ধর্ম পরিবর্তন করলে কি আর তফসিলি জাতির মর্যাদা পাওয়া যাবে? এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বড় রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, হিন্দু, শিখ বা বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়া অন্য কোনও ধর্ম গ্রহণ করলে এসসি (SC) হিসেবে কোনও সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা মিলবে না। এমনকি এসসি-এসটি অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের রক্ষাকবচও হারাবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

সুপ্রিম কোর্ট।
শেষ আপডেট: 24 March 2026 11:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধর্মান্তর এবং সংরক্ষণ—ভারতের রাজনীতি ও সমাজে বহুদিনের বিতর্কিত দুই বিষয়কে এক সুতোয় বেঁধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court on Conversion)। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হিন্দু, শিখ বা বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়া অন্য কোনও ধর্ম গ্রহণ করলে আর তফসিলি জাতি (Scheduled Caste) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না।
এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং সংরক্ষণ নীতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার পথ খুলে দিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট?
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর—তফসিলি জাতির মর্যাদা শুধুমাত্র হিন্দু, শিখ ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রযোজ্য। অন্য ধর্ম—বিশেষত খ্রিস্টান বা ইসলাম গ্রহণ করলে সেই মর্যাদা আপনাআপনিই বাতিল হয়ে যায়। এই বিধান সংবিধানে (Scheduled Castes Order, 1950) স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। শীর্ষ আদালত আরও জানিয়েছে, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি আর এসসি-এসটি অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের সুরক্ষাও দাবি করতে পারবেন না।
এই মামলার কেন্দ্রে ছিলেন তফসিলি সমাজের এক ব্যক্তি। জন্মসূত্রে তিনি তফসিলি জাতির মানুষ হলেও পরে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘদিন পাদ্রি (Pastor) হিসেবে কাজ করেন। তাঁর দাবি ছিল, তাঁকে জাতিগতভাবে অপমান ও আক্রমণ করা হয়েছে। সেই অভিযোগে তিনি তফসিলি জাতি ও উপজাতি আইনে (SC/ST Act) মামলা দায়ের করেন। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়—ধর্মান্তরিত হওয়ায় তাঁর আর তফসিলি জাতির অধিকার প্রযোজ্য নয়।
অন্ধ্রপ্রদেশ হাই কোর্ট আগেই বলেছিল, খ্রিস্টান ধর্মে বর্ণব্যবস্থা নেই, ফলে এসসি পরিচয় দাবি করা যাবে না। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান আবেদনকারী। সুপ্রিম কোর্ট হাই কোর্টের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে।
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও এনভি অঞ্জারিয়া বলেন—আবেদনকারী দীর্ঘদিন খ্রিস্টান ধর্ম পালন করছেন। নিয়মিত প্রার্থনা সভা পরিচালনা করছেন। কোথাও তিনি পুনরায় পূর্ব ধর্মে ফেরার দাবি করেননি। এই সব তথ্য থেকেই স্পষ্ট—ঘটনার সময়ে তিনি খ্রিস্টান ছিলেন, ফলে এসসি মর্যাদা দাবি করা আইনসঙ্গত নয়।
এই রায়ের মূল ভিত্তি হল সংবিধান (Constitution (Scheduled Castes) Order, 1950)। এই আদেশ অনুযায়ী, এসসি মর্যাদা ধর্মনির্ভর। শুধুমাত্র হিন্দু, পরে সংশোধনে শিখ ও বৌদ্ধদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এতে। অর্থাৎ, ধর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ সুবিধাও শেষ—এটাই আইনের বর্তমান অবস্থান।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এই রায় কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—১. ধর্ম বনাম সামাজিক বাস্তবতা। সমালোচকদের মতে, ধর্মান্তরিত হলেও সামাজিক বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে থেকে যায়। তাহলে সংরক্ষণ কেন থাকবে না?
২. সংবিধানের মৌলিক অধিকার। ভারতে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা (Article 25) রয়েছে। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের ফলে সামাজিক সুরক্ষা হারানো—এটা কতটা ন্যায্য?
৩. রাজনৈতিক প্রভাব। দেশজুড়ে যখন ধর্মান্তর আইন নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন এই রায় সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই—খ্রিস্টান ও মুসলিম দলিতদের সংরক্ষণ দেওয়ার দাবি উঠেছে। একাধিক মামলা ও কমিশন এই বিষয়ে মতামত দিয়েছে। কিন্তু এখনও আইনগতভাবে সেই স্বীকৃতি মেলেনি। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় একদিকে আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করল, অন্যদিকে নতুন করে বিতর্কও উসকে দিল—ধর্ম কি সামাজিক পরিচয় নির্ধারণ করবে, নাকি বাস্তব জীবনের বৈষম্য? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।