গত বছর লোকসভা নির্বাচনে বাবা লালুপ্রসাদ ও মা রাবড়িদেবীর পুরনো আসন সারণ থেকে আরজেডির প্রার্থী হয়েছিলেন রোহিনী। জিততে পারেননি। তার আগে তাঁরই একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বিরক্ত হয়ে আরজেডির সঙ্গে জোট ভেঙে ফের বিজেপির হাত ধরেছিলেন নীতীশ কুমার।

শেষ আপডেট: 23 September 2025 19:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি সঞ্জয় যাদব । বছর একচল্লিশের এই যুবক হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রের বাসিন্দা (Sanjay Yadav, a resident of Kurukshetra, Haryana) । সেখানেই কম্পিউটার সায়েন্স ও ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশুনো করে কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি করতেন। ২০১২ থেকে তাঁর দ্বিতীয় ঠিকানা পাটনা (Patna, capital of Bihar)। বিহারের রাজধানীতে ফ্ল্যাট নিয়েছেন। কখনও সখনও টানা কয়েক সপ্তাত থেকে যান পাটনায়।
ভোটমুখী বিহারে সেই সঞ্জয় যাদবকে নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা। তাই-ই শুধু নয়, তাঁর সঙ্গে তেজস্বী যাদবের (Tejaswi Yadav, RJD leader and former Dy CM of Bihar) বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক ঘিরে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে আরজেডি এবং লালুপ্রসাদের পরিবার। আরডেজি সুপ্রিমোর মেজো মেয়ে রোহিনী আচার্য (Rahini Acharya, Daughter of Lalu Pasad Yadav and Ravri Devi) প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কে এই সঞ্জয় যাদব যিনি আমাদের দলের বিষয়ে নাক গলান?’স্বামীর চাকরির সুবাদে রোহিনী সিঙ্গাপুরে থাকেন। এই মেয়ের দেওয়া কিডনি নিয়েই সুস্থ আছেন লালুপ্রসাদ। সিঙ্গাপুরে থাকলেও সেখান থেকেই বিহারের রাজনীতিতে যুক্ত থাকেন রোহিনী। আরজেডি-তে তাঁরও অনুগামী নেতা-কর্মী কম নন। তাঁদের চোখ-কান দিয়েই দলের নিজের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন তিনি।

তেজস্বী ও সঞ্জয় যাদব
গত বছর লোকসভা নির্বাচনে বাবা লালুপ্রসাদ ও মা রাবড়িদেবীর পুরনো আসন সারণ থেকে আরজেডির প্রার্থী হয়েছিলেন রোহিনী। জিততে পারেননি। তার আগে তাঁরই একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বিরক্ত হয়ে আরজেডির সঙ্গে জোট ভেঙে ফের বিজেপির হাত ধরেছিলেন নীতীশ কুমার।সেই রোহিনীর রোষে পড়েছেন এবার তাঁর ছোট ভাই তেজস্বীর ছায়াসঙ্গী সঞ্জয় যাদব। লালু কন্যার অসন্তোষের কারণ তেজস্বীর অধিকার যাত্রায় সঞ্জয়ের চালচালন, দাপট পছন্দ হয়নি তাঁর। যে বাসে চেপে তেজস্বী গোটা বিহার ঘুরেছেন সেটিতে লালুপ্রসাদ-রাবড়ি দেবীর জন্য বরাদ্দ সিটে বসেছিলেন সঞ্জয়। সেই ছবি দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন লালু-রাবড়ির মেজো মেয়ে। সিঙ্গাপুরে বসে এক্স পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এত বড় স্পর্ধা আমার বাবা-মায়ের জন্য রাখা সিটে বসে পড়েছে। কে এই সঞ্জয় যাদব? আমাদের পার্টির সঙ্গে কী সম্পর্ক তাঁর?’
