আদালতের মতে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারটি অনেক বেশি কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকে। রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রার্থীর যোগ্যতা বা অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিতে পারে।

শেষ আপডেট: 11 April 2026 14:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলায় বিধানসভা ভোটের (West Bengal Election 2026) আগে একটা প্রশ্ন খুব বড় করে উঠে এসেছে। এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার কারণে যে যোগ্য ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের বাদ দিয়েই কি ভোট করানো যুক্তিসঙ্গত? এ ব্যাপারে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যাখ্যা কী? বাংলার এসআইআর মামলায় এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) সরাসরি অবশ্য কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে অন্য একটি মামলায় ভোটাধিকার নিয়ে অত্যন্ত একটি আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে—ভোট দেওয়া কিংবা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানো, কোনোটিই নাগরিকদের 'মৌলিক অধিকার' (Fundamental Right) নয়। এই দুটি অধিকারই মূলত আইনের দ্বারা নির্ধারিত বা ‘বিধিবদ্ধ অধিকার’ (Statutory Right), যা নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে কার্যকর হয়।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ
সম্প্রতি রাজস্থানের জেলা দুধ সমবায় সমিতির নির্বাচন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলছিল বিচারপতি বি ভি নাগরথ্না এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চে। সেখানেই আদালত স্পষ্ট করে যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হলেও তা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের আওতায় পড়ে না।
প্রার্থী হওয়ার অধিকার বনাম ভোটাধিকার
আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে দুটি বিষয়কে আলাদা করে ব্যাখ্যা করেছে। এক, ভোটাধিকার—এটি একজন নাগরিকের ভোটদানের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া। দুই, প্রার্থী হওয়ার অধিকার—এটি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ী হওয়ার বা কোনও পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ।
আদালতের মতে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারটি অনেক বেশি কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকে। রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রার্থীর যোগ্যতা বা অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিতে পারে।
কেন এটি মৌলিক অধিকার নয়?
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে অতীতে জ্যোতি বসু বনাম দেবী ঘোষাল মামলার নজির টেনে জানায়, সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে ভোটাধিকার পড়ে না। সংসদ বা বিধানসভা যে আইন তৈরি করে, তার ভিত্তিতেই এই অধিকার ভোগ করা যায়। অর্থাৎ, আইন প্রণেতারা চাইলে জনস্বার্থে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে এই অধিকারে বিশেষ শর্ত আরোপ করতে পারেন।
প্রসঙ্গত, ভারতীয় রাজনীতিতে মাইলফলক মামলা ছিল ১৯৮২ সালে জ্যোতি বসু বনাম দেবী ঘোষাল মামলা (Jyoti Basu & Others vs Debi Ghosal & Others)। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ সম্পূর্ণভাবে আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি ক্ষেত্র। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, নির্বাচনী মামলা কোনো সাধারণ দেওয়ানি মামলা নয়, বরং এটি একটি বিশেষ আইনি প্রক্রিয়া (Statutory Proceeding)। এই আইন অনুযায়ী, কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাই মামলার পক্ষ হতে পারেন; কোনো মন্ত্রী বা দলের প্রচারকারী যদি সরাসরি প্রার্থী না হন, তবে তাঁদের এই বিবাদে পক্ষ করা সম্ভব নয়। এই রায়টিই প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের অধিকার ও তার আইনি মোকাবিলা—সবই একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা সাধারণ মৌলিক অধিকারের থেকে আলাদা।
আসল বিবাদ শুরু হয়েছিল রাজস্থানের সমবায় সমিতির নির্বাচনের কিছু নিয়ম (Bye-laws) নিয়ে। সেখানে প্রার্থী হওয়ার জন্য কিছু বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছিল, যা রাজস্থান হাইকোর্ট বাতিল করে দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্তকে ভুল বলে জানিয়ে দেয়। শীর্ষ আদালতের মতে, প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ যোগ্যতা নির্ধারণ করা মানেই ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।
রায়ে আদালত আরও একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছে। 'যোগ্যতা' নির্ধারণ করে যে কে নির্বাচনে লড়তে পারবেন, আর 'অযোগ্যতা' (Disqualification) ঠিক করে কারা লড়তে পারবেন না। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ভুল করলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। ২০২৩ সালেও একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ ভোটাধিকারকে 'সাংবিধানিক অধিকার' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তবে এও জানিয়েছিল তা 'মৌলিক' অধিকার নয়। ২০২৬-এর নির্বাচনী পরিবেশের সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক ও আইনি মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।