শ্রমিকদের ডাকে সাড়া দিয়ে সফদার হাসমির নেতৃত্বে জননাট্য মঞ্চ পৌঁছে গিয়েছে পথনাটক করতে। নাটকের নাম 'হল্লা বোল'।
.jpeg.webp)
২ জানুয়ারি হাসপাতালে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হলে সেখানে দাঁড়িয়েই সফদারের স্ত্রী ও সহযোদ্ধা মলয়শ্রী হাসমি ঘোষণা করেন, যেখানে আততায়ীরা খুন করেছে সফদারকে, যে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য খুন করেছে— সেই জায়গায় একই নাটক আবার মঞ্চস্থ হবে।
শেষ আপডেট: 2 January 2026 13:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রামের নাম ঝান্ডাপুর। জানুয়ারির ঠান্ডায় রাজধানী তখন মেতে আছে উৎসবের আলোয়। নতুন বছরের প্রথম দিন। আর দিল্লি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে, অথচ অন্যই একটা পৃথিবী যেন ঝান্ডাপুর। শ্রমিকদের ডাকে সাড়া দিয়ে সফদার হাসমির নেতৃত্বে জননাট্য মঞ্চ পৌঁছে গিয়েছে পথনাটক করতে। নাটকের নাম 'হল্লা বোল'। শোষণ আর বঞ্চনার সেই ভাষ্য যখন বুনে চলেছেন কুশীলবরা, তখনই নেমে আসে আততায়ীর আক্রমণ। সরকারি মদতপুষ্ট আততায়ী।
১৯৮৯ সাল। মাথায় ২৩ বার ঘা মারা হয় ৩৪ বছর বয়সি সফদারের। আক্রমণকারীদের হিংস্রতাই প্রমাণ করে রাষ্ট্র তথা সরকারকে কতখানি ভয় পাইয়েছিল সফদার আর সফদারের নাটক। 'ঔরত' (নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাটক), 'মেশিন' (যন্ত্রসভ্যতা, পুঁজিবাদ ও মজদুরদের শোষণের বিরুদ্ধে নাটক), 'ডিটিসি কি ধান্দালি' (মুদ্রাস্ফীতি ও তার থেকে উৎপন্ন হওয়া সমস্যা বিষয়ক নাটক), 'হত্যায়ারে অউর অপহরণ ভায়চারে কে' (করণিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নাটক), 'গাঁও সে শহর তক' (খেতমজুরদের যন্ত্রণা নিয়ে নাটক), 'কুর্সি কুর্সি কুর্সি' (সরকারের ক্ষমতার রসায়নকে সমালোচনা করা নাটক), 'দুনিয়া সবকি' (আকবর-বীরবল কথোপথনে বৈষম্য বিরোধী অবস্থান নেওয়া নাটক), 'বাঁশুরিওয়ালা' (একজন সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া নিয়ে নাটক) —এইরকম অজস্র নাটকে সরকার তথা রাষ্ট্রকে সমালোচনা করেছেন সফদার। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)—এর সদস্য ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধা সফদার তার পথনাটককে করে তুলতে চেয়েছিলেন সমাজ বদলের হাতিয়ার। বাড়তি আড়ম্বর নয়। খুব সামান্য খরচে অভিনেতাদের পারদর্শিতা আর বিষয়ের গভীরতাকে সম্বল করেই সফদার ভাবিয়ে তুলেছিলেন দর্শকদের।
১ জানুয়ারি আক্রান্ত হন সফদার হাসমি। ২ জানুয়ারি হাসপাতালে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হলে সেখানে দাঁড়িয়েই সফদারের স্ত্রী ও সহযোদ্ধা মলয়শ্রী হাসমি ঘোষণা করেন, যেখানে আততায়ীরা খুন করেছে সফদারকে, যে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য খুন করেছে— সেই জায়গায় একই নাটক আবার মঞ্চস্থ হবে। সেটাই হবে সফদারের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। মাত্র দুদিন পর ঝান্ডাপুরেই জননাট্য মঞ্চ আবার অভিনয় করে 'হল্লাবোল'। ১ জানুয়ারি সফদার যখন অভিনয় করছিলেন তখন সেখানে দর্শক সংখ্যা ছিল দেড়শো জনের মতো। আর ৪ জানুয়ারি যখন আবার 'হল্লাবোল' অভিনীত হলো তখন সেখানে দর্শক সংখ্যা পঁচিশ হাজার। ছাত্র-শ্রমিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভিড়ে উপচে গিয়েছিল ঝান্ডাপুর৷
