.webp)
বাংলাদেশে থাবা বসিয়েছে ভয়ানক বন্যা
শেষ আপডেট: 28 August 2024 19:03
অমল সরকার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন গোটা বিশ্বের আলোচনার বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পঁচিশ দিন কেটে গিয়েছে, সে দেশে জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির খানিক উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষ এখনও আতঙ্কগ্রস্ত। গোড়ায় মূলত আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মী এবং সংখ্যালঘুরা উৎশৃঙ্খলতার শিকার হলেও এখন দল, ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই বিপন্ন। এখনও ‘আমরা সবাই রাজা’ আবহ বিরাজ করছে। ইতিমধ্যেই সে দেশের প্রথমসারির সাংবাদিক, জনপ্রিয় ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ যাঁরা সদ্য সংঘঠিত গণ অভ্যত্থনাকে দু-হাত তুলে সমর্থন করেছিলেন তাঁদের অনেকের গলায় হতাশার সুর। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলছেন, এমন পরিবর্তন আমরা চাইনি।
ছাত্ররা সংস্কারের কথা বলে অভ্যুত্থানের ডাক দেয়। সংস্কারের সংকল্প নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসেছেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনুস। ৮ অগাস্ট তিনি ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশবাসী এ পর্যন্ত যা পেয়েছে তা এক কথায় নৈরাজ্য। জোর করে সরকারি পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কলেজের অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো, চড় থাপ্পড় মারা ইত্যাদি কিছুই বাকি থাকছে না।
অবশ্যই এই নৈরাজ্যবাদীরা সংখ্যায় বিরাট কিছু নয়। যদিও গোটা বিশ্বের সামনে তারা জাতি হিসাবে বাংলাদেশের মান-সম্মান ধূলিসাৎ করছেন। তাদের কার্যকলাপের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালিবান শাসনের কোনও ফারাক থাকছে না। খবর পাচ্ছি, ছাত্র সমন্বয়দের অনুমতি ছাড়া পুলিশ-প্রশাসন কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। যিনি যে মন্ত্রকের উপদেষ্টাই হোন না কেন, ছাত্র উপদেষ্টাদের সাক্ষী না রেখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন না। বাংলাদেশ প্রশাসনে এই ‘সংস্কার’টি এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান।
সে দেশের এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তর-পূর্ব প্রান্তে থাবা বসিয়েছে ভয়ানক বন্যা। মেঘভাঙা অবিরাম বৃষ্টিতে ভেসেছে সিলেট, নোয়াখালি, ফেনি, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। আকাশ, মেঘে কোনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। একই মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভেসেছে ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয়। দুই দেশেই বন্যায় বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। অনেকের দেহ উদ্ধার হয়নি। ঘরছাড়া কোটির বেশি মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর লেগে যাবে। বাংলাদেশের ওই প্রান্তে বন্যা নতুন বিপদ না হলেও এবার ভয়াবহতা অনেক বেশি। বহু জায়গায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
লক্ষণীয় হল, এমন পরিস্থিতির মধ্যেও চেনা ভারত বিরোধিতা থেমে থাকেনি। ‘ইন্ডিয়ার পানিতে বাংলাদেশ ভাইসা গেল’, ‘ড্যামের পানি ছাইরা ইন্ডিয়া বাংলাদেশি গো ডুবায়ে মারতে চায়’, ‘দেশের বিরুদ্ধে বদলা লইতে দিল্লিতে বইসা হাসিনা ইন্ডিয়ার পানি ছাড়ার ষড়যন্ত্র করসে,’ জাতীয় প্রচারে ছেয়ে গেছে সে দেশের মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া।
দ্বিতীয় আর একটি বিষয় হল শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের মিডিয়া এবং সমাজমাধ্যমের পণ্ডিতদের একাংশের বক্তব্য, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত মহা বিপাকে পড়েছে। আর এক দল উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ভারত ফেরাতে বাধ্য, নাকি বাধ্য নয়। কারও জিজ্ঞাস্য, ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট বাতিলের পর ভারতে হাসিনার স্টেটাস কী?
