শিবু সোরেন যাঁকে ঝাড়খণ্ডের মানুষ একডাকে চেনে গুরুজি বা দিশম গুরু নাম। শিবু সোরেনের জন্ম ১১ জানুয়ারি, ১৯৪৪ সালে।

শিবু সোরেন- ১১ জানুয়ারি, ১৯৪৪ সাল-৪ অগস্ট, ২০২৫।
শেষ আপডেট: 4 August 2025 11:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এদেশে স্বাধীনতোত্তর আদিবাসী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেতা শিবু সোরেন। শিবু সোরেন যাঁকে ঝাড়খণ্ডের মানুষ একডাকে চেনে গুরুজি বা দিশম গুরু নাম। শিবু সোরেনের জন্ম ১১ জানুয়ারি, ১৯৪৪ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে লড়াই ও পৃথক রাজ্যের দাবিতে তির-ধনুক হাতে নেমে পড়েন খনিজ সম্পদে ভরপুর ঝাড়খণ্ড এলাকায়। সঙ্গী ছিলেন মাত্র দুজন। একজন হলেন বাঙালি মার্কসবাদী শ্রমিক সংগঠনের নেতা এ কে রায় এবং অন্যজন কুর্মি-মাহাত নেতা বিনোদবিহারী মাহাত। ১৯৭২ সালে তাঁরা গঠন করেন নবযুবক সঙ্ঘ যা পরে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা নামে আত্মপ্রকাশ করে। সোরেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
শিবু সোরেন ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। পৃথক রাজ্য ঘোষণার পর ঝাড়খণ্ডের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, প্রথমে ২০০৫ সালে ১০ দিনের জন্য (২ মার্চ থেকে ১২ মার্চ), তারপর ২০০৮ থেকে ২০০৯ এবং আবার ২০০৯ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। শিবুর প্রতিষ্ঠিত ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা এবং তাঁর মুখ্যমন্ত্রী পুত্র হেমন্ত সোরেন ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিক। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন জেএমএমের সুপ্রিমো। সোরেন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৮ এবং ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুমকা লোকসভা কেন্দ্রের লোকসভা সদস্য ছিলেন।
তিনবার কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে। ১৯৯৪ সালে তাঁর একান্ত সচিব শশী নাথ ঝা হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য দিল্লির একটি জেলা আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। অতীতে অন্যান্য ফৌজদারি অভিযোগে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সোরেনের জন্ম পূর্বতন বিহারের রামগড় জেলার নেমরা গ্রামে। সোরেন ছিলেন সাঁওতাল উপজাতির অন্তর্ভুক্ত। নেমরাতেই তাঁর স্কুলজীবন শেষ করেন। স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর বাবাকে মহাজনদের গুন্ডারা খুন করে। এরপরই ১৮ বছর বয়সে তিনি সাঁওতাল নবযুবক সঙ্ঘ গঠন করেন। জেএমএম আদিবাসী, সাঁওতাল, কুর্মি-মাহাতদের জমি পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন সংগঠিত করে। সাঁওতালি ভাষায় স্লোগান ওঠে লাঙল যার, ফসল তার। তাঁরা জোরপূর্বক জমিতে ফসল কাটা শুরু করেন। শিবু সোরেন জমিদার এবং মহাজনদের বিরুদ্ধে সালিশিসভা বা খাপ পঞ্চায়েত গঠন করেন। কখনও কখনও নিজস্ব আদালত পরিচালনা শুরু করেন।
১৯৭৫ সালের ২৩ জানুয়ারি, শিবু "বহিরাগত" বা 'অ-উপজাতীয়' লোকদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি অভিযানে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। কমপক্ষে ১১ জনকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে সোরেন এবং আরও অসংখ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর, সোরেনকে ৬ মার্চ ২০০৮ তারিখে খালাস দেওয়া হয়।
১৯৭৭ সালে তিনি প্রথম লোকসভা নির্বাচনে হেরে যান। ১৯৮০ সালে তিনি প্রথমবার দুমকা থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতার পরোয়ানা জারি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালেও লোকসভায় নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। কিন্তু সেই বছরেই উপনির্বাচনে তিনি দুমকা লোকসভা আসন থেকে জয়লাভ করেন এবং রাজ্যসভার আসন ছেড়ে দেন। ২০০৪ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন।
