গরিব, প্রান্তিক মানুষদের টার্গেট করে কি সত্যিই বড়সড় গুপ্তচর চক্র গড়ে উঠেছিল, নাকি তারা কোনও ফাঁদের শিকার - এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মনে।

শেষ আপডেট: 30 March 2026 21:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাস্তার ধারে পাংচার সারাইয়ের দোকান, মথুরার রাস্তায় ই-রিকশা চালানো বা ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ - এই সাধারণ জীবনযাপনই হঠাৎ করে জড়িয়ে পড়েছে এক চাঞ্চল্যকর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে (UP Pakistan spy ring Instagram recruitment)। গাজিয়াবাদ পুলিশের দাবি, এই সমস্ত নিম্নআয়ের মানুষজনই নাকি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত একটি জটিল আন্তঃসীমান্ত গুপ্তচর চক্রের ‘গ্রাউন্ড-লেভেল অ্যাসেট’ (Pakistan spy ground level assets)।
অভিযুক্তদের পরিবার অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করছে। তাঁদের অভিযোগ, সন্তানদের ফাঁসানো হয়েছে, এমনকি হুমকি দিয়ে এই কাজে জড়ানো হয়েছে।
১৫ গ্রেফতার, জুভেনাইলও জড়িত
১৪ মার্চের পর থেকে তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে নতুন তথ্য। স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT) ইতিমধ্যেই আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট গ্রেফতারি সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫-এ, সঙ্গে আটক হয়েছে ৬ জন নাবালকও।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA)-এর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
কী অভিযোগ?
পুলিশের দাবি, এই চক্রের সদস্যরা সেনা ঘাঁটি ও রেলস্টেশনের ভিডিও করত। সেই ভিডিও ও তথ্য পাকিস্তান-ভিত্তিক ‘হ্যান্ডলার’-দের কাছে পাঠাত। বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে GPS লোকেশন ও টাইমস্ট্যাম্পও জুড়ে দিত। এমনকি সোলার চালিত, সিম-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাদের।
কারা ধৃত?
এই মামলায় ধৃতদের মধ্যে রয়েছে - সামির ওরফে শ্যুটার (২০), সামির (২২), শিবরাজ (১৮), নৌশাদ আলি (২০), মীরা (২৮), সুহেল মালিক ওরফে রোমিও (২৩), ইরাম ওরফে মাহক (২৫), প্রবীণ (১৯), রাজ বাল্মীকি (২১), শিবা বাল্মীকি (২০), রিতিক গাঙ্গওয়ার (২৩), গণেশ (২০), বিবেক (১৮), গগন কুমার প্রজাপতি (২২) এবং দুর্গেশ নিশাদ (২৬)।
অর্থাৎ প্রত্যেকের বয়সই ১৮ থেকে ৩০ মধ্যে। খুব বেছে বেছেই উঠতি বয়সকে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে বলেই ধারণা সিটের।
‘হুমকি দিয়ে বাধ্য করা হয়েছিল’
গাজিয়াবাদের ভোভাপুর, অভিবাসী শ্রমিকদের ভিড়ে ঠাসা একটি এলাকা, এখন এই গোটা চক্রের ‘এপিসেন্টার’ হিসেবে উঠে এসেছে। সরু গলি, খোলা নর্দমা - এই পরিবেশেই বাস অভিযুক্তদের পরিবারের।
রাজ বাল্মীকের বাবা অরবিন্দ বলেন, “আমার ছেলে জানিয়েছে, সুহেল তাকে হুমকি দিয়েছিল। বলেছিল, তিনটি সিম কার্ড না দিলে তার বোনকে অপহরণ করা হবে।”
অরবিন্দের দাবি, তাঁর ছেলের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ছিল না। আনন্দ বিহারের একটি দোকানে রাতের শিফটে কাজ করত সে। তাঁর প্রশ্ন, “যে ছেলে টিভির তারও ঠিক করতে পারে না, সে কীভাবে সিসিটিভি বসাবে?”
