ভারতীয় বিজ্ঞানী ইয়েল্লাপ্রগাডা সুব্বারাওয়ের গবেষণাই তৈরি করেছিল আজকের কেমোথেরাপির ভিত্তি। ফলিক অ্যাসিড, অ্যামিনোপ্টেরিন, টেট্রাসাইক্লিন থেকে DEC—তাঁর আবিষ্কার বদলে দিয়েছে আধুনিক চিকিৎসা।

ইয়েল্লাপ্রগাডা সুব্বারাও
শেষ আপডেট: 2 December 2025 15:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৪৭ সাল। গরমের এক নিভৃত দুপুরে, নিউইয়র্কের লেডারলে ল্যাবরেটরির ছোট্ট একটি ঘরের ভিতর বসে ছিলেন এক ভারতীয় বায়োকেমিস্ট। তিনি না ছিলেন কোনও নামী অধ্যাপক, না ছিল না নামে কোনও চেয়ার। বৈজ্ঞানিক সম্মেলনেও তাঁকে খুব একটা দেখা যেত না। তবু তাঁর টেবিল থেকেই উঠে এসেছিল এমন কিছু আবিষ্কার, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় বিপ্লব— কেমোথেরাপির ভিত গড়ে দিয়েছিল। তাঁর নাম— ইয়েল্লাপ্রগাডা সুব্বারাও। তিনি এমন এক বিজ্ঞানী, যাঁর কাজ লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। অথচ যাঁর নাম আজও ইতিহাসের ফুটনোটে চাপা পড়ে রয়েছে।
ভীমবরমের ছেলে, বদলে দিলেন বায়োকেমিস্ট্রি
১৮৯৫ সালে মাদ্রাজের ভীমবরম এলাকায় জন্ম নেওয়া সুব্বারাও এমন এক পরিবারে বড় হন, যেখানে অসুখ-দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। ছোটবেলাতেই ভাইরাল অসুখে দুই ভাইকে হারিয়েছিলেন তিনি। এই ক্ষত তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে সেই কষ্টই তাঁকে টেনে নিয়ে যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে। আয়ুর্বেদ পড়াশোনা দিয়ে শুরু, পরে চলে যান পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে। এরপর আরও উচ্চশিক্ষার সন্ধানে তিনি পাড়ি দেন আমেরিকায়। সেই যাত্রাই বদলে দেয় বিশ্ব-ফার্মাকোলজির ভবিষ্যৎ। তবে দুঃখের বিষয় হল, আমেরিকা তাঁকে বুকে টেনে নেয়নি। একজন ‘কালো চামড়ার ছাত্র’ হিসেবে তিনি প্রথম দিন থেকেই বৈষম্যের মুখে পড়েছিলেন। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল তাঁকে স্থায়ী কোনও পদ দেয়নি। যদিও সেখানে তাঁরই ল্যাবরেটরিতে ঘটছিল যুগান্তকারী আবিষ্কার।
ফলিক অ্যাসিড, বিপ্লবের সূচনা
সুব্বারাও-এর প্রথম দিকের বড় সাফল্য আসে ফলিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। এই নির্দিষ্ট ভিটামিনটিকে আলাদা করে খুঁজে বার করে, তার গঠন ও ভূমিকা বোঝার মাধ্যমে তিনি খুলে দেন বিপাক-প্রক্রিয়ার নতুন দিগন্ত। অ্যানিমিয়া বা পুষ্টিজনিত নানা সমস্যার চিকিৎসায় এই কাজ ছিল যুগান্তকারী। তবে এর সবচেয়ে বড় শক্তি সামনে আসে পরে, যখন পরে জানা যায় যে, দ্রুত বিভাজনশীল কোষে ফলিক অ্যাসিডের কার্যকারিতা বন্ধ করলে, ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি থামানো যায়! এই ধারণার ভিত্তিতেই তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম অ্যান্টিফোলেট ওষুধ।
কেমোথেরাপি— বিজ্ঞানের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
