পুতিনের বার্তা, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তাঁর 'বন্ধুত্ব' এই সম্পর্ককে (India Russia relationship) স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে, এবং “বাহ্যিক চাপের মাঝেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”

নরেন্দ্র মোদী- ভ্লাদিমির পুতিন
শেষ আপডেট: 5 December 2025 00:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার (Western pressure) নতুন ধাক্কাও ভারত–রাশিয়া সম্পর্ককে (India Russia relationship) নড়বড়ে করতে পারেনি, এমনই মন্তব্য করলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)। ইন্ডিয়া টুডে–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা 'স্থিতিশীল এবং অপরিবর্তিত'।
প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (America) ও ইউরোপ (Europe) আরও কঠোর ভাবে রাশিয়ার তেলের (Russian oil) মূল্যসীমা (প্রাইস ক্যাপ) কার্যকর করতে শুরু করেছে এবং নিষিদ্ধ ট্যাঙ্কার বা তেল পরিবহন সংস্থার সঙ্গে লেনদেন না করার জন্য ভারত-সহ নানা দেশকে সতর্ক করছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) নেওয়া শুল্ক সিদ্ধান্তের (US Tariff) নেপথ্যে ভারতের এই উত্থান - মত পুতিনের। তিনি বলেন, “শুল্কনীতি হোক বা রুশ তেল কেনা নিয়ে চাপ, এসবের পেছনে ভারতের বাড়তে থাকা প্রভাবের আতঙ্কই কাজ করছে।”
“রাজনৈতিক চাপে নয়, বাজারই আসল”: পুতিন
পুতিন অবশ্য এই চাপের গুরুত্ব কমিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমা দেশগুলির এই প্রয়াস “বাজারের বাস্তবতা নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। তিনি বলেন, “এই ধরনের চাপ আসলে কূটনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা মাত্র।”
ভারতকে কেন্দ্র করেই তিনি আরও যোগ করেন, দুই দেশের জ্বালানি সম্পর্ক এমন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা রাজনৈতিক ওঠানামায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। “ভারতের সঙ্গে আমাদের জ্বালানি সহযোগিতা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ক্ষণস্থায়ী কূটনৈতিক পরিবর্তন কিংবা ইউক্রেনের মর্মান্তিক ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত নয়,” এমনটাই মন্তব্য পুতিনের।
হাইড্রোকার্বন ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা
পুতিন জানান, ইউক্রেন যুদ্ধের বহু আগেই ভারত–রাশিয়ার তেল-গ্যাস ব্যবসার ভিত শক্ত হয়েছিল, এবং সেটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। তিনি বলেন, “আমাদের দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে সফল ও বিশ্বাসযোগ্য বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। সকলেরই জানা যে, ভারতের একটি প্রধান তেল শোধনাগারে আমাদের অন্যতম সংস্থার বড় অংশীদারি রয়েছে।” তিনি ইঙ্গিত করেন রোজনেফ্টের নয়ারা এনার্জির শেয়ারে বিনিয়োগের কথায়।
২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ইউরোপ পর্যন্ত প্রভাব
পুতিনের মতে, রোজনেফ্টের এই বিনিয়োগ ছিল নিছক প্রতীকী নয়। “এই বিনিয়োগ ভারতীয় অর্থনীতিতে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অন্যতম বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগ। আমাদের সংস্থা রিফাইনারির কার্যক্রম ক্রমাগত বাড়িয়েছে, অংশীদারদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে প্রতি বছর সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে,” তিনি বলেন।
তাঁর দাবি, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক (জ্বালানি সংক্রান্ত) এতটাই পরিণত হয়েছে যে, এর প্রভাব এখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়ছে। “ভারত আজ ইউরোপের অন্যতম প্রধান রিফাইন্ড প্রোডাক্ট সরবরাহকারী। এটা শুধু রাশিয়ার ডিসকাউন্টেড তেল কেনার জন্য নয়, এ অবস্থানে পৌঁছতে বহু বছর লেগেছে, এবং এর সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক নেই,” মন্তব্য পুতিনের।
“ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনেকেরই সহ্য হচ্ছে না”
রুশ প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারতের ভূমিকা অনেকেই ভাল চোখে দেখছে না। “ভারতের আন্তর্জাতিক বাজারে ভূমিকা, বিশেষত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, বেশ কিছু পক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলছে। ফলে তারা রাজনৈতিক কারণে ভারতের প্রভাব কমানোর জন্য কৃত্রিম বাধা তৈরি করছে,” বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা জটিলতা, কিন্তু রাশিয়ার ভরসা অটুট
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাশিয়ান তেল পরিবহনের পথ আরও কঠিন করে দিয়েছে। ফলে ভারতীয় আমদানি ব্যাহত হবে কি না, সেই আশঙ্কাও বেড়েছে। কিন্তু পুতিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মস্কো এতে কোনও সমস্যাই দেখছে না, এবং নিয়ম মতোই ভারতকে তেল সরবরাহ করে চলবে।
তিনি আরও বলেন, ভারত–রাশিয়া জ্বালানি সহযোগিতা কোনও নিষেধাজ্ঞার কারণে বা সাময়িক লাভের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। “এটি বহু পুরনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যা কৌশলগত আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে গড়ে উঠেছে।”
পুতিন দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর 'বন্ধুত্ব' এই সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে, এবং “বাহ্যিক চাপের মাঝেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
ভারতের জন্য রুশ তেলের গুরুত্ব অপরিসীম
ভারতে জ্বালানি চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, এবং দেশীয় জ্বালানি দামের নিয়ন্ত্রণে রাশিয়া থেকে আমদানি করা তেলের এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পুতিনের বার্তা তাই পরিষ্কার, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা যেভাবেই বদলাক, ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।