
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 7 February 2025 20:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একজন সফল ব্যবসায়ীর ছকবাঁধা জীবন নয়, একজন উচ্চাশী উদ্যোগপতির ছকভাঙা জীবনের গল্প নিজের যাপনে মেলে ধরতে চেয়েছিলেন রতন টাটা। গত বছর ৯ অক্টোবর প্রয়াত হয়েছেন। অথচ মৃত্যুর পরেও যে তিনি এতটুকু প্রাসঙ্গিকতা হারাননি, তার প্রমাণ মিলল রতন টাটার দস্তখত করে যাওয়া উইলে। যা একইসঙ্গে উস্কে দিয়েছে হরেক কৌতুহল, নানান জিজ্ঞাসা এবং তৎসহ বিতর্কও! খালি চোখে দেখে মনে হবে সাধারণ উইল। অর্থাৎ, সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারার নথিপত্র। যার সিংহভাগই জনহিতকর কাজের জন্য বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ অবশিষ্ট সম্পত্তি যা রয়েছে, অকৃতদার, অপুত্রক রতন টাটা তার এক তৃতীয়াংশ দান করেছেন এমন এক ব্যক্তিকে, যাঁর নাম আমজনতা তো বটেই, খোদ টাটা গ্রুপের অনেক কর্মকর্তা পর্যন্ত শোনেননি!
টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ সূত্রে জানা গিয়েছে, মোহিনীমোহন দত্ত নামে বছর চুয়াত্তরের ওই ব্যক্তি আপাতত খাতায়-কলমে রতন টাটার অবশিষ্ট সম্পত্তির তিনভাগের একভাগের মালিক। অর্থের হিসেবে যার মূল্য প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি! শুধু তাই নয়, ব্যাঙ্কে আমানত বাবদ আরও ৩৫০ কোটি টাকাও নাকি তাঁর নামে লিখে দিয়ে গেছেন রতন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত বেশ কিছু শৌখিন সম্পত্তি, যার মধ্যে মূল্যবান ছবি থেকে শুরু করে নামিদামি টাইমপিস পর্যন্ত রয়েছে—সেসবের স্বত্বাধিকারীও নাকি মোহিনীমোহন! যেখানে রতন টাটার নিজের ভাই জিমি টাটা ৫০ কোটির সম্পত্তি পেয়েছেন, তাঁর সৎ ভাই নোয়েল টাটার কানাকড়িও জোটেনি, সেখানে রক্তের সম্পর্ক নেই এমন আগন্তুক কী করে চোখধাঁধানো অংকের মালিকানা লাভ করলেন—এই রহস্যের খোলসা কিছুতেই করে উঠতে পারছেন না টাটা পরিবার ও রতন টাটার ঘনিষ্ঠজনেরা। যে কারণে ‘খাতায় কলমে’ লেখা অংকের সাতবত্তা খুঁটিয়ে দেখতে আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বোম্বে হাই কোর্ট এই বিষয়ের মীমাংসা করতে নজরদারি চালাবে বলেও সূত্রের খবর।
যদিও মোহিনীমোহন যে একেবারেই গল্পে ছিলেন না, এমনটা নয়। জামশেদপুরে জন্ম ও ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান মোহিনীবাবু টাটা গ্রুপের একদা কর্মচারীও বটে। তাজ গ্রুপের কর্মী হিসেবে হাতেখড়ি। তারপর নিজে থেকে কিছু দাঁড় করানোর লক্ষ্যে ‘স্টেলিয়ন ট্রাভেল এজেন্সি’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও ২০১৩ সালে এই কোম্পানি টাটা সার্ভিসেসের সঙ্গে জুড়ে যায়। সেই সময় সংস্থার ২০ শতাংশের স্বত্বাধিকারী ছিল টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ। তারপর টাটা ক্যাপিটাল এবং টমাস কুকের কাছে বিক্রির পর সংস্থার সাম্প্রতিকতম নাম ‘টিসি ট্রাভেল সার্ভিসেস’। যার ডাইরেক্টর পদে রয়েছেন খোদ মোহিনীমোহনবাবু।
কিন্তু এটুকু তো প্রতিবেদনের তথ্য। পর্দার আড়ালের ছবিটা সেভাবে প্রকাশ্যে আসেনি৷ রতন টাটা ও তাঁর সখ্যের কথা দুনিয়ার সামনে আনেন মোহিনীমোহন নিজে, গতবছর প্রয়াত উদ্যোগপতির স্মরণসভায়। যেখানে দাঁড়িয়ে মোহিনীবাবু বলেন, রতন টাটাকে তিনি চিনতেন যখন তাঁর ২৪ বছর বয়স। তখনও ব্যবসায়িক বৃত্তে সেভাবে জাঁকিয়ে বসেননি রতন। সবে জার্নি শুরু করেছেন৷ সেই সময় জামশেদপুরে ডিলার্স হোটেলে দুজনের আলাপ ও বন্ধুত্বের শুরুয়াত। রতন টাটা তাঁকে কীভাবে সাহস জুগিয়েছিলেন, কেরিয়ার তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন, শুধু তিনি নন, তাঁর মেয়েও যে টাটা গ্রুপের কর্মী হিসেবেই পেশাগত যাত্রাপথ শুরু করেছেন—স্মরণসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে অল্পকথায় সমস্তকিছু তুলে ধরেছিলেন মোহিনীমোহন। বক্তব্য শেষ করেছিলেন নিজেকে রতনের ‘পালিত পুত্র’ হিসেবে ঘোষণা করে।
হয়তো সম্মান জানাতে, হয়তো নিজের ঘনিষ্ঠতা আরও নিবিড়ভাবে বোঝাতেই সেদিন ‘পালিত পুত্রে'র উপমা ব্যবহার করেছিলেন তিনি। অকৃতদার রতন টাটা তাঁর উইলের লিখনে মোহিনীমোহনের সম্মানজ্ঞাপক উপমাকে সার্থক করে দিয়ে গেলেন!