অবশ্য বন্যা নিয়ে সুর বদলে বাংলাদেশের কিছু কিছু মিডিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে, ইন্ডিয়া তথা ভারতের ষড়যন্ত্র নিছকই অপপ্রচার। আসলে দেশে শাসন-প্রশাসন বলে কিছু নেই। দায়বদ্ধতা উধাও। তাই সে দেশের আবহাওয়া দফতর যেমন প্রবল বৃষ্টিপাতের কথা আগাম স্থানীয় প্রশাসনকে জানায়নি, সেচ দফতরও বলেনি কীভাবে নদীর জলস্তর হু হু করে বাড়ছে। সেই সত্য আড়াল করে একদা বিএনপি জমানার মতো বাংলাদেশের সদ্য ক্ষমতাসীন শাসকেরাও দেশবাসীর রোষ থেকে পিঠের চামরা বাঁচাতে ভারত বিরোধী জিগির তোলার চেষ্টা করে। যদিও তাঁদের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয় শেখ হাসিনা। কোনও সন্দেহ নেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা শেখ মুজিবুরের দুই কন্যাকে ফের আশ্রয় দিয়ে ভারত সরকার একটি ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছে। ১৯৭৫-এ শেখ মুজিবুরকে সপরিবারে হত্যার পর জার্মানিতে থাকা হাসিনা ও তাঁর বোন রেহানাকে দিল্লিতে এনে নিজের মেয়ের মতো দেখভাল করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সাত বছর দুই বোন দিল্লিতে পরিচয় গোপন করে ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের পরিচয় ফাঁস করেনি ভারত সরকার।
এবার সেই দুই বোনকে চরম বিপদের মুখে রক্ষা করেছেন নরেন্দ্র মোদী। আমি যদিও মনে করি, হাসিনার দেশ ছাড়া ঠিক হয়নি। তিনি পদত্যাগ করার পর সেনার আশ্রয়ে গিয়ে আইনের মুখোমুখি হয়ে জেলে চলে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতি অন্য খাতে বইত। নিমেষে তাঁর দল শেষ হয়ে যেত না।
সে যাইহোক, হাসিনা, রেহানাদের বিষয়ে মোদী সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, মুজিব কন্যা এবং আওয়ামী লিগকে নিয়ে ভারতের প্রথমসারির কোনও দলেরই সরকারের অবস্থানের সঙ্গে ফারাক নেই। ফলে হাসিনা-বাংলাদেশ-আওয়ামী লিগ প্রসঙ্গে ইতিহাস নরেন্দ্র মোদী এবং ভারতের সমকালীন সব দলের অবদানের কথাই মনে রাখবে।
তারপরও বলব, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত বিরোধিতার প্রধান কারিগর যেমন বিএনপি-সহ আওয়ামী লিগ বিরোধী কিছু দল এবং জামায়তে ইসলামী, ইসলামিক ছাত্র শিবির, হেফাজতে ইসলামের মতো কিছু উগ্র মৌলবাদী সংগঠন, তেমনই এই সব দল ও সংগঠনের বাইরে থাকা বহু মানুষের মধ্যেও ইন্ডিয়ার ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ আছে। সেই তালিকায় রাজনৈতির ধান্দাবাজির বাইরে থাকা অধ্যাপক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকেরা আছেন। নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ কৃতিত্ব হল তাঁর ও শেখ হাসিনার সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় উঠেছিল যার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এখন নয়াদিল্লির কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
আমার মনে হয়, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নয়াদিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করছে, যা এখনও শুধরে নেওয়ার অবকাশ আছে। হাসিনার সময়ে বারে বারেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই সমালোচনা শোনা গিয়েছে যে মোদী সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে মুজিব কন্যা এবং আওয়ামী লিগের বাইরে ভাবে না। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারত সরকারের দায় নেই। এই সমালোচনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ভিত্তিহীন বলে মনে করি না। আমার মতে, দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তখনই কালজয়ী হয় যখন শাসক বদলালেও সম্পর্কে তার ছাপ পড়ে না।
সেই শেখ হাসিনা যখন গণ অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তখন ভারত বিরোধী সাধারণ বাংলাদেশিদের গেলানো আরও সহজ। চিন ও পাকিস্তান এটাই চায়।
ভারত বিরোধিতার এই স্রোতকে কিছুটা হলেও ভিন্ন খাতে বইয়ে দেওয়া যেত বাংলাদেশের বন্যায় ভারত ত্রাণ-সামগ্রীর ভাণ্ডার নিয়ে সে দেশের সাধারণ নাগরিকের পাশে দাঁড়ালে। আমাদের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকে আমরা উদ্বারে সাহায্য করার জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দিতে পারতাম, যেমনটি আমরা তুর্কি ও সিরিয়ার ভূমিকম্পের সময় করেছি। আমার মনে আছে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় ভারতের মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রণব মুখোপাধ্যায় নিজে ত্রাণবাহী ভারতীয় বিমান নিয়ে ঢাকায় অবতরণ করেছিলেন।
ভারতের বৈদেশিক নীতি হল যে দেশে যে দল বা গোষ্ঠীই ক্ষমতায় থাকুক, নয়াদিল্লি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলবে। বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদের এখনও চেনা বাকি। আগামী দিনে কারা আসবে তা আমরা ঠিক করব না। তাছাড়া ক্ষমতায় যারাই আসুক, প্রতিবেশী বদলানোর সুযোগ কোনও দেশেরই নেই। আমরা বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে পুঞ্জিুভূত অযৌক্তিক ভারত বিরোধিতা কিছুটা হলেও দূর করতে পারতাম সে দেশের বন্যা দূর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে। নয়া দিল্লির কর্তারা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।