত্যাচারে তিনি রীতিমত কাবু হয়ে পড়েছেন। ২০০৮ সেপ্টেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে জামিন দেয়। এরপর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে তিনি লন্ডন চলে যান। এরই মধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান তারেকের ছোট ভাই। চিকিৎসা করাতে যাওয়া তারেক লন্ডনেই থেকে যান। বিএনপির অভিযোগ দেশে ফিরলে আওয়ামী লিগ সরকার তাঁকে জেলে আটকে রাখতো এই আশঙ্কায় তিনি দেশে ফেরেননি। সেই আশঙ্কা আরো জোরদার হয় তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার এবং কারাগারের একটি ছেলে বছরের পর বছর আটকে রাখার ঘটনায়। খালেদা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছিল হাসিনা সরকার। বিএনপি'র দাবি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশে চিকিৎসা করতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। হাসিনা সরকার শত অনুরোধেও সেই সুযোগ না দেওয়ায় খালেদার মৃত্যুর পর বিগত সরকারের দিকে আঙ্গুল ওঠে।
তারেক বিদেশে এবং খালেদা কারাগারে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় থাকায় বিএনপি বড় ধরনের বিপর্যয় মুখে পড়ে বাংলাদেশে। সেই সময়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করে খালেদা জিয়া দলের শীর্ষ নেতাদের ইচ্ছায় তার পুত্র তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন। এর আগে তারিখ ছিলেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান।
নতুন দায়িত্ব পেয়ে লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দল পরিচালনা করে বাংলাদেশে বিএনপিকে সক্রিয় রাখেন তারেক। ১৭ বছর ধরে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দল পরিচালনার এমন নজির গোটা বিশ্বে বিরল। পার্টির একাধিক বর্ষীয়ান নেতা বলছেন, তারেকের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি বিদেশে বসে দলের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এমনভাবে দল পরিচালনা করেছেন যে হাসিনা সরকারের দমন পীড়নের মুখেও বিএনপি ভেঙে যায়নি।
শুধু লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোই নয়, দেশে একের পর এক মামলায় যেবার হতে হয়েছে খালেদা পুত্রকে। ২০০৪ সালে বিএনপি জমানায় চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় হাসিনা সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দায়ের করে। ওই বছরই শেখ হাসিনা সবাই গ্রেনেড হামলার মামলাতেও তারেকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিল সাবেক আওয়ামী লিগ সরকার। এছাড়া দুর্নীতির গুচ্ছ মামলা তো ছিলই। এর মধ্যে দুটি মামলায় তারেকের যাবজ্জীবন কারাবাসে সাজা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট ওই মামলাগুলি থেকে তারেক রহমানকে মুক্তি দেয়। ফলে মামলা মুক্ত হয়ে তিনি দেশে ফেরেন।
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা তথা বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের ছোটবেলা কাটে ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিক্ষুব্ধ সেনাদের হাতে নিহত হওয়ার পর পরবর্তী সরকার তার পরিবারকে ক্যান্টনমেন্টের কোয়ার্টারে থাকার অনুমতি দিয়েছিল। স্কুল জীবন শেষ করে তারেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। তবে সেই কোর্স তিনি সম্ভবত শেষ করতে পারেননি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে।
রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি সেনা শাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আটের দশকের মাঝামাঝি একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারেক ভোটের কাজেও সংযুক্ত ছিলেন। তবে সক্রিয়ভাবে ভোটের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হন ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সেবার তিনি তাঁর মায়ের আসন গুলিতে নির্বাচন দেখভালের দায়িত্ব ছিলেন। খালেদা জিয়া সেবার পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। খালেদা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন ২০০১ সালে। ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি'র ওই সরকারের সময় তার এক সমান্তরালভাবে প্রশাসন চালাতেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল। তবে তখন থেকেই তিনি দল পরিচালনায় মায়ের সহকারীর ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রতিকূলতা কাটিয়ে তারেক রহমান এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। এখন দেখার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেকে কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের পাশে হাজির করেন।