চিনের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক বাংলাদেশ। সেই শিল্পের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা কেমন?

ছবি - সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 1 August 2025 15:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পোশাক শিল্প এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং বৈশ্বিকভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
সস্তা শ্রম ও দ্রুত উৎপাদনের ক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ চিনের পরেই আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘তৈরি পোশাক’ রপ্তানিকারক দেশ। তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়ানো - এই সব চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতের যাত্রাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা ষাটের দশকে শুরু হলেও রফতানিমুখী খাত হিসেবে এটি বিকশিত হয় সত্তরের দশকের শেষ দিকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকেই রফতানির পরিমাণ ছিল ৪২.৬১৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৮১.৮১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত রফতানি আয় ৪,৪৯৪ কোটি ডলার, যার ৮১%-এর বেশি এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৮৪% বেশি।
বাংলাদেশের জিডিপিতে এই খাতের প্রায় ১১% অবদান রয়েছে এবং প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক সরাসরি এই খাতে কাজ করেন, যাঁদের প্রায় ৬০% মহিলা। পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ কোটি মানুষ এই খাতের উপর নির্ভরশীল।
শ্রমিকদের মজুরি ও মানবিক দিক
সস্তা শ্রম এই খাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শক্তি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে ৫% নিয়মিত ও ৪% অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট।
মূল চ্যালেঞ্জসমূহ ও সমাধানের দিক
১) এলডিসি উত্তরণ ও বাণিজ্য সুবিধা
২০২৬ সালে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে জিএসপি সুবিধা কমে যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের রফতানিকে ধাক্কা দিতে পারে।
২) জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়
জ্বালানি সংকট, ডলার ঘাটতি এবং ঋণপত্র জটিলতা উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলেছে - গত পাঁচ বছরে খরচ বেড়েছে প্রায় ৫০%।
৩) প্রযুক্তি ও অটোমেশন
অটোমেশনের ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও প্রায় ৩০.৫৮% শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন, বিশেষত অদক্ষ নারী ও বয়স্ক শ্রমিকরা।
৪) পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প পরিবেশের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এটি বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী খাত। নদীতে বর্জ্য ফেলা এবং ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা পরিবেশ সংকট তৈরি করছে।
তবে ইতিবাচক দিক, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ‘সবুজ পোশাক’ কারখানার অধিকারী।
৫) বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ
নতুন বাজার যেমন পশ্চিম এশিয়া, জাপান, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াতে প্রবেশ এবং অ্যাকটিভওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, হোম টেক্সটাইলের মতো পণ্যে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ রয়েছে।
স্টেকহোল্ডারদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট না থাকলে বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হতে পারত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিডা ও কলকারখানা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বহুমুখীকরণে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে। তবে এই খাতের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, বাজার বৈচিত্র্য এবং শ্রমিক কল্যাণে সুস্পষ্ট কৌশল প্রণয়ন জরুরি।