এমন ভাবেও যে একটি আন্দোলন, একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তা এর আগেই দেখিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্যের মতো গুণী মানুষ। সেই একই রাস্তায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হেঁটেছেন সফদর হাশমি। সেন্ট স্টিফেনস কলেজ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী ছাত্র ছিলেন তিনি। সহজেই কোনও ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারতেন। তাতে অর্থের অভাব হত না। আর এই মানসিকতার বিরুদ্ধেই বারবার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা, তাঁর সমাজচেতনা, রাজনীতি তাঁকে নিয়ে আসে মানুষের মাঝে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘে জড়িয়ে পড়াও ছাত্র বয়স থেকেই। মঞ্চে নাটক দেখানোর সামর্থ্য ছিল না সফদরের। চার দেওয়ালে ঘেরা হলে কতজন আসবেন, কতজন তাঁদের কথা শুনবেন তা নিয়েও সন্দিহান ছিলেন তিনি। তাই বেরিয়ে এলেন পথে, কিন্তু ফেরা হল না।
তাঁকে হয়তো দেশের অনেকেই আজ ভুলে গিয়েছেন। নাম শোনেননি এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরজি কর, কৃষক আন্দোলন থেকে মণিপুর বিরোধী চেতনা- সব জায়গাতেই তাঁর তোলা স্লোগানই এখনও সব প্রতিবাদের রেস্ত। হল্লা বোল। এই একটা স্লোগানেই গোটা দেশের শ্রমিক-কৃষকের না-খেতে পাওয়া শোষণের হেঁসেলে আগুন জ্বেলে দিয়েছিলেন যে ব্যক্তিটি, তাঁর নাম সফদর হাসমি। ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি ভারতে নুক্কড় নাটক বা পথনাটকের জনক সেই সফদর হাসমি শাসকদলের দুষ্কৃতীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই ঝরে পড়ে এক নাট্যপ্রতিভা।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সফদর হাসমি পাশ করার পরপরই ভালো বেতনের চাকরিও পেয়েছিলেন। কিন্তু, সেসব ছেড়ে তিনি শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিচেতনা গড়ে তোলার কাজে নেমে পড়েন। তার আগেই অবশ্য যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। তখন থেকেই তিনি ছিলেন কংগ্রেস সহ সমস্ত ডান ও অতি ডানপন্থীদের চক্ষুশূল। কিন্তু, কারওরই চোখরাঙানি ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি তাঁকে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করার পর তথ্য অফিসার হিসেবে চাকরি পান। খুবই ধনী পরিবারের ছেলে হাসমির মন চাকরিতে নয়, পড়ে ছিল শ্রমিক মহল্লায়।
১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি নির্বাচনের ঠিক আগে আগে হাসমি তাঁর দল নিয়ে হাজির হন গাজিয়াবাদের ঝান্ডাপুর গ্রামে। তাঁর নাটক হল্লা বোল দেখানো হবে আম্বেদকর পার্কে। সিপিএম প্রার্থী রামানন্দ ঝায়ের সমর্থনে তাঁরা পথনাটক করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের নাটকের সময় কংগ্রেস প্রার্থী মুকেশ শর্মার কনভয় যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে। তারা রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে সফদর তাঁদের অপেক্ষা করতে বলেন অথবা অন্য রাস্তা দিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু ক্ষিপ্ত কংগ্রেসিরা উন্মত্ত কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসমির উপর। ২ জানুয়ারি মারা যান হাসমি। তাঁর মরদেহ নিয়ে শোকমিছিলে দেশের তাবড় নাট্য, বাম চলচ্চিত্র অভিনেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী সহ ১৫ হাজার মানুষ শামিল হয়েছিলেন। সফদর হত্যাকাণ্ডের মামলা চলে প্রায় ১৪ বছর ধরে। ২০০৩ সালে গাজিয়াবাদ আদালত কংগ্রেস নেতা মুকেশ শর্মা সহ ১০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।