শেখ হাসিনা আওয়ামী লিগ নেতাদের ৭, ১৭ ও ২৬ মার্চ ধানমণ্ডি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বাধীনতার স্মরণ উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা
শেষ আপডেট: 25 February 2026 11:52
আগামী ৭, ১৭ এবং ২৬ মার্চ বাংলাদেশের মাঠে ময়দানে সদলবলে নামার প্রস্তুতি নিতে আওয়ামী লিগ নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বলেছেন ওই দিনগুলি যাবতীয় বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র নেতাকর্মীদের নামতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চের ওই তিনটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। সেই ভাষণেই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক উক্তি, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'
ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন ওই দিনেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে।
আওয়ামী লিগ এবং তাদের সরকার ওই দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছিল। গত বছর তাতে বাদ সাধে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হওয়ায় আওয়ামী লিগের নেতা কর্মীরা দিনটি প্রকাশ্যে পালন করার সুযোগ পাননি।
শেখ হাসিনা দলীয় বৈঠকে বলেছেন, আমি আশা করব বর্তমান সরকার আওয়ামী লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। তারা সে পথে না হাঁটলে আমাদেরকেও কর্মসূচি নিতে হবে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লিগ নেত্রী বৈঠকে বলেন, কোনও দলের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলেই সেই দলের কর্মীরা স্বাধীনতা দিবস সহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিনগুলি উদযাপন করতে পারবে না এইরকম কোন বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় না। তিনি বলেন, জেলখানাতেও দোষী সাব্যস্ত এবং বিচারাধীন বন্দিরা স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি পালন করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা। তার জন্মদিন উদযাপন জাতির সকলের কর্তব্য। তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব কাউকে নতুন করে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। সাত মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার পথে হাঁটার গোড়াপত্তন করেছিল। ওই দিনই দেশবাসী মনস্থির করে নিয়েছিল এরপর যুদ্ধে নামতে হবে। আমরা অপেক্ষায় থাকব নতুন সরকার এই দিনগুলি উদযাপনে আওয়ামী লিগকে বাধা দেয় কিনা।
১৭ মার্চ হল শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লিগ তাদের প্রাতঃস্মরণীয় নেতাকে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ পায়নি। ঢাকায় ধানমণ্ডি-৩২ এ মুজিবুর রহমানের বাড়ি যেটি জাতীয় সংগ্রহশালা ছিল সেটি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল উগ্রবাদী লোকজন। ওই বাড়িতে কাউকে শ্রদ্ধা জানাতে দেওয়া হয়নি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাওয়া কয়জন নারী ও পুরুষ হেনস্থার শিকার হন। ফুল নিয়ে একজন রিকশচালক চালক শ্রদ্ধা জানাতে গেলে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।
২৬ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় দিবস তথা স্বাধীনতা দিবস। হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লিগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি স্বাধীনতা দিবসে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং অন্যত্র দিনটি উদযাপনের সুযোগ পায়নি। স্মৃতিসৌধে এবং অন্যত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লিগের বেশ কিছু নেতা-কর্মী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ৭, ১৭ এবং ২৬ মার্চের কারণে মার্চ মাসকে সে দেশে বলা হয়ে থাকে স্বাধীনতার মাস। মঙ্গলবার দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নেতাদের হাসিনা বলেছেন ওই দিনগুলি সর্বশক্তি দিয়ে পালন করতে হবে। গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র স্বাধীনতা দিবসের বেদি বানিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে হবে। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যেতে হবে ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর সমাধি ক্ষেত্রে। এর মধ্যে ধানমন্ডির বাড়িতে উগ্রবাদীরা দু দফায় হামলা চালিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে।
ওয়াকিবহাল মহলের খবর আওয়ামী লিগ নেত্রী অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কূশলী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওই দিন তিনটি নিয়ে। তিনি বুঝে নিতে চান বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ওই তিন ঐতিহাসিক দিন উদযাপনে তারেক রহমানের প্রশাসন এবং বিএনপি আওয়ামী লিগকে বাধা দেয় কিনা। দলের এক প্রথম সারির নেতা বলেন, অবৈধ ইউনুস সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞায় আওয়ামী লিগ স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম চালু করতে পারছে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার আছে ৭, ১৭ এবং ২৬ মার্চ পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করার।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আওয়ামী লিগ নেত্রীর ঘোষণা তারেক রহমানের প্রশাসন ও বিএনপি দলের উপর কিছুটা হলেও চাপ তৈরি করবে। বিএনপি শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে মানে না। তাদের দাবি, এই ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধের সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বীর উত্তম উপাধি দিয়েছিলেন।
সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষার কথা বলে নির্বাচনের বিপুল বিজয় হাসিল করেছে। জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলায় তাদের একটি বড় স্লোগান ছিল, যে কোনও মূল্যে স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সেই দলের সরকারের পক্ষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বলেই আওয়ামী লিগকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ যা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে, আওয়ালী লিগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শেখ মুজিবের জন্মদিন এবং দেশের স্বাধীনতা দিবস পালনে দলকে বাধা দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হবে কিনা তা নিয়ে নানা মহলে চর্চা শুরু হয়েছে।