শিবা বাল্মীকের মা লতা বাল্মীকি বলেন, “আমার ছেলে কাঁদছিল। বলছিল, সুহেল তার ফোন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহার করত, আর না মানলে খারাপ কিছু করবে বলে হুমকি দিত।” লতার দাবি, “আমি পড়তে জানি না। কাগজ বা পুলিশ ফাইল কিছুই পড়িনি। শুধু জানি, আমার ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে।”
‘গুপ্তচর’ তকমায় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
এই ঘটনায় গোটা এলাকায় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। ‘পাকিস্তানের গুপ্তচর’ বা ‘সন্ত্রাসবাদী’ - এমন তকমা লাগানো হচ্ছে অভিযুক্তদের পরিবারকে।
১৮ বছরের বিবেকের মা পিঙ্কির কথায়, “আমার ছেলে বিড়ি আর জল বিক্রি করে সংসার চালাত। এখন লোকে বলছে সে গুপ্তচর! আমি কোথায় মুখ লুকোব?”
মেরঠেও একই চিত্র
মেরঠের পারতাপুরে ধৃত গণেশ, যিনি নেপাল থেকে এসে ফাস্ট ফুড দোকানে কাজ করতেন, মাসে ১২ হাজার টাকা রোজগার করতেন। দোকান মালিকের দাবি, “সে শুধু সংসারের জন্য টাকা রোজগার করতে চেয়েছিল। আমি মনে করি না সে গুপ্তচর ছিল।”
'হ্যান্ডলার’ নিয়ে কী তথ্য জানা গেছে?
ফরিদাবাদের নওচালি গ্রামের একটি পেট্রোল পাম্পও তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে। এখানে কাজ করতেন নৌশাদ আলি, যিনি নাকি এই চক্রের অন্যতম মূল সদস্য। সহকর্মীদের দাবি, নৌশাদ খুব কম কথা বলতেন, নিজের মতো থাকতেন। মাঝে মাঝেই দিল্লি যেতেন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে।
এক কর্মীর কথায়, “পুলিশ এসে সরাসরি তাকে তুলে নিয়ে গেল। আমরা ভাবছিলাম, হয়তো ছোটখাটো কোনও অপরাধে গ্রেফতার করা হচ্ছে।”
ইনস্টাগ্রামে নিয়োগ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সংযোগ
পুলিশের দাবি, এই চক্র সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই সদস্য সংগ্রহ করত।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৩-২৪ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় অস্ত্রসহ ছবি পোস্ট করার পর সামিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে চক্রের সদস্যরা। তাকে বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তাকে বিভিন্ন কাজ দেওয়া শুরু হয়।
আরেক অভিযুক্ত জানান, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে নৌশাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এরপর তাকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়, যেখানে মীরাও সদস্য ছিলেন।
পুলিশের দাবি, এই গ্রুপের মাধ্যমেই অস্ত্র পাচার এবং বিভিন্ন নজরদারির কাজ চালানো হত।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের দাবি, তদন্তে প্রাথমিকভাবে এমন প্রমাণ মিলেছে যা দেখায় অভিযুক্তরা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ছিল এবং গোপন তথ্য বিদেশে পাঠাচ্ছিল। এই তথ্য অপব্যবহারের সম্ভাবনাও প্রবল বলেই মনে করছে পুলিশ।
ধৃতদের মধ্যে মীরা, যিনি দুই সন্তানের মা, মথুরায় ই-রিকশা চালান। এর আগে অস্ত্র আইনের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করেছিল দিল্লি পুলিশ। পরে আদালত মানবিক কারণে তাঁকে জামিন দেয়, কারণ তাঁর দুই অল্পবয়সি সন্তান রয়েছে।
গরিব, প্রান্তিক মানুষদের টার্গেট করে কি সত্যিই বড়সড় গুপ্তচর চক্র গড়ে উঠেছিল, নাকি তারা কোনও ফাঁদের শিকার - এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মনে।