বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশ, আর গণভোটে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’। হাসিনার বয়কটের ডাক আদৌ প্রভাব ফেলল কি না তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।

ঢাকায় নির্বাচন কমিশনের অফিসের বাইরে ভোটের ফলাফলের চোখ বোলাচ্ছেন সাধারণ মানুষ
শেষ আপডেট: 13 February 2026 21:48
বাংলাদেশ বৃহস্পতিবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে বাংলাদেশে ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত বারটি নির্বাচনের মধ্যে সবার এবারের তুলনায় কম ভোট পড়েছিল। বাকি ছয়বার ভোটের হাট ছিল অনেকটাই বেশি। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত শেষবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪১.৮%। সেবার বিএনপি সহ প্রথমসারির দলগুলি নির্বাচন বয়কট করেছিল। সেবারের নির্বাচনকে অনেকেই রসিকতা করে বলে থাকেন 'আমি' 'ডামি'। আওয়ামী লিগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল দলেরই স্বতন্ত্র বা নির্দল প্রার্থীরা। ফলে প্রদত্ত ৪১.৮ শতাংশ ভোটের প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লিগের বলা যায়।

এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লিগ। তারা ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী গতবারের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি ভোট পড়েছে এবার। ফলে আওয়ামী লিগের বয়কটের ডাকে কতটা সাড়া মিলেছে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও আওয়ামী লিগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার ভোট শেষে দাবি করেন বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন বয়কট প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও বৃহস্পতিবারের ভোটে ঢাকা সহ গোটা বাংলাদেশেই নির্বিঘ্নে ভোট রয়েছে। তাতেই গতবারের তুলনায় বাড়তি ভোট পড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
আগের বারটি নির্বাচনের মধ্যে ২০০৮ এ বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ৮৭.১৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এবার ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লিগ। পাঁচ বছর পর আওয়ামী লিগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার কমে অর্ধেকের নিচে নেমে গিয়েছিল। এবার ভোট পড়েছিল ৪০.০৪ শতাংশ। সেবারও বিএনপি সহ একাধিক বিরোধীদল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ২০১৮ তে বিএনপি ভোটে অংশ নেয়। এবার আবার ভোট পড়ে ৮০.২০ শতাংশ। আবার ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল আওয়ামী লিগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক বিরোধী দল। সেই নির্বাচনে ভোট পড়ে ২৬.৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ভোট বয়কট করলে প্রদত্ত ভোটে তার প্রভাব পড়েছে প্রতিবারই। সেদিক থেকে এবার আওয়ামী লিগের ভোট বয়কটের ডাকে তেমন সাড়া পড়েছে বলে পরিসংখ্যান অন্তত বলছে না। আওয়ামী লিগ আমলের শেষ নির্বাচনে তুলনায় এবার প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে। ফলে হাসিনার ভোট বয়কটের ডাকে সাড়া মিলেছে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই বলছেন, বয়কটের ডাক উপেক্ষা করে আওয়ামী লিগের অনেকেই বুথে গিয়েছেন। বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে যেখানে যে দলের জয়ের সম্ভাবনা বেশি ছিল তাদের ভোট দিয়েছেন হাসিনার দলের ভোটারেরা। সেই কারণেই ১৮ শতাংশ বাড়তি ভোট পড়েছে গতবারের তুলনায়।

বৃহস্পতিবার ভোটের সময় ঢাকায় হিন্দুদের মহল্লা হিসেবে পরিচিত শাঁখারী বাজারে গিয়ে দেখা যায় দলে দলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন। হিন্দুদের একাংশ সেখানে প্রকাশ্যেই জানান তারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। তারা বলেন জামায়াতে ইসলামীকে আটকাতেই তারা সম্প্রদায়গতভাবে বিএনপিকে জেতানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার কথা। জুলাই সনদ এর আধারে তৈরি চারটি প্রশ্নকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। ভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হলে বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফের বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সংবিধানের ঘোষণাপত্র থেকে বাদ যেতে পারে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ও 'সমাজতন্ত্র' শব্দ দুটি। সংখ্যালঘুদের আশঙ্কা ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাদ গেলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ পুরোপুরি ইসলামিক রাষ্ট্রের পরিণত হওয়ার দিকে পা বাড়াতে পারে, আশঙ্কা সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতাদের।

জুলাই সনদে বিএনপি একাধিক ইস্যুতে আপত্তিসহ সম্মতি দেয়। গণভোটেও 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের অনুকূলে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়। যদিও বৃহস্পতিবার ভোট চলাকালীন বহু জায়গায় দেখা গিয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা দলের ভোটারদের একান্তে বলছেন গণভোটে 'না'-তে টিক দিতে। তবে দলের কত অংশ 'না' তে টিক দিয়েছেন তা নিয়ে সংশয় আছে। যদিও বিএনপি নেতৃত্বের একাংশ একান্তে বলছেন জুলাই সনদ এর সবকিছু বাস্তবসম্মত বলে তারা মনে করছেন না। যেমন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তথা ঢাকা ৩ আসন থেকে নির্বাচিত গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, জুলাই সনদ এর সব কিছু চোখ কান বুজে মেনে নেওয়ার অবকাশ নেই। তিনি বলেন এই ব্যাপারে দল আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে এগোবে। যদিও জুলাই সনদে লেখা রয়েছে নতুন সংসদ গঠিত হবার ১৮০ দিনের মধ্যে সনদ তথা সংস্কারে সুপারিশগুলি বাস্তবায়ন করতে হবে। কোন কারণে নতুন সংসদ সেই কাজ শেষ করতে না পারলে ১৮০ দিন পর ধরে নেওয়া হবে সেগুলি বাস্তবায়িত হয়েছে। বিএনপি'র এক প্রথম সারির নেতা একান্তে বলেন এই ১৮০ দিন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল সনদে তা স্পষ্ট নয়। ফলে এ নিয়েও নব গঠিত সংসদের আলাপ-আলোচনার সুযোগ রয়েছে।