লেডারলে ল্যাবরেটরিতে সুব্বারাওয়ের নেতৃত্বে তৈরি হয় অ্যামিনোপ্টেরিন, প্রথম সফল ক্লিনিক্যাল অ্যান্টিফোলেট। এই ওষুধ পৌঁছয় বোস্টনে, যেখানে শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসক সিডনি ফার্বার এটি ব্যবহার করেন অ্যাকিউট লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের উপর। ১৯৪৭ সালে প্রথমবার তাঁর হাতে শিশুদের রোগমুক্তির লক্ষণ দেখা যায়। সেই বছরটিকেই কেমোথেরাপির জন্মবছর বলা হয়।
কিন্তু এত বড় সাফল্যের আড়ালে একটা সত্য চাপা পড়ে রয়ে যায়। সেটি হল, ফার্বারের সাফল্য দাঁড়িয়ে ছিল সুব্বারাওয়ের নির্মিত বায়োকেমিক্যাল ভিত্তির উপরেই। অ্যামিনোপ্টেরিন ছাড়া, আর ফলিক অ্যাসিডের পথচিত্র না তৈরি হলে, এই যুগান্তকারী চিকিৎসা হয়তো আরও বহু বছর দেরিতে আসত। দুর্ভাগ্যবশত, ইতিহাসের পাতায় ফার্বারই ‘কেমোথেরাপির জনক’ হিসেবে পরিচিত হন। সুব্বারাও থেকে যান পর্দার আড়ালেই।
জনস্বাস্থ্য বদলে দেওয়া ওষুধ
শুধু কেমোথেরাপিই নয়, তাঁর ল্যাব ছিল যেন ওষুধ-আবিষ্কারের এক অনন্ত উৎস। সেখান থেকে বেরিয়েছে আধুনিক চিকিৎসার বহু স্তম্ভ।
১. মেথোট্রেক্সেটের পূর্বসূরি: অ্যামিনোপ্টেরিনই পরবর্তীতে মেথোট্রেক্সেট আবিষ্কারের পথ তৈরি করে, যা আজও ক্যানসার, অটোইমিউন ডিজিজ ও আর্থ্রাইটিসে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২. টেট্রাসাইক্লিন: তাঁর নেতৃত্বেই আবিষ্কার হয় ক্লোরোটেট্রাসাইক্লিন— দুনিয়ার প্রথম টেট্রাসাইক্লিন অ্যান্টিবায়োটিক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভর করেছে।
৩. ডাইইথাইলকারবামাজিন (DEC): ফাইলেরিয়া নিরাময়ের জন্য প্রথম কার্যকর ওষুধ তৈরি করেছিলেন তিনিই। বহু বছর পর বিশ্বব্যাপী ফাইলেরিয়া নির্মূল অভিযানে এটাই নেয় WHO ।
৪. এনার্জি মেটাবলিজম—ATP: কেরিয়ারের শুরুর দিকে তিনি তৈরি করেন ফিস্ক-সুব্বারাও অ্যাসে, যার সাহায্যে প্রথম পরিষ্কার বোঝা যায় ATP কীভাবে জীবনের শক্তি মুদ্রা হিসেবে কাজ করে।
সব মিলিয়ে এগুলো কোনও ছোটখাটো অবদান নয়। এই সবই আধুনিক বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজি ও জনস্বাস্থ্যের মূল কাঠামো।
তাঁর নাম কেন পাঠ্যবইয়ে নেই
অসংখ্য অবদান সত্ত্বেও সুব্বারাওয়ের পুরো জীবন কেটেছে বৈষম্য ও রাজনীতির মাঝখানে। হার্ভার্ড তাঁকে কখনওইই স্থিতি বা সম্মান দেয়নি। তাঁর গবেষণাপত্রে অন্যদের নাম বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ইন্ডাস্ট্রির ল্যাবে কাজ করায় তিনি পাননি কোনও অ্যাকাডেমিক সম্মানও। অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
আমেরিকার সাংবাদিক ডরন অ্যানট্রিম পরে লিখেছিলেন, “সুব্বারাও না থাকলে কেমোথেরাপি থাকত না, টেট্রাসাইক্লিন থাকত না, ফলিক অ্যাসিড বুঝতেই পারতাম না আমরা। গোটা পৃথিবীই মেডিসিনের দিক থেকে অনেক দরিদ্র থেকে যেত।”
নতুন করে আলোচনায় সুব্বারাও
আজ সারা দুনিয়ার অঙ্কোলজিস্ট, ফার্মাকোলজিস্ট এবং মেডিক্যাল ইতিহাসবিদেরা নতুন করে সুব্বারাওকে মূল্যায়ন করছেন। কিন্তু ভারতে তাঁর নাম এখনো NCERT-র বইয়ে প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী জানেও না— ভীমবরমের এক তরুণ একদিন তৈরি করেছিলেন প্রথম ক্লিনিক্যাল ক্যানসার ওষুধের ভিত্তি, যা লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রথম আশার আলো দেখিয়েছিল।এবার হয়তো সেই গল্পটা আবার নতুন করে লেখার সময় এসেছে!