কলকাতায় অনুষ্ঠিত পেডিকন ২০২৬ (PEDICON 26) সম্মেলনে শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, অধিকার, পলিসি ও নয়া রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা। উপস্থিত দেশ–বিদেশের চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ।
পেডিকন ২০২৬।
শেষ আপডেট: 18 January 2026 18:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৩ বছর পর কলকাতা আয়োজন করল দেশের সবচেয়ে বৃহৎ পেডিয়াট্রিক মেডিক্যাল কনফারেন্স— পেডিকন ২০২৬ (Pedicon 26)। ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (IAP) এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের সহযোগিতায় ১৬–২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলল পাঁচ দিনব্যাপী এই সম্মেলন। ভেন্যু নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টার (Biswabangla Convention Centre)।
দেশের ১,৫০০–র বেশি জাতীয় ফ্যাকাল্টি এবং ৫০–র বেশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ উপস্থিত, পাশাপাশি কয়েক হাজার শিশু চিকিৎসক, গবেষক ও পলিসি–পরামর্শদাতা।
এই বছরের থিম: “Child Rights and Survival – Steps to a New World”—শিশুস্বাস্থ্যের আলোচনাকে রোগ–চিকিৎসার গণ্ডি থেকে বের করে সামাজিক, মানসিক এবং নীতিগত স্তরে নিয়ে যায়।
উদ্বোধনী ভাষণে IAP-এর জাতীয় সভাপতি ডা. নীলম মোহন বলেন, “শিশুর চিকিৎসা এক অংশ। তার পরে আছে ভালভাবে বেঁচে থাকা, সেটাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ।” তিনি বলেন, ভারতে চিকিৎসার পরে স্ট্যান্ডার্ড ফলো–আপ, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং রেজিলিয়েন্স নিয়ে কাজ এখনও অসম্পূর্ণ।
সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে প্রায় ১০% শিশু স্থূলতা এবং ৩৩% শিশু অপুষ্টির সমস্যায় ভোগে। দরিদ্রতা অপুষ্টির মূল কারণ হিসেবে ধরা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যশিক্ষার অভাব ও অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল সমান দায়ী। স্ক্রিন–টাইম বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং শারীরিক অনিয়ম শিশুদের জীবনচক্রে বড় বিপর্যয় তৈরি করছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয়, প্রতি ৭ জনে ১ জন শিশু মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা পায় না। কনফারেন্সে স্লিপ ডিসঅর্ডার, অ্যাংজাইটি, আগ্রাসন, ADHD এবং ডিপ্রেশনের মতো সমস্যা বাড়ার ট্রেন্ড নিয়েও আলোচনা হয়।
এই বছর সম্মেলনের বড় অংশজুড়ে ছিল হাতে–কলমে চিকিৎসা প্রশিক্ষণ। ছিল ২৬টি ওয়ার্কশপ এবং ১৪টি Training of Trainers (ToT) প্রোগ্রাম। এতে শিশু চিকিৎসকদের শেখানো হয় জরুরি রিসাসিটেশন, নিওনেটাল ভেন্টিলেশন, শিশু–উল্ট্রাসোনোগ্রাফি, পেডিয়াট্রিক লাইফ সাপোর্ট এবং ডেভেলপমেন্টাল স্ক্রিনিংয়ের মতো জটিল দক্ষতা।
আয়োজকদের মতে, “শুধু প্রটোকল মুখস্থ নয়, বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই রোগীর জীবন বাঁচায়।”
এই বছর মঞ্চে জায়গা পেয়েছে WHO এবং UNICEF-এর প্রতিনিধিত্বও। আলোচনায় উঠে আসে শিশু–টিকাকরণ, পুষ্টি, প্রাথমিক বিকাশ এবং শিশুকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার মতো বিষয়। চিকিৎসা–বিজ্ঞান ছাড়িয়ে নীতি–ইকোসিস্টেমও প্যানেলে যুক্ত হওয়ায় সম্মেলনটি হয়ে ওঠে স্বাস্থ্য–নীতি সংলাপের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
পেডিকন ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয় সম্পূর্ণ পেপারলেস বা কাগজবিহীনভাবে। CME সূচি, বক্তা, নোট, অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং আপডেট—সবই চালিত হয় ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে। আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যতের মেডিকেল কনফারেন্স এমনই হওয়া উচিত, টেকনিক্যাল, পরিবেশবান্ধব এবং শেয়ারযোগ্য।
সম্মেলনের শেষ দিনে একটি স্পষ্ট বার্তা উঠে আসে—ভারত শিশুস্বাস্থ্যে একটি পরিবর্তনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের লড়াই ছিল সংক্রমণ, রোগ এবং টিকাকরণ নিয়ে। এখন লড়াই আরও বড়— কীভাবে শিশু কেবল বেঁচে থাকবে নয়, ভালভাবে বাঁচবে। অর্থাৎ survival → thriving ট্রানজিশনের সময় এসে গেছে। পেডিকন ২০২৬ সেই রোডম্যাপকেই নতুন করে আঁকছে।