যোগ হয়েছে আইসিইউ স্তরের নিবিড় চিকিৎসা, মস্তিষ্কে চাপ নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি সামলানো এবং দ্রুত সঠিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধা। সব মিলিয়ে PAM-এর ভয়ঙ্কর পরিণতি আটকানোর লড়াইয়ে রাজ্য এক ধাপ এগিয়ে গেছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 18 September 2025 12:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরলে (Kerala) ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে ‘ব্রেন-ইটিং অ্যামিবা’ সংক্রমণ (Amoebic Meningoencephalitis)। বিরল অথচ অবধারিত প্রাণঘাতী রোগ প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনজোএনসেফেলাইটিস (PAM)-এ বছরই আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৬৯ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। তবে আশার কথা, যেখানে বিশ্বে এই রোগের মৃত্যুহার ৯৭ শতাংশেরও বেশি, সেখানে কেরলে বেঁচে ফেরার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশে।
চিকিৎসকরা মনে করছেন, এর অন্যতম প্রধান কারণ মিল্টেফোসিন (Meltefosine) নামের একটি ওষুধের ব্যবহার।
কেরলের স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এখন আগাম সতর্ক হয়ে মিল্টেফোসিন দেওয়া হচ্ছে অ্যাম্ফোটেরিসিন-বি-র (Amphoterisine B) মতো প্রচলিত ওষুধের পাশাপাশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আইসিইউ স্তরের নিবিড় চিকিৎসা, মস্তিষ্কে চাপ নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি সামলানো এবং দ্রুত সঠিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধা। সব মিলিয়ে PAM-এর ভয়ঙ্কর পরিণতি আটকানোর লড়াইয়ে রাজ্য এক ধাপ এগিয়ে গেছে।
মিল্টেফোসিন কী?
মিল্টেফোসিন মূলত একধরনের অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ (Anti-Parasitic Medicine)। প্রথমে ক্যানসারের জন্য তৈরি হলেও পরে লিশম্যানিয়াসিসের চিকিৎসায় সফলভাবে ব্যবহার হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ফ্রি-লিভিং অ্যামিবা’ যেমন নেগ্লেরিয়া ফাউলেরি বা আক্যান্থামিবা-র ক্ষেত্রেও এটি কাজে আসছে। কেরলে রোগীরা যখনই PAM-এর উপসর্গ (হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি, বিভ্রান্তি) নিয়ে আসছেন, তখনই দেরি না করে এই ওষুধ ব্যবহার শুরু করা হচ্ছে।
ডোজ এবং প্রয়োগ
মার্কিন সিডিসি-র (CDC) নির্দেশিকা মেনে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত দিনে তিনবার ৫০ এমজি মিল্টেফোসিন দেওয়া হয়, খাবারের সঙ্গে। শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী কম ডোজ দেওয়া হয়। চিকিৎসা সাধারণত এক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলে এবং সবসময় মিল্টেফোসিনের সঙ্গে অ্যাম্ফোটেরিসিন-বি ও অন্যান্য অ্যান্টি-অ্যামিবিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
মিল্টেফোসিন ব্যবহার সুরক্ষিত হলেও এটি একেবারেই সাধারণ ওষুধ নয়। বমি, ডায়রিয়া, পেটের সমস্যা, কিডনি ও লিভারের উপর চাপ তৈরি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় এই ওষুধ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই একে শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শেই প্রয়োগ করা যায়।
কেন কেরল এগিয়ে?
দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ
চিকিৎসকদের বাড়তি সতর্কতা
আগেভাগে মিল্টেফোসিন-সহ যৌথ থেরাপি
আধুনিক আইসিইউ ও সমর্থক চিকিৎসা
জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (জলাশয় ক্লোরিনেশন, সতর্কবার্তা)
প্রতিরোধই প্রধান অস্ত্র
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, এখনও PAM থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল প্রতিরোধ। অপরিষ্কার উষ্ণ জলে সাঁতার কাটা বা নাকে জল ঢোকা এড়াতে হবে। নাক ধোয়ার জন্য সর্বদা ফুটানো বা জীবাণুমুক্ত জল ব্যবহার করতে হবে।
কেরলে এই সংক্রমণের ভয়াবহতা উদ্বেগজনক হলেও মিল্টেফোসিনের সঠিক ব্যবহার ও বাড়তি সতর্কতায় মৃত্যুহার যে কমতে শুরু করেছে, সেটাই এখন আশার আলো।
কী এই পিএএম? কীভাবে ছড়ায়?
তথ্য অনুযায়ী, এই সংক্রমণটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে (Central Nervous System) প্রভাবিত করে। এটি মস্তিষ্কের টিস্যু ধ্বংস করে, যার ফলে মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ফুলে ওঠে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যু হয়। এই রোগটি খুবই বিরল এবং সাধারণত সুস্থ শিশু, কিশোর বা তরুণদের মধ্যে দেখা যায়।
নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি একটি এককোষী জীব, যা সাধারণভাবে 'ব্রেন-ইটিং অ্যামিবা' (Brain Eating Ameoba) নামে পরিচিত সেটি সাধারণত গরম, বিশেষ করে বদ্ধ, মিষ্টি জলে বাস করে। দূষিত জল নাক দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ হয়। তবে, এই দূষিত জল পান করলে রোগের লক্ষণ দেখা যায় না। তাই যারা পুকুর বা হ্রদের মতো বদ্ধ মিষ্টি জলে সাঁতার কাটেন, ডুব দেন বা স্নান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
কেরল সরকার বলছে, বিশ্ব উষ্ণায়নও এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, কারণ জলের তাপমাত্রা বাড়লে এই জীবাণুগুলির বংশবৃদ্ধি সহজ হয়। যদিও স্বস্তির বিষয়, এই সংক্রমণ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না।
লক্ষণ এবং চিকিৎসা
পিএএম-এর (PAM) লক্ষণ লক্ষণ সাধারণত ১ থেকে ১২ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। শুরুতে মাথাব্যথা, জ্বর, বমি বা বমিভাবের মতো উপসর্গ হয়। ধীরে ধীরে গলা শক্ত হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, হ্যালুসিনেশন এমনকী কোমাতেও পৌঁছে যেতে পারে। রোগ নির্ণয় করা কঠিন হওয়ায় এর মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। মস্তিষ্কে তীব্র ফোলা বা সেরিব্রাল ইডিমা তৈরি হওয়ার কারণে প্রায়শই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। তবে চিকিৎসক মহল বলছে, প্রাথমিক অবস্থায় রোগটি ধরা পড়লে এবং সময় মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।
সতর্কীকরণ
এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের জন্য। চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শের ক্ষেত্রে সর্বদা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।