এরপর মনমোহন সরকারের কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রী হন, কিন্তু, চিরুডিহ মামলায় তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তিনি ৬৯ জনের মধ্যে একজন প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন, যার বিরুদ্ধে ২৩ জানুয়ারি, ১৯৭৫ সালে উপজাতি ও মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জনকে (৯ জন মুসলিম সহ) হত্যার অভিযোগ ছিল। পরোয়ানা জারির পর, তিনি প্রথমে আত্মগোপনে চলে যান। ২০০৪ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এক মাসেরও বেশি সময় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকার পর তিনি জামিন পান। ২০০৫ সালে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আবার কয়লা মন্ত্রীর পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৫ সালের ২ মার্চ, অনেক রাজনৈতিক দর কষাকষি এবং বিনিময়ের পর, ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল তাঁকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বিধানসভায় আস্থা ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ায় নয় দিন পরে, ১১ মার্চ তিনি মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি দুমকা আসন থেকে বিজেপির সুনীল সোরেনের কাছে হেরে যান।
২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর, সোরেনকে তাঁর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সচিব শশীনাথ ঝা-এর অপহরণ ও খুনে জড়িত একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দাবি করা হয় যে ঝা-কে ১৯৯৪ সালের ২২ মে দিল্লির ধৌলাকুয়াঁ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং রাঁচির কাছে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। সিবিআই চার্জশিটে বলা হয়েছে যে, ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে অনাস্থা প্রস্তাবের সময় কংগ্রেসের পিভি নরসিমা রাও সরকারকে বাঁচাতে কংগ্রেস এবং জেএমএমের মধ্যে কথিত চুক্তি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন ঝা। চার্জশিটে জোর দিয়ে বলা হয়, "ঝা অবৈধ লেনদেন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং সোরেনের কাছ থেকে এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আশা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন।"
ভারত সরকারের কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা। ২০০৬ সালের ৫ ডিসেম্বর শিবু সোরেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দিল্লির একটি আদালত তার জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়ে বলে: 'আমরা এই সত্যটি উপেক্ষা করতে পারি না যে আপিলকারী (সোরেন) ২০০৬ সালের নভেম্বরে একটি বিস্তারিত এবং বিস্তৃত বিচারের পরে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাজা পেয়েছেন। বেঞ্চ আরও উল্লেখ করে যে, ঝাড়খণ্ডে গণহত্যার মামলা সহ আরও বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিচার চলছে।
২৫ জুন ২০০৭ তারিখে, শিবু সোরেনকে দুমকায় জেলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়ির উপর বোমা হামলা চালানো হয়, কিন্তু কেউ আহত হয়নি। ২০০৭ সালের ২৩ অগস্ট দিল্লি হাইকোর্ট জেলা আদালতের রায় বাতিল করে সোরেনকে খালাস দেয়, এই বলে যে "বিচার আদালতের বিশ্লেষণ বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং টেকসই নয়।"
শিবু সোরেন রূপী কিস্কুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর তিন ছেলে দুর্গা সোরেন, হেমন্ত সোরেন এবং বসন্ত সোরেন এবং এক মেয়ে অঞ্জলি সোরেন। তাঁর বড় ছেলে দুর্গা ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন। দুর্গার মৃত্যুর পর স্ত্রীও বিধায়ক হন কিন্তু তিনি এখন বিজেপি যোগ দিয়েছেন। বসন্ত সোরেন ঝাড়খণ্ড যুব মোর্চার সভাপতি, এবং দুমকার বর্তমান বিধায়ক। হেমন্ত সোরেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।