সরকারিভাবে না ঘোষণা করা না হলেও একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, বিএনপি-সহ বহু দলের অনেক নেতাই জুলাই বিপ্লবকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী নন।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 5 August 2025 09:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি। গত বছর ৫ অগস্ট গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর পদ্মা মেঘনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। দেশে আছে সেই তিমিরেই। কারও কারও মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, খুনখারাবি, ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, পিটিয়ে হত্যা, মব হামলা, চরম দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ থেকে শুরু করে জঙ্গি আস্ফালন, সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি এক বছর আগের তুলনায় আরও খারাপ হয়েছে।
এই সমালোচনাকে পিছনে রেখে মঙ্গলবার গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনটি উৎসবের মেজাজে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার। সকাল থেকেই ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে শুরু হয়েছে সরকারি-বেসরকারি , উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকালে সংসদ ভবন লাগোয়া এলাকায় জনসমাবেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। তিনি জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। সেটি হল ২০২৪-এর গণ বিপ্লবের একটি দলিল। যা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আওয়ামী লিগ বিরোধী বেশিরভাগ দল তাতে সম্মতি দিয়েছে।
এদিকে, গণঅভ্যুত্থান অর্থাৎ তিনি ক্ষমতা হারানোর এক বছরের মাথায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফের দাবি করেছেন,আমি এখনও দেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। আমি পদত্যাগ করিনি। আমাকে জোর করে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। হাসিনা মঙ্গলবার দলের ফেসবুক পেজে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ন'টায়। আওয়ামী লিগ ৫ অগস্টকে গণতন্ত্র ও ছাত্র-জনতা-পুলিশ হত্যা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৯৭৫-এর ১৫ অগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। আওয়ামী লিগ জমানায় অগস্ট বাংলাদেশে তাই শোকের মাস হিসাবে পালিত হত। গত বছর থেকে তা বদলে গিয়েছে। দিনটি ইউনুস সরকার পালন করেনি। শোকের অগস্ট উপলক্ষে এক বার্তায় হাসিনা ফের বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাহপত্র পেশ করেননি। বলেছেন, আমিই এখনও বৈধ প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে, ২০২৪-এর বৈষম্য বিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে জুলাই ঘোষণাপত্রের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদও প্রকাশ করবে ইউনুস সরকার। এর খসড়া বাংলাদেশের ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলির কাছে পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে চূড়ান্তভাবে গৃহীত অঙ্গীকারগুলি দু বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে রাজনৈতিক দলগুলি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।
ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলি রিয়াজ সংবিধান সংশোধন কমিশনের চেয়ারম্যান। তাঁর অফিস রাজনৈতিক দলগুলির কাছে খসড়া প্রস্তাবের কপি পাঠিয়েছে। বলাইবাহুল্য, ওই খসড়া আদতে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব, যাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রত্যাশা অগ্রাধিকার পেয়েছে।
খসড়া প্রস্তাব গৃহীত হলে বাংলাদেশের সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের পর জুলাই বিপ্লব অর্থাৎ হাসিনা সরকারের পতনের পর্বকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে অতীতে কোনও সরকারের জমানার কালিমালিপ্ত করা ইতিহাস এর আগে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আওয়ামী লিগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং ভবিষ্যতে ওই দল যাতে আইনি পথে বৈধতা না পায় সে জন্যই ওই সংবিধানে গণ অভ্যুত্থানকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব খসড়ায় রাখা হয়েছে।
সরকারিভাবে না ঘোষণা করা না হলেও একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, বিএনপি-সহ বহু দলের অনেক নেতাই জুলাই বিপ্লবকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী নন।
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে,
১. আমরা নিম্ন সাক্ষরকারীগণ এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্ত এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপ্রেক্ষিতে জন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসাবে দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫- এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।
২. জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ দেশের শাসন ব্যবস্থা তথা সংবিধান বিচার ব্যবস্থা নির্বাচন ব্যবস্থা জনপ্রশাসন পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব সুপারিশ এই সনদে লিপিবদ্ধ হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন সংযোজন পরিমার্জন লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুর্নলিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
৩. জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫- এ দেশের শাসন ব্যবস্থা তথা সংবিধান বিচার ব্যবস্থা নির্বাচন ব্যবস্থা জনপ্রশাসন পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন, তার বিষয়ে সুপারিশ এই সনদে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এগুলির বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন পরিমার্জন লিখন ও পুনর লিখন করা হবে।
৪. জুলাই সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধান সুরক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
৫. ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবো।