গোপালগঞ্জের (Gopalganj, a District in Bangladesh under Dhaka division) ঘটনার পর থেকে দেশের সেনাবাহিনীর (Bangladesh Army) ভূমিকা নিয়ে মুখ খোলা শুরু করেছেন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina, former Prime Minister of Bangladesh) । রবিবার বেশি রাতের ভাষণে তা আরও তীব্র করেছেন আওয়ামী লিগ নেত্রী (Awami League President) ।

শেষ আপডেট: 21 July 2025 12:30
গোপালগঞ্জের (Gopalganj, a District in Bangladesh under Dhaka division) ঘটনার পর থেকে দেশের সেনাবাহিনীর (Bangladesh Army) ভূমিকা নিয়ে মুখ খোলা শুরু করেছেন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina, former Prime Minister of Bangladesh) । রবিবার বেশি রাতের ভাষণে তা আরও তীব্র করেছেন আওয়ামী লিগ নেত্রী (Awami League President) । ভাষণে তিনি সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর এবং আওয়ামী লিগের সঙ্গে বেইমানি করার অভিযোগ করেছেন।
বলেছেন, বাংলাদেশের সেনা বাহিনী আজ যে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে সেগুলি সবই তিনি সরকার প্রধান থাকার সময় চালু করেন। সুবিধা প্রদানের লম্বা তালিকা তুলে ধরে হাসিনা আক্ষেপ করেন, ‘এই সেনা বাহিনী কি না আমারই দলের নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করল!’ (this army indiscriminately shoot and kill innocent people from my party!) গোপালগঞ্জের ‘গণহত্যা’ (Gopalganj genocide) এবং গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে সেনা বাহিনীর উদ্দেশে হাসিনার প্রশ্ন, ‘তাদের এই ভূমিকা কোথায় ছিল যখন গত বছর ১৫ জুলাই থেকে যখন আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারছিল, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করছিল। তখন তাদের বিবেক কাঁদেনি। অথচ গোপালগঞ্জে জাতির পিতার সমাধি রক্ষা করতে যাওয়া নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে। হাসিনা বলেন, গোপালগঞ্জের ঘটনায় অভিযুক্ত সেনার দেশে ও বিদেশে বিচার হবে। আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়াতেও দাঁড়াতে হবে।

হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে আওয়ামী লিগ তো বটেই বাংলাদেশর রাজনৈতিক মহলেও চর্চা শুরু হয়েছে। দলের অনেকেই বলছেন, নেত্রীর কথায় স্পষ্ট তিনি উপলব্ধি করেছেন, দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষেছিলেন।
গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে গোপালগঞ্জের ঘটনা মধ্যবর্তী এগারো মাসে হাসিনা কখনও সেনাবাহিনী ও পুলিশে বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। বরং বরং বারে বারে অভ্যুত্থানের আগে-পরে পুলিশ হত্যার নিন্দা করেছেন। আওয়ামী লিগের অভিযোগ, প্রায় সাড়ে চারশো থানা আক্রান্ত হয়। কয়েকশো পুলিশ কর্মীকে হত্যা করেছে অভ্যুত্থানকারীরা। হাসিনার পাশাপাশি তাঁর দল আওয়ামী লিগের নেতারাও সেনার বিরুদ্ধে মুখ খোলা বন্ধ রেখেছিলেন।
একমাত্র ব্যতিক্রম সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল (Asadudzzaman Khan Kamal, former home minister of Bangladesh) । গত সপ্তাহে তিনি দ্য ওয়াল-কে (The Wall) দেওয়া সাক্ষাৎকারে গোলালগঞ্জে সেনা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সরব হন। সেই সঙ্গে নাম করে সেনা প্রধান ওয়াকার উজ জামানের ভূমিকার নিন্দা করেন। বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আগে সেনা প্রধান সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, পরিস্থিতি সেনার নিয়ন্ত্রণে আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী-সহ সমগ্র দেশবাসীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই তাঁর ভূমিকা পাল্টে গিয়েছিল।
সেনাপ্রধান পদে ওয়াকার উজ জামান (Waqar Uz Zaman, Bangladesh Army chief) দায়িত্ব নেন গত বছর জুনে। তিনি সম্পর্কে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাঁকে ওই পদে বসানোর পরই দলের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, একজন জামাত ঘনিষ্ঠকে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। যদিও হাসিনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খোলেননি। হাসিনাও এখনও পর্যন্ত ওয়াকারের নাম করে আক্রমণ করেননি। তবে লাগাতার সেনার সমালোচনায় স্পষ্ট তিনি উপলব্ধি করেছেন, ওয়াকারকে সেনা প্রধান করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
