
আধুনিক ভারতের চাণক্য। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 11 December 2024 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: '২০০৭ সালের জানুয়ারি, নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জরুরি অবস্থা শারি করলেন। সেদেশের মুখ্য উপদেষ্টা ফকরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্ব একটি তদারকি সরকার গঠন করেন। এই সময়ে দেশের সব বড় বড় নেতা-নেত্রীদের জেলে পোরা হল। ঘুষ এবং দুর্নীতির অভিযোগ জেলে পাঠানো হল শেখ হাসিনাকেও। সেই সময় ভারত তদারকি সরকারের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রেখে চলছিল। আমরা শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছভাবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চাপ দিয়ে চলছিলাম। অবাধ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের উপর চাপ বাড়াচ্ছিলাম।'
'দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স: ১৯৯৬-২০১২' শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে এই কথাই লিখে গিয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। আধুনিক ভারতের চাণক্য দেশের প্রথম ও এখনও পর্যন্ত বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রয়াত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ৮৯-তম জন্মদিন আজ, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে থেকে দেশের তাবড় নেতারা প্রয়াত রাষ্ট্রপতির জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
আত্মজীবনীতে সেই সময়ের বাংলাদেশের অস্থিতিকর পরিস্থিতি নিয়ে প্রণব লিখেছিলেন, বাংলাদেশের দুই বেগমকে রক্ষা করা শীর্ষক একটি অংশ। যেখানে তিনি লিখেছেন, ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান মইন আহমেদ ৬ দিনের সফরে ভারতে এসেছিলেন। আমার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। ঘরোয়া আলোচনায় আমি তাঁকে বলেছিলাম, আগে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছিলেন শেখ হাসিনা মুক্তি পেলেই তাঁকে বরখাস্ত করতে পারেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলাম। বলেছিলাম হাসিনা ক্ষমতায় ফিরলেও তিনিই জেনারেল থাকবেন। এনিয়ে আমি তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশের দেখা করতে চাই।
তাঁকে বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে পদক্ষেপে অনুরোধ জানানোর ইচ্ছা ছিল আমার। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার অবিলম্বে মুক্তির বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ চেয়েছিলাম। আমি এবং তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এমকে নারায়ণের উদ্যোগে বাংলাদেশে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আওয়ামি লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলাম, লিখেছেন জাতীয় রাজনীতিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খ্যাতি ও নিন্দার দাঁড়িপাল্লায় ঘোরাফেরা করা বঙ্গসন্তান প্রণব মুখোপাধ্যায়।
প্রণব আরও লিখেছেন, একসময় শারদ পাওয়ার চেয়েছিলেন আমি প্রধানমন্ত্রী হই। ১৯৯৯ সালের ভোটের মুখে দেশজুড়ে এক সর্বাত্মক বিদ্রোহ জেগে ওঠে এই ইস্যুতে যে, ইতালীয় নাগরিক, রাজীব গান্ধী-পত্নী সনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে পারেন। আমার মনে হয়, লোকসভার বিরোধী দলনেতা (তৎকালে) শারদ পাওয়ার ভেবেছিলেন সনিয়ার বদলে তাঁকে ওই পদের প্রস্তাব দেওয়া হবে। কংগ্রেসের সভানেত্রী হওয়ার পর সনিয়া সব বিষয়ে পি শিবশঙ্করের সঙ্গে পরামর্শ করতেন, শুধু পাওয়ারকে বাদ দিয়ে।
প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের মতে, তাঁর বাবা ছিলেন সকলের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। কারণ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কখনও কারও বৈরিতা রয়েছে বলে শোনা যায়নি। এমনকী ভিন্ন মেরুর রাজনীতিতে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল মধুর। মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বাবা ছিলেন রাষ্ট্রপতি। মোদী তাঁর বাবার পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়েছিলেন শপথ নেওয়ার পর। উত্তরে বাবা মোদীকে বলেছিলেন, আমরা দুজনে দুই ভিন্ন নীতি-আদর্শের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু আপনি জনমত পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আমি আপনার সরকার পরিচালনায় নাক গলাব না। ওটা আপনার কাজ। তবে আপনার যদি কোনওদিন সাংবিধানিক বিষয়ে সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমি আছি।
প্রণব তাঁর ডায়েরিতেও লিখেছেন, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও মোদী আমাকে শ্রদ্ধা করতেন। কেন জানি না, কংগ্রেসের প্রবল গালমন্দ করা লোকটার আমার প্রতি একটা নরম মনোভাব বরাবরই ছিল। শর্মিষ্ঠার মতে, হয়তো স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণের প্রতি দুজনেই একনিষ্ঠ ভক্ত হওয়ায় এক অদ্ভুত মিল গড়ে উঠেছিল দুজনের মধ্যে। প্রণবও বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর পর নরেন্দ্র মোদী হলেন দেশের সেই নেতা, যিনি নিঃসন্দেহে মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝতেন এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির অধিকারী ছিলেন।