পাক-রজনীর 'মক্ষীরানি' ছিলেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের দুঁদে অফিসার মাধুরী।

মাধুরী গুপ্তা ও জ্যোতি মালহোত্রা।
শেষ আপডেট: 20 May 2025 18:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: The Spy Who Loved Me। ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জেমস বন্ড সিরিজের দশম ও বন্ড চরিত্রে রজার মুর অভিনীত তৃতীয় ছবি। যে ছবিতে বন্ড গার্ল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত মডেল বারবারা বাখ। যেখানে ব্রিটিশ চরের প্রেমে পড়ে যান সাবেক সোভিয়েতের কেজিবি এজেন্ট বারবারা। তেমনই প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক মাধুরী গুপ্তা বিদেশমন্ত্রকের চাকরিসূত্রে পাকিস্তানে গিয়ে এক পাকিস্তানির প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন।
না, না বন্ডের ছবির মতো অ্যাকশনের রোমাঞ্চ ও যৌন সুড়সুড়ি না থাকলেও এই সত্যি গল্পে রয়েছে 'মধুফাঁদের' কাহিনি। যে পাক-রজনীর 'মক্ষীরানি' ছিলেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের দুঁদে অফিসার মাধুরী। পাক চর সন্দেহে ধৃত হরিয়ানার হিসারের বাসিন্দা জ্যোতি মালহোত্রা ওরফে জ্যোতিরানি ওরফে ইউটিউবে বিখ্যাত 'ট্রাভেল উইথ জো'র নানান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সামনে উঠে এসেছে মাধুরীর নামও।
মাধুরীর প্রেমকাহানি বলিউডি সিনেমাকেও দশ গোল দিতে পারে। ১৫ বছর আগের এই চরবৃত্তির কাহিনি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সাধারণ ইউটিউবার ছিলেন মাধুরী। এক্কেবারে ফরেন সার্ভিসেস পাশ করা বিদেশি দূতাবাসে কাজ করা কর্মী। কোনও ইনফ্লুয়েন্সার স্ক্যান্ডালের থেকেও তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার ছুরি দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অনেক গভীরে দাগ কেটেছিল। কারণ বাইরে থেকে নয়, ইসলামাবাদস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের ভিতরে রীতিমতো নিশ্চিদ্র প্রহরা ও নজরবন্দির মধ্যে থেকেও তিনি চরের কাজ করেছিলেন প্রেমে পড়ে।
ভারতীয় হাইকমিশনে তিনি প্রেস অ্যান্ড ইনফর্মেশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসাবে কর্মরত ছিলেন সেই সময়। দুরস্ত উর্দু বলতে পারা ও সুফি কাব্যসাহিত্যে পারদর্শী মাধুরী এক পাকিস্তানি পুরুষের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে দেশের তথ্য পাচার করেন পাকিস্তানি চর সংস্থার কাছে। কেউ কেউ বলেন, পাকিস্তান জেনেবুঝেই মাধুরী গুপ্তাকে হানিট্র্যাপ করেছিল।
মুম্বই হামলার ঠিক ১৮ মাস পর, ২০১০ সাল। সেই সময় এখনকার মতোই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আগুনের রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই সময় মাধুরী গুপ্তার চরবৃত্তি সম্পর্কে গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রোম খাড়া করে দেওয়া তথ্য আসে। সঙ্গে সঙ্গে ইসলামাবাদ থেকে ডাক পাঠিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় এবং দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ সরকারি তথ্য ফাঁস আইনে তাঁকে গ্রেফতার করে।
জ্যোতি মালহোত্রার মতো নয়, একসময়ের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী মাধুরী ফরেন সার্ভিসেস পাশের পর ইরাক, লাইবেরিয়া, মালয়েশিয়া ও ক্রোয়েশিয়ায় কাজ করেছিলেন। ২০০৭ সালে তাঁর উর্দু জ্ঞানের জন্য ইসলামাবাদে বদলি করা হয়। যাতে তিনি সেখানে রোজ পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমে কী প্রচার চলছে তার খোঁজ রাখতে পারেন।
আচমকাই একদিন এক পাকিস্তানি সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে জামশেদ নামে এক যুবকের পরিচয় করিয়ে দেন। যাঁর ডাকনাম ছিল জিম। সেখানে জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহারের লেখা একটি বই নিয়ে খোশগল্প থেকে শুরু হয় মাধুরীর পাকিস্তানি ফাঁদে পা দেওয়া। জামশেদ তাঁকে ওই বইটি পড়তে দেওয়া থেকেই ৫২ বছরের মাধুরী প্রেমে পড়ে যান সুদর্শন ৩০ বছরের যুবকের। মাধুরী তখনও জানতেন না যে জিম আসলে আইএসআইয়ের পাঠানো চর।
মাধুরী তাঁর প্রেমে এতটাই মশগুল হয়ে পড়েন যে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জামশেদকে নিকাহ করার জন্যও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। জামশেদ ও আইএসআইয়ের আরও এক হ্যান্ডলার মুদাস্সর রাজা রানা ক্রমাগত মাধুরীকে দেশবিরোধী কাজে প্ররোচিত করে যাচ্ছিলেন। যার ফলবশত মাধুরী তাঁদের হাতে সেনা, র-এর কাজকারবার, ভারত-মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এমনকী ২৬/১১ মুম্বই হানার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ নথিও দিয়ে দিতে থাকেন।
ভারতীয় গোয়েন্দারা যখন তাঁর কাজকারবার প্রায় ধরে ফেলেছেন, তখন ২০০৯ সালের শেষের দিকে দিল্লিতে সার্ক সম্মেলনের আয়োজনের কাজে ডেকে পাঠানো হয়। ২২ এপ্রিল সকালে সাউথ ব্লকে এক বৈঠকে যোগ দিতে এসেছিলেন মাধুরী। অফিসাররা যখন তাঁকে গ্রেফতার করেন, তখনও তিনি হেসে বলেছিলেন, এতদিন কোথায় ছিলেন? তদন্তেও তিনি খুবই সহজেই সহযোগিতা করেন। যা যা করেছেন তা সব খোলসা করে দেন। এরপর টানা আট বছর বিচার চলার পর ২০১৮ সালে মাধুরী গুপ্তাকে অপরাধমূলক চক্রান্ত ও চরবৃত্তির জন্য দোষী সাব্যস্ত করে আদালত।
দিল্লি হাইকোর্টে পরবর্তী মামলা গেলে সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলতে থাকে। শেষে একদিন ২০২১ সালে অক্টোবরে রাজস্থানের ভিওয়াড়িতে অবিবাহিত একলা থাকা মাধুরী গুপ্তার অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়। মাধুরীর আমেরিকা প্রবাসী একমাত্র ভাই একথা জানিয়েছিলেন আইনজীবী জোগিন্দর দাহিয়াকে। তাঁর মৃত্যুতে চরবৃত্তির মামলাতেও দাঁড়ি টানে আদালত।