দলের একাংশের মতে, এতদিন সেনার বিরুদ্ধে নীরব থাকার নির্দিষ্ট কারণ ছিল। হাসিনা-সহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছিলেন, ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে এক পর্যায়ে গিয়ে রুখে দাঁড়াবেন সেনা প্রধান। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলে আওয়ামী লিগকে ভোটে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলছিলেন, মনে করছিল দল। কিন্তু গত ১২ মে আওয়ামী লিগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন এবং দলটির নির্বাচনী প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্তে সেনা প্রধানের নীরবতায় স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি ইউনুস সরকারের অনাচার মেনে নিয়েই সেনাপ্রধান হিসাবে কর্মজীবন শেষ করতে চান। ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে বিএনপি-র সঙ্গে ইউনুস সরকারের বিবাদ, নির্বাচন ঘিরে টালবাহানা দেখেও তিনি নীরব।
গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হাসিনা ভারত থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলের উদ্দেশে নিয়ম করে ভাষণ দিচ্ছেন। তবে রবিবারের ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। আওয়ামী লিগের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে প্রচার করা হয়েছিল, হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। দেশবাসীকে গোপালগঞ্জ পরবর্তী দিকনির্দেশনা দেবেন। রবিবার রাতে সেই ভাষণে হাসিনা দেশ বাঁচানোর ডাক দিয়েছেন। দেশবাসীকে তাঁর দলের পাশে চেয়েছেন। বলেছেন, দেশ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক অবস্থা বিপন্ন, বিপন্ন সার্বভৌমত্ব। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিদেশিদের করিডর দেওয়া হচ্ছে।
দেশবাসীর উদ্দেশে আওয়ামী লিগ নেত্রী বলেন, ধামমণ্ডিতে জাতির পিতার বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এখন গোপালগঞ্জে তাঁর মাজার ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে। আপনারা কি এই সব অপরাধ মুখ বুজে সহ্য করবেন? দেশ কি এভাবেই চলবে?
মুজিব হত্যার প্রসঙ্গ টেনে সেনাবাহিনীকে নিশানা করেন হাসিনা। বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনায় একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হচ্ছে। হাজার হাজার সেনাকে হত্যা করা হয়। এমনকী ছুটিতে থাকা অবস্থান সেনা কর্তাকে হত্যার নজিরও আছে।
আওয়ামী লিগ নেত্রী এরপর যোগ করেন, এই সেনার দু’বেলা ভাত জুটত না। মাছ-মাংস জুটত না। আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ সবের ব্যবস্থা করেছি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে দিয়ে বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলেছি যাতে তারা রাষ্ট্রসংঘের শান্তি সেনা বাহিনীতে জায়গা পায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, আমি সরকার গড়ার পর সেনা বাহিনীর বেতন, পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেছি। নতুন ডিভিশন চালু করেছি। সেনা বাহিনীর জন্য হাসপাতাল চালু করেছি। উপযুক্ত পোশাকের ব্যবস্থা করেছি। গোপালগঞ্জে সেনার গুলিতে আওয়ামী লিগ কর্মী খুনের ঘটনা তুলে ধরে হাসিনা আক্ষেপ করেন, এই বাহিনী কিনা আমার দলের নিরীহ মানুষগুলিকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করল। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কথায়, গোপালগঞ্জের ঘটনা পাক বাহিনীর অত্যাচারকে মনে করিয়ে দেয়। তাঁর কথায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাক সেনাকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দিত আজ সেই স্বাধীনতা বিরোধীদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা দিচ্ছে দেশের সেনা বাহিনী।