রাজনৈতিক মহলের খবর, আরজেডির সঙ্গে সরকারিভাবে কোনও সম্পর্ক না থাকলেও বিহারের বিরোধী দলনেতা তথা সাবেক উপ মুখ্যমন্ত্রী তেজস্বীর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সঞ্জয়। লালুপুত্র তাঁর উপর অনেকটাই নির্ভর করেন। তেজস্বীর ভাষণের পয়েন্ট ঠিক করে দেওয়া থেকে কোন ইস্যুকে কী বলবেন, কী করবেন, দলে কাকে কোন পদে বসাবেন, সর্বোপরি ভোটের প্রার্থী বাছাই, শরিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি, ইস্যু নির্ধারণ, ইত্যাদি নিয়ে সঞ্জয়ের পরামর্শ ছাড়া এক পা নড়েন না তেজস্বী। বিহারের রাজনীতিতে তাই হরিয়ানার এই যুবককে ‘তেজস্বী যাদবের প্রশান্ত কিশোর’ বলা হয়ে থাকে।

আরজেডি'র প্রচার গাড়িতে লালু-রাবড়ির আসনে সঞ্জয় যাদব
তুলনা চলে ভিকে পান্ডিয়ানের সঙ্গেও। ওড়িশা ক্যাডারের এই তামিল আইএএস অফিসারকে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে চোখে হারাতেন নবীন পট্টনায়েক। ওড়িশার রাজনীতিতে চাউর হয়ে গিয়েছিল, পান্ডিয়ানের বলে দেওয়া কথাই নবীন পট্টনায়ক বলে থাকেন। তাঁর নিজের কোনও কথা নেই। পান্ডিয়ানকে নিয়েও আড়াআড়ি বিভাজন ছিল বিজু জনতা দলে। গত বছর বিধানসভা ভোটে নবীন সরকারের পতন হলে চাকরি ছেড়ে তামিলনাড়ু ফিরে গিয়েছেন বিতর্কিত ওই প্রবীণ আইএএস অফিসার।
হরিয়ানার সঞ্জয়ের সঙ্গে বিহারের তেজস্বী যাদবের বন্ধুত্ব হল কীভাবে? জানা যাচ্ছে, ২০১২ থেকে দু’জনের পরিচয়। দিল্লিতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তেজস্বীর সঙ্গে সঞ্জয়ের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী, সমাজবাদী নেতা অখিলেশ যাদব। অখিলেশের এক খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে লালুপ্রসাদের এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সেই সূত্রে বিহার ও উত্তর প্রদেশের রাজনীতির যাদব পরিবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ।
তখনই জানা যায় তেজস্বীর মতো সঞ্জয়েরও ক্রিকেট ও রাজনীতি, দু’য়ের প্রতিই আগ্রহ। সেই আলাপ বন্ধুত্বে গড়ায় ২০১৫-তে বিহার বিধানসভার ভোটের আগে। তেজস্বীর ফোন পেয়ে পাটনা চলে আসেন সঞ্জয়। লালুপ্রসাদের ছোট ছেলের তখন থেকেই ছায়াসঙ্গী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানেজমেন্টের স্নাতক সঞ্জয় যাদব।
সেবার বিধানসভা নির্বাচনে লালুপ্রসাদেরও নয়নের মণি হয়ে ওঠেন সঞ্জয়। ২০১৫-তে আরজেডি ও জেডিইউ অর্থাৎ লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারের দল জোট বেঁধে লড়াই করে বিজেপিকে কুপোকাৎ করেছিল। ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় লালু-নীতীশের দল পেয়েছিল ১৭৮ আসন। সেবার নীতীশের ভোট কুশলী ছিলেন প্রশান্ত কিশোর।
অন্যদিকে, আরজেডি-তে প্রশান্তের ভূমিকায় ছিলেন স্বয়ং লালুপ্রসাদ। বিজেপির বিজয় রথ সেবার থামিয়ে দেওয়ার গোটা কৃতিত্ব পেয়ে যান লালুপ্রসাদ। নির্বাচনী প্রচারের মাঝে দলের এক বৈঠকে আরজেডি সুপ্রিমো খবরের কাগজের একটা ক্লিপিং পকেট থেকে বের করে মুচকি হেসে ভোজপুরিতে বলে উঠেছিলেন, ‘ব়়ড়কা মুদ্দা মিল গেল বা।’
