ঢাকার সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলিতে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানিতে বাড়তি অর্থ গুণতে হচ্ছে। এর আগে ভারত দেশের বন্দর দিয়ে তৃতীয় কোনও দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি
শেষ আপডেট: 21 May 2025 14:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিবাদ নয়, দিল্লির বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা (Trade restriction issued by New Delhi on Bangladesh) নিয়ে আলোচনা চায় বাংলাদেশ। বিদেশ মন্ত্রকের হাত দিয়ে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রকে (Ministry of commerce, govt of India) চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রক।
তারা বিদেশ মন্ত্রককে অনুরোধ করেছে যতদ্রুত সম্ভব দিল্লিকে (New Delhi) বৈঠকে রাজি করাতে। আলোচনার টেবিলে সমস্যা মিটিয়ে নিতে আগ্রহী মহম্মদ ইউনুসের (Md Yunus) সরকার। বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য সচিব মহবুবুর রহমান (Mabubur Rahaman, Commerce Secretary, govt of Bangladesh) ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ভারতের সিদ্ধান্তের জবাবে আমরা কোনও ধরনের প্রত্যাঘাতের পথে যেতে চাই না। (We will not go for any retaliation) আমরা চাই দ্রুত সমস্যার সমাধান।’ তিনি স্বীকার করেছেন, ভারতের সিদ্ধান্তে গুরুতর আর্থিক ও বাণিজ্যিক সংকটের মুখে পড়ে গিয়েছে বাংলাদেশ।
কথায় কথায় দিল্লি বিরোধী সুর চড়াতে ব্যস্ত ঢাকার কর্তাদের সুর বদল নিয়ে দেশেও চর্চা শুরু হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার মুণ্ডপাত করছেন বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্যমহল। তাঁকেই ‘ভিলেন’ মানছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প মহল। তাঁদের অনেকেই একান্তে মানছেন, পড়শি দেশ ভারতের সঙ্গে বিবাদ করে নিজের ও দেশের মানুষকে বিপাকে ফেলে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
বাণিজ্য সচিব দিল্লির সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহের কথা জানান বাংলাদেশ সচিবালয়ে মঙ্গলবার বেশি রাতে অনুষ্ঠিত আন্ত-মন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকের পর। সেই বৈঠকে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এবং বণিক সভাগুলিকে ডাকা হয়েছিল। ছিলেন পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রকের সচিবেরাও। সেখানে বণিক সংস্থার কর্তারা সরকারের উপর চাপ তৈরি করেন। তাঁরা বলেন, আলোচনার মাধ্যমে ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করানো গেলে তাদের ব্যবসা লাটে উঠবে। তার জেরে সরকারও আর্থিক দুর্দশার মুখে পড়বে। রপ্তানি শুল্ক বাবদ বিপুল ক্ষতি হবে।
বিস্কুট, পানীয়-সহ নানা ধরনের খাদ্য প্রস্তুতকারী বাংলাদেশের সংস্থা প্রাণ-এর বিপুল ব্যবসা ছিল পশ্চিমবঙ্গ-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। ওই সংস্থার বক্তব্য, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা না তুললে তাদের তৈরি বাজারে অন্য কোম্পানি ঢুকে যাবে। তারা চান সরকার দ্রুত দিল্লির সঙ্গে কথা বলে সমঝোতা বের করুক।
সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস ভারতের উত্তপ-পূর্বের রাজ্যগুলিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে নয়া দিল্লির রোষের কারণ হয়েছেন। ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, সেই এলাকার সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ নেই উল্লেখ করেন। ওই এলাকাকে বারে বারে লান্ড লকড বলেও উল্লেখ করেছেন ইউনুস। তিনি বোঝাতে চান, ভারতের ওই অংশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগর ব্যবহারই একমাত্র উপায়। ওই এলাকায় বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের অভিভাবক বলেও মন্তব্য করেছেন ইউনুস।
এখন ভারতের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার জেরে দেখা যাচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বের উপর অর্থনৈতিকভাবে কতটা নির্ভরশীল বাংলাদেশ। সে দেশের তৈরি খাবারের বিপুল বাজার ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি। সেই বাজার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে গত শনিবার থেকে। তারফলে হাত কামড়াচ্ছে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলি। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে ভারতের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে গিয়ে এখন দেশে ব্যবসায়ী ও বণিক সমাজের রোষের মুখে পড়েছেন মহম্মদ ইউনুস।
গত শনিবার ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (Director general of foreign trade, govt of India) নির্দেশিকা জারি করে বলেছে, কোনও স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কোনো ধরনের তৈরি পোশাক পণ্য ভারতে ঢুকতে পারবে না। এছাড়া, ফল, ফল থেকে তৈরি পানীয়, কার্বোনেটেড ড্রিংকস; বেকারি, চিপস, স্ল্যাকস এবং কনফেকশনারিতে তৈরি প্রক্রিয়াজাত খাবার; তুলা ও সুতার ঝুট; পিভিসিসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য এবং কাঠের তৈরি আসবাবপত্র আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গের চেংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী দিয়ে ভারতে আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত রবিবার থেকে এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হওয়ায় সীমান্তে বহু মালবাহী ট্রাক আটকে আছে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তের পিছনে আছে গত মাসে বাংলাদেশ সরকারের একটি সিদ্ধান্ত। ভারত থেকে সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ঢাকার পদক্ষেপ ঘিরে আগেই জল্পনা শুরু হয়েছিল। এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার জানায়, সে দেশের গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভারত যে সুতা রপ্তানি করে তা স্থল বন্দর দিয়ে পাঠানো যাবে না। বিমান অথবা সমুদ্র পথে পাঠাতে হবে।
ঢাকার ওই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলিতে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানিতে বাড়তি অর্থ গুণতে হচ্ছে। এর আগে ভারত দেশের বন্দর দিয়ে তৃতীয় কোনও দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
ঘটনাচক্রে প্রতিটি পদক্ষেপেই বাংলাদেশের আর্থির ক্ষতি বেশি হয়েছে। তারপরও স্রেফ ঠাণ্ডা লড়াইয়ের কারণে ঢাকা সুতো আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। ভারতের পাল্টা পদক্ষেপে বাংলাদেশের অন্তত একশোটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিপাকে পড়ে গিয়েছে।
স্থল বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ কম। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দুই দেশের বণিকেরাই বিপাকে পড়েছেন। তবে বেশি সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই বেশি ছিল। ভারতের নিষেধাজ্ঞায় এই দুই সেক্টরের শিল্পগুলি সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করেছে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য। নয়াদিল্লির নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলির রপ্তানি কমতে বাধ্য। ফলে রপ্তানি শুল্ক বাবদ সরকারের আয়ও কমবে।