অভিজ্ঞ এক আমেরিকান কার্ডিওলজিস্ট সম্প্রতি বলেছেন, “সবাই টোটাল কোলেস্টেরল নিয়ে ভাবেন। কিন্তু সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা নয়। লিপিড প্রোফাইলের অন্য মানগুলোও বুঝতে হবে।" LDL, HDL, ApoB, Lp(a), ট্রাইগ্লিসারাইড ও নন-HDL কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন, ঝুঁকি নির্ণয় এবং প্রতিরোধের জন্য

হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমাতে খেয়াল রাখুন
শেষ আপডেট: 17 February 2026 12:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হার্ট ভাল আছে কিনা ভাবতে বসলে, অনেকেই রক্ত পরীক্ষার (Blood Test) রিপোর্টে একটা সংখ্যাতেই আটকে যান। ‘টোটাল কোলেস্টেরল’ (Total Cholesterol)। সেই মাত্রা বেশি দেখলেই আতঙ্ক, কম থাকলে স্বস্তি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, এই একটিমাত্র সংখ্যা দিয়ে ভবিষ্যতের হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack) বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বোঝা যায় না। আসল গল্প লুকিয়ে থাকে কোলেস্টেরলের ভেতরে থাকা আলাদা আলাদা উপাদান ও লিপোপ্রোটিনের মধ্যে।
হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট ও অ্যাডভান্সড হার্ট ফেইলিওর চিকিৎসায় অভিজ্ঞ এক আমেরিকান কার্ডিওলজিস্ট ডা. দিমিত্রি ইয়ারানোভ সম্প্রতি বলেছেন, “সবাই টোটাল কোলেস্টেরল নিয়ে ভাবেন। কিন্তু সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা নয়। লিপিড প্রোফাইলের অন্য মানগুলোও বুঝতে হবে।” তাঁর মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি সূচক আছে যা ভবিষ্যতের হার্টের আসুখের ঝুঁকি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে জানাতে পারে।
টোটাল কোলেস্টেরলের সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাত্রা
এলডিএল কোলেস্টেরল: লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন কোলেস্টেরলকে (LDL) সাধারণভাবে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়। কারণ, এর মাত্রা বাড়লে ধমনির দেওয়ালে প্লাক জমতে শুরু করে। এই প্লাকই একসময় ব্লক তৈরি করে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। চিকিৎসকের কথায়, এলডিএল যত কমবে, কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকিও তত কমবে, এটা প্রমাণিত।
অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি (ApoB): এটি এমন একটি প্রোটিন যা রক্তে থাকা প্লাক তৈরিকারী সব ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের কণার সংখ্যা বোঝায়—যেমন LDL, VLDL, IDL ও Lp(a)। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এটি এলডিএল-এর থেকেও বেশি শক্তিশালী রিস্ক মার্কার। চিকিৎসক স্পষ্টই বলেন, “এলডিএল ও অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি-র মধ্যে তফাত থাকলে ApoB-ই আসল কথা বলবে।” অর্থাৎ এর মাত্রা যত বেশি, ঝুঁকিও তত বেশি।
নন-এইচডিএল কোলেস্টেরল: ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, নন-এইচডিএল কোলেস্টেরল হল রক্তে থাকা সব ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের সম্মিলিত মাত্রা। এই সংখ্যা বেশি হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বেশি থাকে, কারণ এতে LDL, VLDL–সহ ধমনিতে প্লাক জমাতে পারে এমন কণাগুলির মাত্রা ধরা পড়ে।
কার্ডিওলজিস্টদের মতে, যদি ApoB আলাদা করে পরীক্ষা করা না হয়, তা হলে নন-এইচডিএল-এর মাত্রাই হার্টের অসুখের ঝুঁকি বোঝার জন্য কার্যকর বিকল্প হিসেবে ধরা হয়। তাঁর কথায়, ApoB না মাপলেও নন-HDL হতে পারে ব্যবহারিক ব্যাকআপ।
ট্রাইগ্লিসারাইড: ট্রাইগ্লিসারাইড হল রক্তে উপস্থিত সাধারণ ফ্যাট, যা শরীরকে শক্তি জোগাতে কার্যকর। এর স্বাভাবিক মাত্রা আমাদের মেটাবলিজমের জন্য দরকারি। কিন্তু এর মাত্রা বেশি হলে বুঝতে হবে, রক্তে প্লাক তৈরি করতে পারে (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস) এমন ক্ষতিকর লিপোপ্রোটিন কণার সংখ্যাও বাড়তে পারে। এতে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ, ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকলে ApoB পরীক্ষা করানো উচিত। এতে হার্টের ঝুঁকির মাত্রা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। তাঁর কথায়, ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়লে অনেক সময় তা রক্তে থাকা অতিরিক্ত ক্ষতিকর কণার উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়—তাই বেড়ে থাকলে ApoB দেখুন।
Lp(a): আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, লিপোপ্রোটিন(a) বা Lp(a) হল LDL কোলেস্টেরলেরই একটি জেনেটিক্যালি ইনহেরিটেড ফর্ম। এটি নিজে থেকেই হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং অ্যাওর্টিক স্টেনোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
চিকিৎসকের কথায়, প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের অজান্তেই Lp(a) বেশি থাকতে পারে। সমস্যা হল, সাধারণ LDL রিপোর্ট স্বাভাবিক দেখালেও Lp(a) বেশি হলে কার্ডিওভাস্কুলার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। Lp(a) বংশগত—তাই জীবনে অন্তত একবার এই পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ।
এইচডিএল (HDL): এটিকে আমরা ‘ভাল’ কোলেস্টেরল বলেই জানি, কারণ এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরাতে সাহায্য করে। কিন্তু একটি বড় ভুল ধারণা আছে, HDL বেশি মানেই সুরক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, HDL বাড়ালেই হার্টের অসুখ আক্রান্তের ঘটনা কমে—এমন প্রমাণ নেই। বেশি HDL, বেশি LDL-এর ক্ষতিকর প্রভাব মুছে দিতে পারে না। কাজেই ভাল এবং খারাপ কোলেস্টেরলের ভারসাম্য বোঝা জরুরি।
প্রতিরোধে কী করবেন?
তাই ডা. দিমিত্রি ইয়ারানোভের বার্তা খুব পরিষ্কার। ApoB ও LDL কমাতে হবে, আর রক্তে Lp(a) কত, সেই মাত্রা একবার হলেও জেনে নেওয়া দরকার। অর্থাৎ শুধু একটি সংখ্যায় নজর না রেখে, কোলেস্টেরলের সম্পূর্ণ চিত্র জানা জরুরি। তবেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি আন্দাজ করা সহজ হবে এবং প্রয়োজনীয় লাইফস্টাইল বদল বা চিকিৎসা শুরু করা অনেক বেশি নির্ভুল হবে।