পরে প্রমাণ হয়েছিল, বড় মাছটাই ধরেছিলেন লালুপ্রসাদ। যদিও পাড়ে এসে নড়াচড়া করলেও আগে কেউ টের পায়নি। আসলে বিহারের ভোটের মাঝে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত আচমকা বলে বসেন, ‘দেশে শিক্ষা, চাকরিতে পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের জন্য চালু সংরক্ষণ আর থাকা উচিত কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। সরকারগুলির উচিৎ এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা।’ ভাগবতের কথা মিডিয়ায় এলেও খুব বেশি আলোচনা হয়নি। লালুপ্রসাদ দলকে নির্দেশ দেন, ভোটের বাকি দিনগুলি প্রচারে এই ইস্যুতেই বিজেপিকে আক্রমণ শানাতে হবে। বলতে হবে বিজেপির অভিভাবকেরা চায় না গরিব মানুষের জন্য সংরক্ষণ থাকুক। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সংরক্ষণ তুলে দেবে।
বলা হয়, আরজেডির এই প্রচারেই বিজেপি ধরাশায়ী হয় বেশি। বিজেপি নেতারাও একান্তে মেনে নেন লালুপ্রসাদের কেরামতি। এমনকী বলাবলি শুরু হয় কে বড় ভোট কুশলী, প্রশান্ত কিশোর, নাকি লালুপ্রসাদ যাদব।
ভোটের কিছুদিন পর দলেরই আর এক বৈঠকে লালুপ্রসাদ নেতাদের জানিয়েছিলেন, মোহন ভাগবতের বিষয়টা তাঁর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল তেজস্বীর এক বন্ধু। পরে জানাজানি হয় তিনি আর কেউ নন, সঞ্জয় যাদব। ভোটের প্রচারের মধ্যেই লালুপ্রসাদের সঙ্গে সঞ্জয়ের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন তেজস্বী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আরজেডির প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে পয়লা সাক্ষাতেই নিজেকে ভোট কুশলী হিসাবে তুলে ধরেছিলেন সঞ্জয়। সেই থেকে তিনি লালুপ্রসাদের স্নেহধন্য।
কিন্তু গোল বেঁধেছে, সঞ্জয়কে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে লালুপ্রসাদের মেজো মেয়ে রোহিনীর অভিযোগ নিয়ে। মেজো মেয়ের পাশে আছেন লালুর বড় ছেলে তেজপ্রতাপ। দল বিরোধী কাজের অভিযোগে যাঁকে আরজেডি থেকে ছয় বছরের জন্য বের করে দিয়েছেন লালু। বহিষ্কৃত তেজপ্রতাপের হুঁশিয়ারি ‘দিদিকে (রোহিনী আচার্য) কেউ অপমান করলে ছেড়ে কথা বলব না। আমার এই দিদি কিডনি দেওয়াতেই আমাদের বাবা এখনও সুস্থ আছেন। দলে মেজদির কথা ফেলনা নয়।’
আরজেডি সূত্রের খবর, দলের অঙ্কে তেজস্বীর পাশে আছেন লালুপ্রসাদের বড় মেয়ে তথা রাজ্যসভার সাংসদ মিসা ভারতী। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সঞ্জয়কে নিয়ে বিরোধ আসলে লালুপ্রসাদের পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। তেজস্বীর উত্থানে চিন্তিত দিদি রোহিনী। তাতে সমস্যা বাড়ছে লালালুপ্রসাদেরই। তিনি যেমন রোহিনীকে দূরে ঠেলতে পারবেন না, তেমনই তেজস্বীকেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসাবে গড়ে তুলেছেন।