শনিবার পাকিস্তানের নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ চারদিনের সফরে বাংলাদেশ যাচ্ছেন। তিনিও প্রধান উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সেনার তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর মহড়া ও প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি।

শেষ আপডেট: 3 November 2025 14:06
সোমবার থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে শুরু হচ্ছে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সেনার অফিসার পর্যায়ের আলোচনা। চারদিন দিন ধরে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদমর্যাদার অফিসারেরা বৈঠকে অংশ নেবেন। এই প্রথম দু’দেশের মধ্যে ‘আর্মি টু আর্মি স্টাফ টকস’ বলে পরিচিত আলোচনার এই মঞ্চ উন্মুক্ত হচ্ছে। এই সুবাদে দুই দেশই নতুন একটি দেশের সঙ্গে ‘আর্মি টু আর্মি স্টাফ টকস’ পর্যায়ের সম্পর্ক তৈরি করতে চলেছে।
এই আলোচনায় বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেজর জেনারেল মহম্মদ মাসাদুর রহমান। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন দু’জন মেজর ও একজন লেফ্ট্যান্যান্ট কর্নেল। বাংলাদেশে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের অফিসের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ সোমবার এক নির্দেশিকায় জানিয়েছে, চার অফিসারের চার দিনের সফরে যাতায়াত বাদে বাকি খরচ বহন করছে পাকিস্তান সেনা বাহিনী।
গত ২৪ অক্টোবর থেকে পাঁচদিন বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল শাহির শামশাদ মির্জা। পদমর্যাদায় তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের থেকে ঊর্ধ্বতন অফিসার। বাংলাদেশ সফরে তিনি প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস, সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং সেনা প্রধান ওয়াকার উজ জামান, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ এবং নৌ বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মহম্মদ নাজমূল হাসান-সহ তিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে গিয়েছেন। সফর করেছেন সিলেট-সহ বাংলাদেশ সেনার একাধিক ক্যান্টনমেন্টে। সিলেটে রয়েছে বাংলাদেশ সেনার প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, রাওয়ালপিন্ডি থেকে বাংলাদেশ সেনার অফিসারেরা ঢাকা ফেরার পরদিন অর্থাৎ ৮ নভেম্বর, শনিবার পাকিস্তানের নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ চারদিনের সফরে বাংলাদেশ যাচ্ছেন। তিনিও প্রধান উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সেনার তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর মহড়া ও প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি।

কূটনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ বিমানের গতিতে এগচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সেনার সম্পর্ক। গত বছর ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দূত অবনতি ঘটে। অন্যদিকে, নতুন করে সম্পর্ক গড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের উপপ্রধান মন্ত্রী তথা বিদেশ মন্ত্রী ঢাকা সফর করে গিয়েছেন। আলাদা করে ঢাকা সফর করেন পাকিস্তানের বিদেশ সচিবও। প্রায় এক যুগ পর পাকিস্তানের বিদেশ সচিব বাংলাদেশ সফরে যান। বিদেশমন্ত্রীর সফরও তাই।
পাশাপাশি সামরিক সম্পর্কও দ্রুত এগচ্ছে। দুই দেশের সেনার যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর লেফ্ট্যান্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান সেনার সদর ক্যান্টনমেন্ট সফর করে আসে। বাংলাদেশে আলাদা করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক নেই। প্রতিরক্ষার বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়েছে। বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা সরকারের তরফে সেনার বিষয়ে শেষ কথা বলে থাকেন। লেফ্ট্যান্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান প্রধান উপদেষ্টার অফিসে প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার। তিনি প্রধান উপদেষ্টার অধীনে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এমন একজন অফিসারকে পাক সেনার সদরে সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ আগ্রহ হিসাবেই দেখছে কূটনৈতিক ও সামরিক শিবির। হাসান রাওয়ালপিন্ডি সফর শেষে দেশে ফেরার অল্পদিনের ব্যবধানে পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে।
ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সেনার উদীয়মান সম্পর্কের পিছনে ইসলামাবাদ ও বেজিংয়ের ভারত অঙ্ক কাজ করছে। অপারেশন সিঁদুর-এর যুদ্ধ বিরতির পর পরই পাক সেনা মুখপাত্র মন্তব্য করেন, পরবর্তী যুদ্ধে তারা হিন্দুস্থানকে পূর্ব প্রান্ত দিয়েও আক্রমণ করবেন। ওই সেনাকর্তার কথায় স্পষ্ট ভারতের বিরুদ্ধে পরবর্তী যুদ্ধে তারা বাংলাদেশ থেকে আক্রমণ শানাতে আগ্রহী। দুই দেশের সেনার সম্পর্ক সেই অঙ্ক মেনে এগচ্ছে বলে মনে করছে সামরিক বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সম্প্রতি চিনের কাছ থেকে বেশ কিছু যুদ্ধ বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই একই মডেলের বিমান অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে পাকিস্তান। মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশ চিনা বিমান কেনার পর তাদের পাইলটদের প্রশিক্ষণে সহায়তা করবে পাক বিমান বাহিনী।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সেনার এই মিতালির দিতে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে ভারতের। সম্প্রতি ভারতীয় সেনা গোয়েন্দাদের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে বলে খবর। যদিও সরকারিভাবে দুই দেশের সেনা বাহিনীর তরফে এই সফর নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ভারতীয় সেনা গোয়েন্দারা বাংলাদেশের লালমনিরহাট এবং ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যাক্ত সেনা বিমান ঘাঁটি পরিদর্শন করেন বলে খবর পাওয়া যায়। বাংলাদেশ চিনের সহায়তায় ওই বিমানঘাঁটিগুলি ফের সচল করতে উদ্যোগী হয়েছে। এর পিছনেও ইসলামাবাদের ইন্ধন রয়েছে বলে খবর। নয়াদিল্লির প্রত্যাশা বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রেখে পদক্ষেপ করবে। লক্ষণীয়, ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সফরের পর পরই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও বিমান ঘাঁটি পরিদর্শনে যান।