রুশ নাগরিক ভিক্টোরিয়া বসুর পালানোর ঘটনায় দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। সন্তানের পাসপোর্ট ছিল না, তবুও রাশিয়া পৌঁছলেন মা-ছেলে, সুপ্রিম কোর্ট বলল, "দূতাবাসের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়।"

ভিক্টোরিয়া বসু।
শেষ আপডেট: 22 July 2025 08:16
দ্য ওয়াস ব্যুরো: চার বছরের সন্তানকে নিয়ে গোপনে দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় ফিরে গেছেন রুশ নাগরিক ভিক্টোরিয়া বসু। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই ঘটনা নিয়ে শুনানি চলাকালীন বিচারপতিরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই ঘটনা রুশ দূতাবাসের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়।
দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভিক্টোরিয়া প্রথমে বিহারে যান, সেখান থেকে নেপাল, তারপর ইউএই হয়ে রাশিয়া। তাঁর আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে দেখা গেছে, ৭ জুলাই তিনি বাড়ি ছাড়েন। ৮ তারিখে ছিলেন বিহারে। ১১ ও ১২ জুলাই নেপালে অবস্থান করেন। ১৬ জুলাই রাশিয়ায় পৌঁছান।
তবে সমস্যার আসল জায়গাটা হল, চার বছর বয়সি সন্তানের পাসপোর্ট আদালতের কাছে জমা ছিল। তারপরও মা-সন্তান রাশিয়ায় পৌঁছে গেলেন কীভাবে?
সুপ্রিম কোর্ট বলছে, এটা এক রকম আদালতের অবমাননা। পাসপোর্ট ছাড়া কেউ রাশিয়ায় পৌঁছাতে পারে না, যদি না কেউ নতুন পাসপোর্ট জোগাড় করে দেয়। বিচারপতিরা বলছেন, এ ধরনের কাজ রুশ দূতাবাসের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই এই ঘটনার পেছনে কে বা কারা রয়েছে, সেটা খুঁজে বের করা দরকার।
আদালত দিল্লি পুলিশকে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বলেছে। পাশাপাশি কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি দ্রুত দেখার নির্দেশও দিয়েছে।
গত সপ্তাহে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাট্টি বলেছিলেন, ভিক্টোরিয়া ও তাঁর সন্তান কোনও বৈধ পথে দেশ ছাড়েননি। তাঁকে খুঁজতে পুলিশ ও বিদেশ মন্ত্রণালয় সক্রিয় রয়েছে। লুকআউট নোটিসও জারি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভিক্টোরিয়া ৫ জুলাই রুশ দূতাবাসে গিয়েছিলেন স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে। দূতাবাস তাঁকে পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। পরে ১০ জুলাই তাঁর মা দূতাবাসে জানান, ভিক্টোরিয়া নিখোঁজ।
ঠিক কী ঘটেছিল?
চন্দননগরের বাসিন্দা সৈকত বসু। পেশাগত কারণে বহু বছর কাটিয়েছেন চিনে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় রাশিয়ান নাগরিক ভিক্টোরিয়া জিগালিনার। পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে প্রেম, এবং শেষমেশ বিয়ে। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে সৈকত ফিরে আসেন পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে।
বাড়িতে ফিরে অবশ্য এক নতুন তথ্য সামনে আসে—ভিক্টোরিয়ার বাবা ছিলেন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি-র প্রাক্তন আধিকারিক। সৈকতের দাবি, বিয়ের পর থেকেই ভিক্টোরিয়া তাঁকে বারবার চাপ দিতেন ফোর্ট উইলিয়াম ঘুরে দেখতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সৈকতের বাবা, প্রাক্তন নৌসেনা অফিসার সমীর বসু এই অনুরোধে সায় দেননি। তাঁর আপত্তিতেই সম্পর্কের রসায়ন বদলাতে শুরু করে।
এরপর, সন্তানের হেফাজত নিয়ে আইনি টানাপড়েন শুরু হয়। ভিক্টোরিয়া সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যান, দাবি তোলেন, সন্তান যেন শুধু তাঁর কাছেই থাকে। মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায় হঠাৎ করেই সন্তানকে নিয়ে উধাও হয়ে যান ভিক্টোরিয়া। একপ্রকার আদালতের নির্দেশ অমান্য করেই নিরুদ্দেশ হয়ে পড়েন তিনি।
এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেয়, অবিলম্বে ভিক্টোরিয়া ও তাঁর সন্তানকে খুঁজে বের করতে হবে। বাচ্চাটিকে খুঁজে পেলে সরাসরি বাবার হেফাজতে তুলে দিতে হবে। একইসঙ্গে, আদালত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে ভিক্টোরিয়ার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেয়। যাতে তিনি আর কোনওভাবেই ভারত ছাড়তে না পারেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে।
এর পরেই সৈকত বসু সন্তানের হেফাজতের দাবিতে ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সেই শুনানিতেই চাঞ্চল্যকর মোড় নিল গোটা ঘটনা। জানা গেল, রাশিয়া ফিরে গেছেন ভিক্টোরিয়া।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ৫ জুলাই ভিক্টোরিয়াকে দিল্লির রাশিয়ান দূতাবাসে দেখা গিয়েছিল একজন আধিকারিকের সঙ্গে। সুপ্রিম কোর্ট সেই আধিকারিকের বাড়িতে তল্লাশির অনুমতি দিয়েছে। এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেছে—রাশিয়ান দূতাবাসকে ভারতীয় আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।
উল্লেখ্য, ভিক্টোরিয়ার মা ১০ জুলাই রুশ দূতাবাসে জানান, তাঁর মেয়ে নিখোঁজ। সেই সময়েও আদালত জানায়, ভিক্টোরিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে এবং পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো উচিত।
আপাতত এই মামলার তদন্তে গতি আনতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লি পুলিশকে স্ট্যাটাস রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। গোটা ঘটনায় এখন রাশিয়ান দূতাবাসের ভূমিকা ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠছে।